ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : ডোনাল্ড ট্রাম্পইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের কৌশলগত প্রতিরক্ষা মজুদের বড় অংশ ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানের শতবর্ষী চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলাকে ‘স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিযোগ তুলেছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ঘিরে সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক—তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। থাড ইন্টারসেপ্টরের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের থাড অ্যান্টি-মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনটি উদ্ধৃত করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট এবং টাইমস অফ ইসরায়েল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ২০০টিরও বেশি থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি ১০০টির বেশি এসএম-৩ ও এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টরও উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ১০০টির কম অ্যারো ইন্টারসেপ্টর এবং প্রায় ৯০টি ডেভিডস স্লিং ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। কারণ, ইসরায়েল তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরিয়ে নিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “ইসরায়েল নিজের সক্ষমতায় যুদ্ধ জেতার মতো অবস্থায় নেই, তবে বাইরের বিশ্ব প্রকৃত পরিস্থিতি দেখতে পায় না।” পেন্টাগনের ভিন্ন অবস্থান তবে পরিস্থিতিকে সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ Pentagon। পেন্টাগনের ভাষ্য, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা শুধু বৃহৎ সামরিক সক্ষমতার একটি অংশমাত্র। ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অংশীদারিত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। দূতাবাসের মতে, “সামরিক প্রস্তুতি, অভিন্ন স্বার্থ এবং সক্ষমতার দিক থেকে ইসরায়েলের মতো অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের আর নেই।” যদিও নিজেদের ইন্টারসেপ্টর মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার খবর বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ইসরায়েল। গত মাসে দেশটি অ্যারো ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনাও অনুমোদন করেছে। ৬৫০ ক্ষেপণাস্ত্র, বহু প্রাণহানি যুদ্ধ চলাকালে ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে প্রায় ৬৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলায় ইসরায়েলে ২১ জন ইসরায়েলি ও বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিহত হয়েছেন অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ইউরেনিয়াম নিয়ে ট্রাম্পের কড়া বার্তা এদিকে ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কোনওভাবেই হস্তান্তর করবে না বলে অবস্থান জানালেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পহুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সেটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “আমরা এটি উদ্ধার করবই। আমাদের এটি প্রয়োজন নেই, চাইও না। তবে আমরা কোনওভাবেই এটি তাদের কাছে রাখতে দেব না।” তিনি আরও বলেন, “যেভাবেই হোক, আমরা এটি নিয়ে নেব। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।” ট্রাম্প একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য টোল বা শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেন। তার ভাষায়, এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং সেখানে কোনও ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থ আদায় গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দাবি করেন, সামুদ্রিক চলাচলে নানা বিধিনিষেধের কারণে ইরান ইতোমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলা ঘিরে ‘যুদ্ধাপরাধ’ অভিযোগ অন্যদিকে ইরানের শতবর্ষী চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউট-এ মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার অভিযোগ তুলে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইসামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া পোস্টে এই হামলাকে “স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, এই হামলা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, বরং ইরানের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও বেঁচে থাকার অধিকারের ওপরও আঘাত। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, পাস্তুর ইনস্টিটিউট ধ্বংস হওয়ায় আঞ্চলিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থানিশ্চিত করেছে যে সাম্প্রতিক হামলার পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর অবস্থায় নেই এবং স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারছে না। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দুর্বল হয়ে পড়া ইরানের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সাম্প্রতিক হামলার পর আরও গভীর সংকটে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের বাস্তব চিত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পেন্টাগন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিচ্ছে না। একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন প্রকাশ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তাদের দাবি, ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ভ্যান্স এসব দাবির সত্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, প্রেসিডেন্টের সামনে যে ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তা কতটা বাস্তব এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের ঘাটতি বিষয়টি আড়াল করা হচ্ছে কি না। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার মতে, ভ্যান্স বিশেষ করে গোলাবারুদের মজুদ কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তার আশঙ্কা, এই ঘাটতি ভবিষ্যতে চীন, উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রকাশ্যে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন, তবে ভেতরে ভেতরে কৌশলগত পরিকল্পনা ও তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত না করে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরান এখনো তাদের উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। দেশটি তাদের বিমানবাহিনীর বড় অংশ, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং নৌ সক্ষমতা বজায় রেখেছে। হরমুজ প্রণালিতে কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা সামুদ্রিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার করে ফেলেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ পরিচালনায় চাপ তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, সংঘাত শুরুর আগেই ভ্যান্স এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। তার মতে, এ ধরনের যুদ্ধ ব্যাপক প্রাণহানি ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাতের ফলাফল ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ মজুদে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে দেশটির সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসজানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। একইসঙ্গে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল -এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান ঘাটতি পূরণ করে পূর্ণ মজুদ পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয় বছর সময় লাগতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্পস কর্নেল ও কৌশলগত বিশ্লেষক মার্ক এফ. ক্যানসিয়ান-এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র থাকলেও স্থল হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের ঘাটতি আগে থেকেই ছিল। সাম্প্রতিক ব্যবহারের ফলে সেই ঘাটতি আরও বেড়েছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি এশিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান-সম্পর্কিত সামরিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি THAAD এবং Patriot ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল ব্যবহারের ফলে সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ অভিযানে প্রভাব ফেলতে পারে। ন্যাটোতে মতপার্থক্য ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করায় ন্যাটো মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। রয়টার্স-এর বরাতে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, পেন্টাগন-এর একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইলে বিভিন্ন নীতিগত বিকল্প তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কিছু মিত্র দেশের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিক সুবিধা সীমিত করার বিষয় রয়েছে। স্পেনকে সাময়িকভাবে ন্যাটো সদস্যপদ থেকে বাদ দেওয়া এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান পুনর্বিবেচনার কথাও আলোচনায় এসেছে। এছাড়া যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশপথ, সামরিক ঘাঁটি বা লজিস্টিক সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে নির্দিষ্ট দেশগুলোকে অপসারণের বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে ন্যাটো-এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জোটের প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক বিধান নেই। প্রেক্ষাপট ও প্রতিক্রিয়া হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র দেশগুলোকে সেখানে নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানায়। কিন্তু একাধিক দেশ সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করেন এবং জোটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পেন্টাগন জানিয়েছে, আলোচিত প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়; এগুলো সম্ভাব্য নীতিগত বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি পশ্চিমা সামরিক জোটের অভ্যন্তরে নতুন করে মতপার্থক্য ও উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়ে পেন্টাগনের ভেতরে ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে একাধিক অভ্যন্তরীণ হিসাব ও আইনপ্রণেতাদের কাছে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। যুদ্ধের মাত্র ৩৮ দিনের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের ফলে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার: টমাহক, স্টেলথ ক্রুজ ও প্যাট্রিয়ট পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রায় ১ হাজার ১০০টি দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট মজুদের কাছাকাছি বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সময়ে এক হাজারেরও বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা বার্ষিক ক্রয়ক্ষমতার প্রায় ১০ গুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ১ হাজার ২০০টিরও বেশি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। প্রতিটির দাম ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি। স্থলভিত্তিক প্রিসিশন স্ট্রাইক অস্ত্র ও এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র মিলিয়ে আরও ১ হাজারেরও বেশি ইউনিট ব্যবহার করা হয়েছে। ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, খরচের অস্বচ্ছ চিত্র পেন্টাগন জানিয়েছে, ৩৮ দিনের অভিযানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। তবে সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশের মতে, এই সংখ্যা প্রকৃত অপারেশনাল তীব্রতা পুরোপুরি বোঝায় না, কারণ বড় লক্ষ্যবস্তুকে একাধিকবার আঘাত করা হয়েছে। যুদ্ধের মোট ব্যয় নিয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি মন্তব্য না করলেও দুটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থা বলছে, খরচ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৫৬০ কোটি ডলারের অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের অবহিত করেছেন। সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্র ও মজুদের চাপ এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে জ্যাসম-ইআর নামের দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিটির দাম প্রায় ১১ লাখ ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০টি ব্যবহার করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মজুদে আছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি। এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চমাত্রার ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। পেন্টাগনের মূল্যায়ন বনাম হোয়াইট হাউসের অবস্থান সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির শীর্ষ ডেমোক্রেট সদস্য সিনেটর জ্যাক রিড বলেন, বর্তমান উৎপাদন গতিতে ব্যবহৃত অস্ত্র পুনরায় মজুদ করতে “বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে”। অন্যদিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যান্সিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক গোলাবারুদের মজুদ পর্যাপ্ত হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থল হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগেই সীমিত ছিল এবং এখন আরও সংকুচিত হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই খবরের পুরো ভিত্তিটাই মিথ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ রয়েছে।” কৌশলগত প্রভাব: প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউরোপ পর্যন্ত চাপ CSIS-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই অভিযানে টমাহক ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার ভবিষ্যতে বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউরোপেও এর প্রভাব পড়েছে বলে পেন্টাগনের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়ার আগ্রাসন প্রতিরোধে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা শক্তি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় কিছু অস্ত্রের মজুদও কমেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব আরও স্পষ্ট। যুদ্ধ শুরুর আগে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে—প্রতিটি ইউনিটে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাড সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মুখে এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। “অস্ত্রভান্ডারের সীমা” নিয়ে নীরব স্বীকারোক্তি? ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো সিনেট শুনানিতে সরাসরি মজুদ ঘাটতি নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে শুধু বলেন, “অস্ত্রভান্ডারের একটি সীমা আছে।” এই সীমা ইরান যুদ্ধের সময় অতিক্রম করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতি ও বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সামরিক চাপে পড়েছে, নাকি এটি কৌশলগত বিরতি? বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের তথ্য এই বিতর্ককে আরও জোরালো করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে চাপ তৈরি ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ালে দেশটি স্বল্পমেয়াদে অস্ত্র সংকটে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই হামলার হুঙ্কার ছেড়ে শেষ মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে এক রুদ্ধদার বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে কি যুদ্ধাস্ত্রে টান পড়েছে বলেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেন ট্রাম্প? এমন প্রশ্নই উঠছে বিশেষজ্ঞ মহলে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে প্রায় সাত সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৪৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত থাড সিস্টেমের অন্তত অর্ধেক এবং প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের প্রায় ৫০ শতাংশ খরচ হয়েছে। এছাড়া, পেন্টাগন-এর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের সঙ্গেও এসব তথ্যের মিল পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যুদ্ধের আগে এবং পরে তুলনা করলে দেখা যায়, টমাহক মিসাইলের প্রায় ৩০ শতাংশ, জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইলের ২০ শতাংশের বেশি এবং এসএম-৩ ও এসএম-৬ মিসাইলের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন চুক্তি করলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে এসব অস্ত্র পুনরায় মজুত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। বিশ্লেষক মার্ক ক্যানসিয়ান বলেছেন, অতিরিক্ত গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকলেও, সমমানের প্রতিদ্বন্দ্বী, যেমন চীন-এর মোকাবিলায় বর্তমান মজুত যথেষ্ট নয় বলে বিশ্লেষণে উলেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক। তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অস্ত্রের ঘাটতিতে ভুগছে না, যদিও ইরান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেট চেয়েছেন। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী, যে কোনো সময় ও স্থানে অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা মার্কিন বাহিনীর হাতে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই সামরিক নেতারা প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করেছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুতের ওপর চাপ ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব অস্ত্র ইসরাইল ও ইউক্রেনকে সহায়তা করতে ব্যবহৃত হয়। সেটিই এখন বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প নিজে থেকেই যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্লেকদের মতে, হামলা করে নিজেদের ক্ষমতার ঘাটতি দেখাতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না আসায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনায় বসার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যেই মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্র–জ বিমানঘাঁটিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ার ফোর্স টু’ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তবে আলোচনার টেবিলে বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে শর্তাবলি বা রূপরেখা পাঠানো হয়েছিল, তার বিপরীতে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না আসায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি পোস্টে লেখেন, ইরান তাদের প্রস্তাব জমা না দেওয়া পর্যন্ত এবং আলোচনা কোনো একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে না যাওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। যদিও এর আগে তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়াবেন না। একই সঙ্গে ইরানে আবারও হামলার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তানের অনুরোধে ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতিতে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন দাবি করার পর তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইরান কখনও যুদ্ধবিরতি চায়নি। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধও করেনি ইরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধও করেনি ইরান। ট্রাম্পের এই ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর’ ঘোষণার কয়েকটি সম্ভাব্য অর্থ । ১. ট্রাম্প যুদ্ধটি হেরে গেছেন যুদ্ধ চলাকালীন সব ধরনের সম্ভাব্য কৌশল পরীক্ষা করেছেন ও প্রয়োগ করেছেন ট্রাম্প। তবে তিনি বুঝতে পেরেছেন যুদ্ধের মাধ্যমে কিছুই অর্জন করতে পারবেন না। তাই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসাকেই সবচেয়ে ভালো পথ হিসেবে দেখছেন। এমনকি যদি তিনি ভুল সিদ্ধান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যান, তাতেও কোনো লাভ হবে না। ২. প্রতারণার আশ্রয় যদিও যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্জন করতে পারেনি। তবুও ট্রাম্প নানা ধরনের কৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারেন। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা একটি হতে পারে। ট্রাম্প দাবি করতে পারেন যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এরপর যুক্তরাষ্ট্রের একই ‘প্রশাসন’ বা তাদের আঞ্চলিক সহযোগী (ইসরাইল) আবারও ‘সন্ত্রাসী’ কার্যক্রম চালাতে পারে। তাসনিমের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানি কর্মকর্তারা এ ধরনের সম্ভাবনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তারা এটি হালকাভাবে নিচ্ছেন না। ৩. প্রক্সি যুদ্ধ চালাবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে যাবে, কিন্তু ইসরাইল লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে—যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অজুহাতে। তবে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করা হয়েছে, তারা একতরফাভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইসরাইলকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দিতে পারবে না। ৪. নৌ অবরোধ মার্কিন বাহিনীর নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে তা মানেই শত্রুতার অব্যাহত থাকা। অবরোধ যতদিন থাকবে, ইরান অন্তত হরমুজ প্রণালী খুলবে না এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে অবরোধ ভাঙবে। ৫. যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যুদ্ধের ‘ছায়া’ বজায় রাখতে চায় এবং ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখতে চায়। ওয়াশিংটনের ধারণা, ইরানের পরিস্থিতি ১২ দিনের যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মতোই আছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির একটি মৌলিক পার্থক্য হলো—হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধের এই ছায়া বজায় রাখতে চায়, তাহলে তাদের বুঝতে হবে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। ইরান ও রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার শিথিলতার মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভয়াবহ তেল সংকটের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যেসব দেশ তেল সংকটের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস সাবকমিটির বাজেট শুনানিতে এই ঘোষণা দেন। গত সপ্তাহে তিনি জানিয়েছিলেন যে, মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া নিষেধাজ্ঞার ছাড় আর নবায়ন করা হবে না। তবে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এখন নতুন করে ৩০ দিনের মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন তিনি। বেসেন্ট জানান, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকের সময় প্রায় ১০টি দেশের অর্থমন্ত্রী ও আর্থিক নেতারা তাকে এই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এসব দেশ ভয়াবহ তেল সংকটের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার এই শিথিলতার ফলে ইরান ১৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছে বলে যে হিসাব প্রচলিত রয়েছে, তা নিয়েও কথা বলেছেন ট্রেজারি সেক্রেটারি। বেসেন্ট এই তথ্যকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তিনি এর বিপরীতে ইরান প্রকৃতপক্ষে কত আয় করেছে, সেটির কোনও বিকল্প হিসাব দেননি তিনি।ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ গড়িয়েছে চতুর্থ সপ্তাহে। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এখন এক নতুন বিতর্ক দানা বাঁধছে। একদিকে হোয়াইট হাউসের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি, অন্যদিকে তেহরানের ‘টিকে থাকার’ রণকৌশল। কিন্তু খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরাই এখন প্রশ্ন তুলছেন যে, মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কি ওয়াশিংটনকে আরেকটি ভিয়েতনাম বা ইরাকের মতো বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সম্পাদকীয় বোর্ড এক নিবন্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেছে, যুদ্ধ নিয়ে মিথ্যা বলা জয়কে আরও কঠিন করে তোলে। ইতিহাসের প্রতিধ্বনি: ভিয়েতনাম ও ইরাকের ছায়া ইতিহাস সাক্ষী, ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল মার্কিনিদের। বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টাদের সতর্কতা কানে তোলেননি। উপদেষ্টারা জানিয়েছিলেন, ইরান চাইলে হরমজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে; কিন্তু অতি-আত্মবিশ্বাসী ট্রাম্প সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন বিশ্ব অর্থনীতি সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছে। নিবন্ধে সতর্ক করে বলা হয়েছে, লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো ট্রাম্পকেও হয়তো একদিন যুদ্ধ নিয়ে মিথ্যার জন্য ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হবে। কারণ, যুদ্ধের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যখন হাজার হাজার সেনার জীবন এর সঙ্গে জড়িত। মইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর পরিচালক সামি আল-আরিয়ান মনে করেন, এই যুদ্ধে দুই পক্ষের লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এই অসামঞ্জস্যই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার মূল কারণ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে জায়নবাদী আধিপত্যের পথে বাধা হিসেবে পরিচিত ইরানকে পুরোপুরি নির্মূল করা। কৌশলগত পার্থক্য: ‘ধ্বংস’ বনাম ‘টিকে থাকা’ এর জন্য হয় ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটাতে হবে, না হয় অঞ্চলজুড়ে তাদের প্রভাব শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এর বিপরীতে ইরানের লক্ষ্য অত্যন্ত সহজ। আল-আরিয়ান বলেন, “ইরানকে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে হবে না, কিংবা ইসরায়েলের সরকারকে এই মুহূর্তে ক্ষমতাচ্যুত করারও প্রয়োজন নেই। ইরানের শুধু ‘টিকে থাকা’ প্রয়োজন।” যদি ইরানি রাষ্ট্র কাঠামো অক্ষত থাকে এবং তাদের আঞ্চলিক জোটগুলো সক্রিয় থাকে, তবেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষশক্তির মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। কৌশলগতভাবে যার লক্ষ্য যত সহজ, জয়ের সম্ভাবনা তার তত বেশি। যুদ্ধের কৌশলেও দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশপথের আধিপত্যে বিশ্বাসী। তারা মনে করে, বিধ্বংসী বোমা হামলা এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে শত্রুকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা যাবে। অন্যদিকে ইরান বেছে নিয়েছে টিকে থাকার জন্য উত্তেজনার বিস্তৃতি। তারা সরাসরি আমেরিকার আকাশশক্তির মোকাবিলা না করে যুদ্ধের ময়দানকে ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েলের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে চাপ সৃষ্টি এবং জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মাধ্যমে তারা এই সংঘাতকে একটি আঞ্চলিক সংকটে রূপান্তর করছে। পেন্টাগন ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও অঞ্চলের সামগ্রিক কৌশলগত ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা: আকাশ বনাম বিস্তৃতি সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান সেথ জি জোনস মনে করেন, এই যুদ্ধ মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জাপানে বা ফিলিপাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন ইরানের মতো অন্যান্য প্রতিপক্ষের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। সামি আল-আরিয়ান আরও সতর্ক করে বলেছেন, এক অঞ্চলের সংকট অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান প্রণালিতে কোনও ভুল পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের সঙ্গে মিশে গিয়ে বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই ধরনের সংঘাত সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয় না; বরং একপক্ষ যখন বুঝতে পারে যে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা অসম্ভব, তখনই এর সমাপ্তি ঘটে। আল-আরিয়ান বলেছেন, “ইরান যদি টিকে থাকে, তবেই তাদের জয়। ইসরায়েল হয়তো প্রমাণ করবে যে তারা ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তারা কাউকে আত্মসমর্পণ করাতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ব্যাপক হারে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন পেন্টাগনের কর্মকর্তারা। যুদ্ধ শুরুর মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে ৮৫০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সামরিক সূত্র বলছে, টমাহক মূলত নৌযান ও সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, যা এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে এর উৎপাদন সীমিত—বর্তমানে বছরে মাত্র কয়েকশ ইউনিট তৈরি হয়। ফলে দ্রুত ব্যবহারের কারণে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে টমাহকের বর্তমান মজুত “চিন্তার বিষয়” হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক পরিভাষায় তারা “উইনচেস্টার”-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন—অর্থাৎ গোলাবারুদ প্রায় শেষের দিকে। ২০০৪ সাল থেকে ব্যবহৃত আধুনিক টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র জিপিএস ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে এবং এর একক মূল্য সর্বোচ্চ ৩.৬ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছে পেন্টাগন। এক মাসে যুদ্ধের বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আজ এক মাস পূর্ণ হলো। সংঘাতটি শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানে এখন পর্যন্ত প্রায় ১,৯০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু এলাকা, হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। জাতিসংঘে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি রেড ক্রিসেন্টের প্রতিনিধি মারিয়া মার্টিনেজ জানান, ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারের সময় অনেক উদ্ধারকর্মী নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মরদেহ দেখতে পান—যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রভাব ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলার প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানে ২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১,১৪২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২২ জন শিশু। আহত হয়েছেন আরও ৩,৩১৫ জন। ইরাকে অন্তত ৯৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির কুর্দিস্তান অঞ্চলে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন। অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। ইসরাইল জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে অন্তত ১৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে চারজন ইসরাইলি সেনাও নিহত হয়েছেন। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চাপ মার্কিন কংগ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাড-এর মোট মজুতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু রাডার সিস্টেম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যা পুনঃস্থাপন করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এর ফলে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে ইসরাইলের কিছু বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাডার উৎপাদনকারী কারখানাগুলো ধ্বংস করা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হবে—অন্যথায় এসব ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দায়িত্ব গ্রহণের পর দেওয়া তার প্রথম বিবৃতিতে এই অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। এই বক্তব্য এমন এক সময় এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলছে। নতুন নেতৃত্ব, নতুন বার্তা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্বে আসেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি বলেন— “ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলের অস্থিরতার প্রধান কারণ।” তিনি দাবি করেন, ইরানের লক্ষ্য কোনো প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। তার ভাষায়, “এই ঘাঁটিগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের উপস্থিতি সরিয়ে নেয়।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ইরানের নতুন নেতৃত্বের কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে। যুদ্ধের ১১ দিনে নতুন কৌশল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত ১১ দিনে ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন— ইরান সরাসরি বড় সামরিক ঘাঁটিতে হামলা না করে গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করছে এবং ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত করছে। পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ইরান এমন লক্ষ্যবস্তু বেছে নিচ্ছে, যেগুলোকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বলে মনে করছে।” এরবিলে ড্রোন হামলা সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকের এরবিল শহরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ড্রোন হামলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন— ওই হোটেলে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা একাধিক ড্রোন দিয়ে হামলা চালায়। এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, “এই হামলা প্রমাণ করে যে ইরান জানত মার্কিন সেনারা ওই হোটেলে অবস্থান করছিল।” বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সামরিক উপস্থিতির দুর্বলতা তুলে ধরেছে। পেন্টাগনের হতাহতের হিসাব পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত— ৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন ১৪০ জন আহত হয়েছেন এর মধ্যে ১০৮ জন আহত সেনা আবার দায়িত্বে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরানের দাবি— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১৩০০ জন ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানের হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে, কৌশলে এগোতে চাইছে ইরান মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে যে সরাসরি সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন। তবে তারা এখন “স্ট্র্যাটেজিক সারভাইভাল” কৌশল অনুসরণ করছে। এই কৌশলের মূল ধারণা হলো— যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা ছোট ছোট হামলার মাধ্যমে চাপ বাড়ানো এবং রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা। একজন মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক বলেন, “যদি ইরান টানা বোমাবর্ষণের মধ্যেও সরকার টিকিয়ে রাখতে পারে, তাহলে তেহরান এটিকেই বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে।” হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা মোজতবা খামেনির ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। বিশ্বের প্রায়— ২০ শতাংশ তেল গ্যাস পরিবহন এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে— বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে। ইরানের লক্ষ্য কি শুধু মার্কিন ঘাঁটি? খামেনি তার বক্তব্যে দাবি করেছেন— “ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাস করে।” তবে তিনি একইসঙ্গে বলেন— “মার্কিন ঘাঁটিগুলোই আমাদের লক্ষ্য।” মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক উপস্থিতি রয়েছে— কাতার বাহরাইন কুয়েত ইরাক সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব ঘাঁটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মার্কিন সামরিক অপারেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খামেনি পরিবারের মৃত্যু নিয়ে বিভ্রান্তি এদিকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ বাগেরজাদেহ নিহত হয়েছেন। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এই খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়— খামেনির স্ত্রী জীবিত আছেন এবং মৃত্যুর খবর সঠিক নয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্য নিহত? তবে স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যম দাবি করেছে— ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় খামেনি পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন— এক পুত্রবধূ জামাতা এক মেয়ে কয়েকজন নাতি-নাতনি তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। প্রতিশোধের অঙ্গীকার নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রথম বক্তব্যে মোজতবা খামেনি নিহত ইরানিদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিবৃতিতে তিনি বলেন— “যারা ইরানের জনগণের রক্ত ঝরিয়েছে, তাদের জবাব দেওয়া হবে।” এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের ভবিষ্যৎ সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে। সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো হলো— হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ বাড়া জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি দশকের সবচেয়ে বড় মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মোজতবা খামেনির প্রথম বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরান তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, ইরানের প্রতিশোধের হুমকি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা—এই তিনটি বিষয় এখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে—তা এখন নজরে রাখছে পুরো বিশ্ব।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার নতুন এক বিপর্যয় ঘটেছে। সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা যাচ্ছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু। খামেনির মৃত্যু ইরানের জন্য এক গুরুতর আঘাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অপরদিকে, ইরানের প্রতিশোধমূলক আঘাতে অন্তত তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। এছাড়া, পাঁচজন মার্কিন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। রোববার (১ মার্চ) পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা ‘যুদ্ধে নিহত’ হয়েছে এবং পাঁচজন ‘গুরুতর আহত’ হয়েছে। তবে এই হামলায় আরও বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এই ঘটনা মার্কিন সেনাদের মধ্যে প্রথম কোনও হতাহতের খবর, যা ইরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যার পর ঘটে। এর আগে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে, যার ফলস্বরূপ দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়। ইরানের তরফ থেকে এ ঘটনার পর মার্কিন সেনাদের উপর প্রতিশোধমূলক আঘাত দেওয়া হয়, যার ফলে তিন সেনা নিহত এবং পাঁচ সেনা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে আবারও তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী ও ইরান সরকারের মধ্যে এ ধরনের উত্তেজনা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বরাজনীতিতে এই পরিস্থিতি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে, এই পরিস্থিতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহব্যাপী সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলে এই অভিযান শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন দুই কর্মকর্তা। সংবেদনশীল পরিকল্পনার কারণে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, এই প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনা ও বাড়তি সামরিক প্রস্তুতি গত সপ্তাহে ওমান-এ দুই দেশের কূটনীতিকরা তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। তবে একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি মোতায়েন করায় নতুন সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে। এর সঙ্গে হাজারো সেনা, যুদ্ধবিমান ও গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার যুক্ত করা হচ্ছে, যা হামলা ও প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হতে পারে। নর্থ ক্যারোলিনার একটি সামরিক ঘাঁটিতে সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “কখনো কখনো ভয় দেখানো প্রয়োজন হয়, সেটিই পরিস্থিতি সমাধানে কার্যকর হতে পারে।” হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্টের সামনে সব বিকল্প খোলা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পেন্টাগন। অতীতের নজির ও সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অভিযান গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময়ও দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছিল। জুন মাসে ‘মিডনাইট হ্যামার’ নামে অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে যাওয়া স্টেলথ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালানো হয়। এর জবাবে কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে সীমিত পাল্টা হামলা চালায় ইরান। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবার পরিকল্পনা আরও জটিল। সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে শুধু পারমাণবিক স্থাপনা নয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের কারণে মার্কিন বাহিনীর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকবে। পাল্টা হামলা শুরু হলে তা বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে অঞ্চলের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হবে। বর্তমানে জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইসরাইলের অবস্থান এর মধ্যেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে তা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে, ইরান জানিয়েছে—নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আলোচনার অংশ করতে রাজি নয় তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যদি সামরিক অভিযান শুরু হয়, তবে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; বরং পুরো অঞ্চল নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।