ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : আফ্রিকার সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল আবেইতে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ প্রদান করতে যাচ্ছে জাতিসংঘ। আগামী ৫ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাদের এই সম্মাননা প্রদান করবেন।
শুধু একটি পদক প্রদান অনুষ্ঠান নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের দীর্ঘদিনের অবদান এবং সেই দায়িত্ব পালনের চরম মূল্যকে সামনে নিয়ে এসেছে এই স্বীকৃতি।
জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়েছে, পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশি ছয় শান্তিরক্ষী হলেন—
তারা ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ)-তে দায়িত্ব পালনকালে এক ড্রোন হামলায় নিহত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শান্তিরক্ষা মিশনে প্রযুক্তিনির্ভর হামলার ঝুঁকি যে বেড়েছে, এই ঘটনা তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে নিহত সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্যদের স্মরণে প্রদান করা হয়।
জাতিসংঘের দ্বিতীয় মহাসচিব ড্যাগ হ্যামারশোল্ডের নামে প্রবর্তিত এই পদক শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।
এ বছর গত বছরে নিহত ৫৯ জনসহ মোট ৬৮ জন শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর এই পদক দেওয়া হবে।
বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সদস্য প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অবদানকারী।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৭৭ জন নারী সদস্যসহ ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন।
তারা কাজ করছেন—
এই উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়ায় না, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকেও শক্তিশালী করে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি বেসামরিক, সামরিক ও পুলিশ সদস্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত আছেন।
কিন্তু এসব মিশনের পরিবেশ দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ড্রোন প্রযুক্তির বিস্তার, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শান্তিরক্ষীদের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আবেইতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মৃত্যু সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন।
এবারের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’।
জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত বৃদ্ধি এবং আর্থিক সম্পদের সংকোচনের সময়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার বার্তায় বলেন, শান্তিরক্ষা স্থিতিশীলতা ও আশার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি পরীক্ষিত এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী উপায়। তবে এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন।
একইসঙ্গে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পরিবেশেও শান্তিরক্ষীরা বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছেন, সহিংসতা প্রতিরোধ করছেন এবং শান্তির সম্ভাবনা ধরে রাখছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০২ সালে ২৯ মে-কে ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৪৮ সালে প্রথম শান্তিরক্ষা মিশন প্রতিষ্ঠার স্মরণে দিনটি পালন করা হয়।
নিউইয়র্কের এবারের অনুষ্ঠানে ১৯৪৮ সাল থেকে দায়িত্ব পালনকালে নিহত প্রায় সাড়ে চার হাজার শান্তিরক্ষীর স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
সেই স্মরণানুষ্ঠানে বাংলাদেশের ছয় শান্তিরক্ষীর নামও যুক্ত হবে বিশ্ব শান্তিরক্ষার ইতিহাসে আত্মত্যাগের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে।
তাদের মরণোত্তর ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক শুধু ব্যক্তিগত সাহসিকতার স্বীকৃতি নয়; এটি আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি, পেশাদারিত্ব এবং আত্মত্যাগেরও বৈশ্বিক স্বীকৃতি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
বরিশাল অফিস : বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন থেকে ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট পর্যন্ত সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, যথাযথ তদারকির অভাব এবং প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে প্রায় ৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিদর্শন প্রতিবেদনে সড়কটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—প্রোটেকশন ওয়ার্ক বা প্যালাসাইডিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ কী? চন্দ্রমোহন মাছ বাজার এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের প্যালাসাইডিং ও সুরক্ষা কাঠামো নির্মাণে একাধিক অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, ঘানিব্যাগ তৈরিতে নির্ধারিত অনুপাতে বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি। ফলে বস্তাগুলো শক্ত হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কিছু স্থানে বস্তার ভেতরে সহজেই লাঠি প্রবেশ করানো সম্ভব হচ্ছে, যা নির্মাণমান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এছাড়া খালের ভেতর থেকে ভারী যন্ত্র দিয়ে কাদামাটি উত্তোলন করে সড়কের পাশে ফেলার কারণে প্যালাসাইডিংয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ১৪০ মিটার এলাকায় প্যালাসাইডিং খালের দিকে হেলে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে পুরো কাঠামো ধসে পড়তে পারে এবং সড়কটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তদারকি নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব রয়েছে। একইসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন তারা। অভিযোগের তীর গেছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর দিকেও। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরিদর্শন প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে? গত ১ জুন প্রকল্প পরিচালকের কাছে জমা দেওয়া এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বরিশালের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ মো. জামাল প্রকল্পটির নকশা ও প্রোটেকশন ওয়ার্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প এর আওতায় সড়কটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। খরস্রোতা খালের পাড়ঘেঁষে নির্মাণাধীন হওয়ায় সড়কের একপাশে আরসিসি প্যালাসাইডিং নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ১:৪:৮ অনুপাতে প্রস্তুত বালিভর্তি বস্তা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের পানির উচ্চতার পরিবর্তনের কারণে এখানে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় চাপের মাত্রা পরিবর্তনশীল। বর্ষা মৌসুমে এই চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিদ্যমান প্যালাসাইডিং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। ‘স্থায়ী নাও হতে পারে’ প্যালাসাইডিং পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সড়কের মূল অংশের সাবগ্রেড, সাববেইজ, বেইজ ও কার্পেটিংয়ের কাজ তখনও শুরু হয়নি। একইসঙ্গে কান্ট্রি-সাইডের মাটির কাজও অসম্পূর্ণ ছিল। পরিদর্শন শেষে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মন্তব্য করেন: “সম্ভবত সড়কটির প্যালাসাইডিং স্থায়ী হবে না, অথচ এই অংশটিই সড়কের স্থায়িত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও মত দেন যে, প্রোটেকশন ওয়ার্কের বিষয়ে ডিজাইন ইউনিটের কারিগরি পরামর্শ অনুযায়ী প্রাক্কলন প্রস্তুত করা প্রয়োজন ছিল। ব্যয়ের বড় অংশ সুরক্ষা কাঠামোয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রায় পুরো ব্যয়ের বড় অংশই প্রোটেকশন ওয়ার্কে ব্যয় হচ্ছে। তাই সড়কের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সুরক্ষা কাঠামোর কার্যকারিতা এবং নকশাগত সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। এছাড়া কান্ট্রি-সাইডের কয়েকটি অংশে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একটি ছোট ড্রেনেজ কালভার্ট নির্মাণেরও সুপারিশ করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হিসেবে প্রোটেকশন ওয়ার্কের স্থায়িত্ব যাচাইয়ের জন্য এলজিইডির ডিজাইন ইউনিট এবং প্রকল্প পরিচালকের সরেজমিন পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সামনে কী ঝুঁকি? স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সরকারি অর্থের অপচয় এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, উপজেলা প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি হেলিকপ্টার গাজীপুরের কালীগঞ্জের আকাশে ভেসে ওঠে। স্থানীয়দের কাছে এটি ছিল বিরল এক দৃশ্য। তবে সেই আগমনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না কোনো ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল, কূটনৈতিক সফর কিংবা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি। এর পেছনে ছিল বহু বছরের এক ব্যক্তিগত সম্পর্ক—বন্ধুত্ব। সৌদি আরবের নাগরিক শেখ আব্দুর রহমান মোবারক আল ইয়ামি সাত দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু, সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশি ইসমাঈল হোসেনের আমন্ত্রণে। শনিবার (৩০ মে) সকালে ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে সরাসরি হেলিকপ্টারে গাজীপুরের কালীগঞ্জে যান তিনি। তার আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই জাঙ্গালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে। ফুটবল মাঠে অতিথি, আলোচনায় বন্ধুত্ব আব্দুর রহমানের সফরকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে একটি মাদকবিরোধী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। গ্রামীণ জনপদে হেলিকপ্টার অবতরণের ঘটনা যেমন মানুষের আগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে, তেমনি স্থানীয়দের মতে এই সফরের মূল আকর্ষণ ছিল দুই দেশের দুই মানুষের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের গল্প। খেলার মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঙ্গে সৌদি অতিথির সরাসরি মেলামেশাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কর্মী থেকে আপনজন সফরের অংশ হিসেবে মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামের দেলোয়ার হোসেন শেখ, জামালপুর ইউনিয়নের আশাদুল্লাহ এবং বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের নুর ইসলামের বাড়িতে যান আব্দুর রহমান। এই তিনজনই একসময় সৌদি আরবে তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বাড়িতেই তাকে ঘিরে ছিল উৎসবের আবহ। কোথাও ফুল দিয়ে বরণ, কোথাও নির্মাণ করা হয় বিশেষ তোরণ। আবার কোথাও শুধু আন্তরিক অভ্যর্থনাই হয়ে ওঠে প্রধান আয়োজন। এ সফর এক অর্থে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়োগকর্তার মানবিক সম্পর্কেরও একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। গ্রামীণ আতিথেয়তায় মুগ্ধ অতিথি বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য অতিথি আপ্যায়ন। কালীগঞ্জে আব্দুর রহমানের অভিজ্ঞতাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ডাবের পানি, কলা, আপেল, কমলা থেকে শুরু করে মৌসুমি ফল—আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ও তালের শাঁস দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় তাকে। তবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হন স্থানীয় খাবারের আয়োজন দেখে। দেলোয়ার হোসেন শেখের বাড়িতে দুপুরের খাবারে পরিবেশন করা হয় টেংরা, শিং, কৈ, মলা, পুঁটি ও চিংড়ি মাছ। সঙ্গে ছিল দেশি মুরগি, খাসি এবং গরুর মাংসের নানা পদ। স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশের গ্রামীণ খাদ্য ঐতিহ্যের স্বাদ তুলে ধরতেই এমন আয়োজন করা হয়েছিল। লিচুবাগানে ফিরে পাওয়া শৈশব খাবারের আনুষ্ঠানিকতা শেষে অতিথিকে নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির পাশের একটি লিচুবাগানে। সেখানে গাছ থেকে নিজ হাতে লিচু পেড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে বিশেষভাবে আনন্দিত করে। উপস্থিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুহূর্তটিতে তার মধ্যে যেন শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস ফিরে এসেছিল। গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রকৃতি, ফলের বাগান এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা তার সফরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। ‘বিদেশে আছি বলে মনে হয়নি’ বাংলাদেশ সফর নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আব্দুর রহমান বলেন, বন্ধু ইসমাঈল হোসেনের আমন্ত্রণেই তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তার ভাষায়, “বাংলাদেশ সম্পর্কে যতটা ধারণা ছিল, বাস্তবে এসে দেখলাম দেশটি তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। এখানের মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক ও অতিথিপরায়ণ। বন্ধুর বাড়িতে এসে কখনো মনে হয়নি আমি বিদেশে আছি। মনে হয়েছে আমি নিজের পরিবারের মাঝেই আছি।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে এবং সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে আবারও বাংলাদেশে আসতে চান। সফরের পরবর্তী গন্তব্য কালীগঞ্জ সফর শেষে কুমিল্লা ও সিলেটে আরও দুই বন্ধুর বাড়ি পরিদর্শনের কথা রয়েছে আব্দুর রহমানের। সফরের শেষদিকে তিনি আবার কালীগঞ্জে ফিরে আসবেন। এরপর সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। বন্ধুত্বের গল্পে উঠে এলো বাংলাদেশের আরেক পরিচয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ের বন্ধুত্ব অনেক সময় দুই দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। কালীগঞ্জে সৌদি নাগরিক আব্দুর রহমান আল ইয়ামির সফরও তেমনই একটি ঘটনা। হেলিকপ্টারে আগমন হয়তো মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে, কিন্তু সফরটির মূল বার্তা ছিল অন্যত্র—হাজার কিলোমিটার দূরের সম্পর্কও কখনও কখনও একটি গ্রামীণ উঠোনে এসে পরিবারের উষ্ণতায় পরিণত হতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কোরবানির ঈদ মানেই পরিবার, আনন্দ আর উৎসব— বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে এমনই পরিচিত এক বাস্তবতা। কিন্তু রাজধানী ঢাকার অলিগলিতে ঈদের দিন দেখা মেলে ভিন্ন এক বাংলাদেশের; যেখানে উৎসবের চেয়ে জীবিকা বড়, আনন্দের চেয়ে প্রয়োজনের মূল্য বেশি। প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ ঢাকায় এসেছেন শুধুমাত্র বাড়তি আয়ের আশায়। কেউ মৌসুমি কসাই, কেউ পশু ব্যবসায়ী, কেউ আবার সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগান। তাদের অনেকের কাছেই ঈদ মানে পরিবার থেকে দূরে কাটানো আরেকটি কর্মদিবস। “অভাবী মানুষ, সংসারের জন্যই তো আমার ঈদ” পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বাসিন্দা ১৩ বছর ধরে কোরবানির ঈদের সময় ঢাকায় আসেন আইয়ুব হোসেন। মৌসুমি কসাই হিসেবে কাজ করেন, পাশাপাশি সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি করেন সড়কের পাশে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায় তার সঙ্গে কথা হয়। সামনে সাজানো গরুর মাংস দেখিয়ে তিনি ক্রেতাদের ডাকছিলেন— “স্যার, মাত্র তিনশ টাকা কেজি।” ঈদের দিন পরিবার ছেড়ে ঢাকায় থাকার কারণ জানতে চাইলে আঞ্চলিক ভাষায় একটি গানের লাইন শোনান তিনি— “অভাবে স্বভাব নষ্ট, ভজনে কূল নষ্ট, বাড়ি নষ্ট বুড়ির কারণে।” এর ব্যাখ্যায় আইয়ুব বলেন, “অভাবী মানুষ। কষ্টের মধ্যে চলে আসছি। সংসার আছে, বৌ-বাচ্চা আছে। তাদের জন্যই তো আমার ঈদ।” তার ভাষায়, ঈদের পর পরিবারের মুখে হাসি দেখাটাই আসল আনন্দ। “আমার মতো অনেকেই ঈদের দিন অন্যের কোরবানির গরুর মাংস তৈরি করে বাড়তি টাকা আয় করেন। ঈদের পর বৌ-বাচ্চা নিয়ে আনন্দ বেশি হয়।” “আমাদের জীবনে তো আর ঈদ নেই” ৬৪ বছর বয়সী চাঁদ আলীর গল্প আরও দীর্ঘ। কুষ্টিয়ার পাটিকাবাড়ি এলাকার এই বাসিন্দা গত চার দশক ধরে কোরবানির ঈদের দিন কাটাচ্ছেন ঢাকায়। এবারও কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে পাঁচটি গরু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের কাজ করেছেন তিনি। চাঁদ আলী বলেন, “জীবনের ৪০ বছর কোরবানির ঈদ কখনও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে করতে পারিনি। অভাবের সংসারে তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই বছর চলে যায়।” তার স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন প্রায় সমবয়সী। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখনও এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে অপেক্ষা করেন ঈদের পরদিনের জন্য। ঈদের দিন বাড়িতে থাকতে না পারার আক্ষেপ আছে কি না— এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ নীরব থেকে চাঁদ আলী বলেন, “প্রথম দিকে খুব খারাপ লাগতো। এখন আর লাগে না। আমাদের জীবনে তো আর ঈদ নেই।” ঈদের দিনও রাজধানীতে শ্রমের বাজার শুধু আইয়ুব বা চাঁদ আলী নন— কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে তৈরি হয় এক অস্থায়ী শ্রমবাজার। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় আসেন কয়েক দিনের কাজের আশায়। পঞ্চগড়ের শাহীন ও নূন হোসেন জানান, প্রতি বছরই তারা ঈদের সময় ঢাকায় থাকেন। কারণ একটাই— বাড়তি আয়। অন্যদিকে শরিয়তপুরের ছাগল ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন মাঝি বলেন, “১৯৮৮ সাল থেকে কোরবানির ঈদ পরিবারের সঙ্গে করিনি। আগে খুব খারাপ লাগতো। এখন মনে হয় লাভ বেশি হলেই আনন্দ।” ঢাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে ছাগলের সঙ্গেই রাত কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ঈদের কয়েকদিন তাদের জীবন পুরোপুরি রাস্তাকেন্দ্রিক হয়ে যায়। ২৫০ টাকার মাংসের বাজার ঈদের দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে কমদামের মাংসের অস্থায়ী বাজার। নারী ও শিশুরা বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা মাংস বিক্রি করেন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। এসব মাংসের ক্রেতাদের বড় অংশ নিম্নমধ্যবিত্ত ও স্বল্পআয়ের মানুষ। অনেকে হোটেল ব্যবসার জন্যও কিনে নেন। একজন ক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভালো মাংস পেলে কিনবো। বাজারের দামের চেয়ে অনেক কম।” একই এলাকায় কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী সরাসরি গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করছিলেন। সেখানে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। মোহাম্মদী হাউজিং এলাকায় ভ্যানে মাংস বিক্রি করছিলেন আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, “যারা কোরবানি দিতে পারেন না, তাদের জন্য মাংস বিক্রি করি। যা আয় হয়, সেটা ঈদের সময় সংসারে কাজে লাগে।” তবে এবার লাভ কম হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন গরুর উচ্চমূল্য। ঈদের অন্তরালের অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক চক্রও। পশু পরিবহন, কসাই, মাংস বিক্রি, পশুখাদ্য, চামড়া ও অস্থায়ী শ্রমবাজার— সব মিলিয়ে কয়েক দিনের জন্য তৈরি হয় বিপুল নগদ অর্থপ্রবাহ। কিন্তু এই অর্থনীতির সবচেয়ে নিচের স্তরে থাকা মানুষগুলোর বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের কাছে ঈদ আনন্দের নয়, বরং বেঁচে থাকার একটি মৌসুমি সুযোগ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে— যখন অনেক পরিবার কোরবানির মাংস ভাগাভাগি ও উৎসবে ব্যস্ত, তখন অন্য একদল মানুষ একই দিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দরদাম করছেন, মাংস কাটছেন, কিংবা পরদিনের খাবারের টাকা জোগাড়ে ব্যস্ত রয়েছেন। কোরবানির ঈদের এই বিপরীত বাস্তবতা যেন বাংলাদেশের সামাজিক বৈষম্যেরও এক নীরব প্রতিচ্ছবি।