ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:
বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ফলে বহু বছর ধরে সংক্রামক এই রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার প্রভাবে সেই সাফল্য বড় ধরনের ধাক্কা খায়। যেসব শিশু সময়মতো হামের টিকা পায়নি, তাদের অনেককেই এখন চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।
দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। তাদের জীবন বাঁচাতে লড়াই করছে পরিবার, স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতালগুলো। তবে দুর্বল তথ্য ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে প্রচারের ঘাটতি এবং টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, টিকাদানের হার কমে গেলে একটি নিয়ন্ত্রণে থাকা সংক্রামক রোগ কত দ্রুত ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তারই সতর্কবার্তা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের দুই লাখ দুই হাজার সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত হিসাবে, চলতি বছরে বিশ্বে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে।
অতি সংক্রামক এই রোগে এ পর্যন্ত এক হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
এই পরিসংখ্যান শুধু রোগের বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে না; একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি তৈরি হলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগের বিস্তার ঠেকাতে একটি দেশে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সুরক্ষাশূন্যতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার কমে ৯০ শতাংশে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ নেমে আসে ৮৬ শতাংশে।
অর্থাৎ, প্রথম ডোজের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৯৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট। দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় নয় শতাংশ পয়েন্টে।
সংখ্যার হিসাবে এই ব্যবধান তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হলেও, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। কারণ, টিকা না পাওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ একই সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। কোনো এলাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক শিশু টিকাবঞ্চিত থাকলে সেখানে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, টিকা আমদানিতে বিলম্ব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে তদারকির ঘাটতি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে ব্যাহত করে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ স্কুলের অধ্যাপক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকা উপদেষ্টা মার্ক জিৎ এই পরিস্থিতিকে চরম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেছেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, কোনো দেশে জরুরি ভিত্তিতে মহামারি মোকাবিলার চেয়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা অনেক সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; বরং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের জরুরি টিকাদান কার্যক্রমের প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এপ্রিলে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর সরকার সব শিশুকে কর্মসূচির আওতায় আনার দাবি করেছিল। কিন্তু জুনে পরিচালিত আরেকটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে একই বয়সী আরও ৪০ লাখ শিশুর তথ্য সামনে আসে, যারা আগের তালিকার বাইরে ছিল।
এই তথ্যের গরমিল জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পরিকল্পনা, উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি এবং মাঠপর্যায়ে শিশু শনাক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, যদি একটি বড় জনগোষ্ঠীর শিশু টিকাদানের তালিকার বাইরে থেকে যায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে কতজন শিশু টিকা পেয়েছে, কতজন বাদ পড়েছে এবং কোন কোন এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি—তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কতটা সম্ভব?
জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে সঠিক তথ্য শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; এটি রোগের বিস্তার পূর্বাভাস দেওয়া, টিকার সরবরাহ পরিকল্পনা করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
তালিকায় কোনো শিশু বাদ পড়লে সে টিকা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আবার একই শিশুর তথ্য একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হলে প্রকৃত টিকাদানের হার সম্পর্কেও বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি হতে পারে। ফলে তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই না করে টিকাদানের সাফল্য দাবি করলে বাস্তব পরিস্থিতি আড়ালে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে টিকাদান অভিযান শুরুর আগে চারটি ধাপে প্রস্তুতি যাচাই করা হতো। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে এবার সেই প্রক্রিয়া মাত্র একটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়।
প্রস্তুতি যাচাইয়ের ধাপ কমিয়ে আনার ফলে মাঠপর্যায়ে শিশু শনাক্তকরণ, টিকাদান কেন্দ্রের প্রস্তুতি এবং বাদ পড়া জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে, টিকাদান অভিযানের আগে আক্রান্ত শিশুদের ৮২ শতাংশ টিকাহীন ছিল। অভিযান শেষ হওয়ার পরও এই হার ৮৫ শতাংশে ছিল।
এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়ার হার বেড়ে যাওয়ার অর্থ হতে পারে, যেসব শিশু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল, তাদের একটি বড় অংশকে কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তবে এই তথ্য থেকে এককভাবে বলা যায় না যে অভিযানের কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে; এর জন্য আক্রান্ত শিশুদের বয়স, টিকা গ্রহণের ইতিহাস এবং সংক্রমণের সময়সহ অন্যান্য তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে কিছু শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে থাকতে পারে।
সরকারের এই বক্তব্যের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য যাচাই করাও জরুরি। কারণ, টিকা না নেওয়ার পেছনে অভিভাবকদের অনীহা থাকলেও টিকাকেন্দ্রের দূরত্ব, স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতি, তথ্যের ঘাটতি কিংবা টিকার সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যা ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই টিকাবঞ্চিত শিশুদের দায় শুধু পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে, তারা কেন টিকা পায়নি, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেখানে ১৮০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাদের গ্রামে সময়মতো কোনো স্বাস্থ্যকর্মী টিকা দিতে আসেননি। শিশুদের মৃত্যুর পরই স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদের সেখানে উপস্থিত হতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা নয়, বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে।
সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাস্থ্যকর্মীদের তৎপরতা বাড়ানো হলে তা দিয়ে সব ক্ষেত্রে আগের ক্ষতি পূরণ করা যায় না। হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
সিলেটের পরিবারগুলোর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে স্পষ্ট হতে পারে, কোন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম পৌঁছায়নি, কোথায় নজরদারির ঘাটতি ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না।
হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে দেশে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ১৯৮ জন নতুন হামের রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলতে থাকায় হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের রোগীদের সেবা দেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকার তথ্য পরিস্থিতির চাপ তুলে ধরে।
শিশুদের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ এবং সহায়ক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সময়ে একাধিক সংক্রামক রোগের চাপ তৈরি হলে হাসপাতালের সক্ষমতা, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদানের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, মোট আক্রান্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই বয়সী শিশু বলে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান প্রচলিত ধারণার বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। হামের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা অনেক সময় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের কেন্দ্র করে হলেও, বড় বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে—বিশেষ করে যারা প্রয়োজনীয় ডোজ পায়নি কিংবা যাদের টিকাদানের ইতিহাস অনিশ্চিত।
তবে বয়সভিত্তিক টিকাদানের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রোগের বিস্তার, পূর্ববর্তী টিকাদানের হার, বয়সভিত্তিক সংক্রমণের তথ্য এবং জাতীয় টিকাদান নীতিমালা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, টিকাদানের ক্ষেত্রে শুধু নির্ধারিত বয়সের তালিকার ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা জরুরি। যেসব শিশু কোনো ডোজ পায়নি বা অসম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
সাধারণত ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা মাতৃগর্ভ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে। তবে এই সুরক্ষা সব শিশুর ক্ষেত্রে সমান নয় এবং সময়ের সঙ্গে তা কমে যেতে পারে।
চিকিৎসকেরা এখন অনুসন্ধান করছেন, কেন কিছু শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে গবেষণার ফল শিশুদের ঝুঁকি নির্ধারণ এবং টিকাদানের কৌশল পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে, তাদের সুরক্ষায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিকল্প ও সহায়ক কৌশল নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।
তবে এ ধরনের গবেষণার ফল প্রকাশের আগে নির্দিষ্ট কোনো কারণকে দায়ী করা ঠিক হবে না। মাতৃ-অ্যান্টিবডির মাত্রা, শিশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং সংক্রমণের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশের হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধু জরুরি টিকাদান অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করে তা দূর করা প্রয়োজন।
প্রথমত, টিকা পাওয়া ও না-পাওয়া শিশুদের নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে, যাতে কোনো শিশু তালিকার বাইরে না থাকে।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে তাদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, টিকার সরবরাহ ও আমদানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি টিকাদান অভিযানের আগে প্রস্তুতি যাচাই, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের তদারকি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
চতুর্থত, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। টিকার প্রয়োজনীয়তা, নির্ধারিত ডোজ এবং টিকাদান কেন্দ্রের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজ ভাষায় প্রচার করা দরকার।
সবশেষে, প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কতজন শিশু টিকা পেয়েছে, কতজন বাদ পড়েছে, কোথায় টিকার ঘাটতি ছিল এবং কোন পর্যায়ে প্রস্তুতির ব্যর্থতা ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একসময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে, একবার অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে হলে নিয়মিত টিকাদান, নির্ভুল তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
টিকাদানের হার কমে গেলে তার প্রভাব কেবল পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর পরিণতি গিয়ে পড়ে পরিবারগুলোর ওপর—যেখানে একটি শিশুর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি কিংবা মৃত্যু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা তাই স্পষ্ট: সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব—বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে আবার তৈরি না হয়, সে জন্য টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা।
কারণ, হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য শুধু আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া নয়; বরং কোনো শিশু যেন প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত না থাকে, তা নিশ্চিত করা।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে রাশিয়া। সম্ভাব্য এই হামলাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে অভিহিত করেছে মস্কো। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কিছুটা বাড়াবাড়ি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। রাশিয়ার সতর্কবার্তা এবং ট্রাম্পের এই বক্তব্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কূটনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নতুন হামলার হুমকি নিয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করল মস্কো সোমবার (২ নভেম্বর) রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক মাসগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যারা আবারও হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। জাখারোভা বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, ইরানে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সামরিক অভিযান দেশটির জনগণের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার সংকল্প ভাঙতে ব্যর্থ।’ তিনি আরও বলেন, যারা নতুন করে হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তাদের এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাশিয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট, সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই ইরান সংকটের সমাধান খুঁজে বের করা উচিত। কূটনৈতিক সমাধানে মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতা চায় রাশিয়া জাখারোভা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের সহযোগিতা করা অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে সেই সমাধান বাস্তবায়নে অবদান রাখতে মস্কো প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। রুশ মুখপাত্র বলেন, হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে বলে আশা করছে রাশিয়া। তবে এ ক্ষেত্রে প্রণালিসংলগ্ন দেশগুলোর বৈধ স্বার্থের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে ব্যবহারে আগ্রহী দেশগুলোর স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে। জাখারোভা আরও বলেন, এই বিষয়টি ইরানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ নৌ অবরোধের মুখে রয়েছে বলে দাবি করছে মস্কো। ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যায় ‘বাড়াবাড়ি’ স্বীকার ট্রাম্পের অন্যদিকে, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের হত্যার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। স্থানীয় সময় রোববার (১ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ডুবুকিউতে এক জনসভায় ট্রাম্প বলেন, ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকেও হত্যা করা হয়েছে। তবে এসব নেতাকে হত্যার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কিছুটা বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘অথচ এ বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলে না।’ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প দাবি করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেনি, ইরানই শুরু করেছে। ওয়াশিংটন এখন সেই যুদ্ধের অবসান ঘটাচ্ছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব থেকে শুরু করে সোলাইমানি হত্যার প্রসঙ্গ জনসভায় ট্রাম্প দাবি করেন, বিশ্বের সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন উপকূলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলার জন্যও ইরানকে দায়ী করেন ট্রাম্প। যদিও ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা। এ ছাড়া ইরাকে সড়কের পাশে পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর জন্যও ইরানকে দায়ী করেন তিনি। এসব হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সোলাইমানিকে ‘রাস্তার পাশের বোমার জনক’ বলেও অভিহিত করেন তিনি। ২০২০ সালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন কাসেম সোলাইমানি। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের দাবি, ইরান আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। তিনি বলেন, ‘তারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে, আমরা শুরু করিনি। আমরা যুদ্ধটি শেষ করছি। আমরা তাদের খুব শোচনীয়ভাবে হারাচ্ছি।’ হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। মস্কো দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার সম্ভাবনা এবং রাশিয়ার সতর্কবার্তার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথ কতটা উন্মুক্ত থাকবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ। তবে বিকল্প জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার পর আবারও রপ্তানি শুরু করেছে দেশটি। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ভারতের জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতি, অন্যদিকে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র থেকে সরবরাহ পুনর্বিন্যাস—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সচল রাখার চেষ্টা করছে নেপাল। একই সময়ে ভারতে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকেও দেশটির আয় বেড়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক মাসে ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে দেশটি আয় করেছে ৫.৯২৫ বিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ৫৯২.৫ কোটি রুপি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দুই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্ধ হয়ে যায় সরবরাহ গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ বন্যার কারণে নেপালের ত্রিশূলি ও চিলিমে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেন্দ্র দুটি থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন ছিল। ফলে উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। একই দুর্যোগের প্রভাব পড়ে ভারতের সঙ্গে নেপালের বিদ্যুৎ বাণিজ্যেও। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। তবে বিদ্যুৎ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ থাকার পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়নি। বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন পাওয়ার পর বাংলাদেশে রপ্তানি পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয় নেপাল। কোন কোন কেন্দ্র থেকে আসবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ? নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা জানিয়েছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (সিইএ) অনুমোদনের পর বিকল্প জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানো হবে দুটি কেন্দ্র থেকে— সোলু খোলা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র কাবেলি বি-১ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যদিকে, ‘লোয়ার মোদি খোলা’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে সরবরাহের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অনুমোদিত ত্রিশূলি, চিলিমে ও দেবীঘাট কেন্দ্রগুলোর পরিবর্তে নতুন কেন্দ্রগুলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল। দুর্যোগের মধ্যেও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সচল রাখার চেষ্টা দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠার ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যা ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরও দ্রুত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা এবং অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিক্রি অব্যাহত রাখা নেপালের আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বর্ষা মৌসুমে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্রি করে থাকে দেশটি। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার, উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণে রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বিদ্যুৎ রপ্তানি পুনরায় শুরু হওয়া এবং আয় বৃদ্ধি পেলেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ পুনর্বাসন, মেরামতের ব্যয় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতার ওপর দুর্যোগের প্রভাব সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পাঁচ বছরের চুক্তিতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর স্বাক্ষরিত পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (এনইএ) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে এই চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার কথা রয়েছে নেপালের। এই ব্যবস্থায় ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে সরাসরি স্থলসীমান্ত না থাকলেও ভারতের সঞ্চালন অবকাঠামোর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্ভব হচ্ছে। চুক্তির নির্ধারিত মৌসুমে সরবরাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নেপালের জন্য এটি বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের একটি নির্দিষ্ট বাজার নিশ্চিত করে। এক মাসে ভারতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে ৫৯২.৫ কোটি রুপি আয় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি পুনরায় শুরু করার পাশাপাশি ভারতের বাজারেও উল্লেখযোগ্য আয় করেছে নেপাল। এনইএর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক মাসে ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে নেপালের আয় হয়েছে ৫.৯২৫ বিলিয়ন রুপি, অর্থাৎ ৫৯২.৫ কোটি রুপি। এই সময়ে দেশটি ভারতে বিক্রি করেছে ৬৩৩.৯৮৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ। কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও রপ্তানি আয় বেড়েছে। তুলনামূলক হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ে বিদ্যুৎ রপ্তানি থেকে নেপালের আয় ছিল ৪.৯৬৩ বিলিয়ন রুপি। এবার আয় বেড়েছে ৯৬২ মিলিয়ন রুপি বা ৯৬.২ কোটি রুপি। আবার চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৫.০৯২৫ বিলিয়ন রুপি। পরবর্তী আলোচ্য মাসে আয় বেড়েছে ৮৩২.৫ মিলিয়ন রুপি বা ৮৩.২৫ কোটি রুপি। অর্থাৎ, বন্যায় কয়েকটি উৎপাদনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আলোচ্য সময়ে ভারতের বাজারে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে নেপালের আয় আগের বছরের একই সময় এবং আগের মাসের তুলনায় বেশি হয়েছে। দুই পথে ভারতের বাজারে বিদ্যুৎ বিক্রি নেপাল প্রধানত দুটি ব্যবস্থায় ভারতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে থাকে। প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তির আওতায় ভারতের হরিয়ানা ও বিহার রাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। দ্বিতীয়ত, অবশিষ্ট উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের (আইইএক্স) ডে-অ্যাহেড ও রিয়েল-টাইম বাজারে বিক্রি করা হয়। ডে-অ্যাহেড বাজারে সাধারণত পরবর্তী দিনের বিদ্যুতের লেনদেন হয়। অন্যদিকে, রিয়েল-টাইম বাজারে স্বল্প সময়ের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ কেনাবেচা করা হয়। এই দুই ব্যবস্থার সমন্বয়ে নেপাল একদিকে দীর্ঘমেয়াদি বা মধ্যমেয়াদি ক্রেতাদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ পায়, অন্যদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় বিক্রি করতে পারে। দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হয়। মধ্যমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের হরিয়ানা ও বিহারে বিদ্যুৎ পাঠানো হয়। তিন মাসে রপ্তানি আয় ১,৬১৫ কোটি রুপি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৬.১৫১৩ বিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ১ হাজার ৬১৫.১৩ কোটি রুপি। এনইএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠার বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই সময়ে ভারতে সরবরাহ করা মোট বিদ্যুতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গেছে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায়। বাকি বিদ্যুৎ বিক্রি হয়েছে ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। এতে বোঝা যায়, নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানিতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও বাজারভিত্তিক লেনদেন—দুই ব্যবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের জন্য কী তাৎপর্য? নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় বাংলাদেশ-নেপাল বিদ্যুৎ বাণিজ্যের নির্ধারিত কার্যক্রম আবার সচল হয়েছে। ভারতের সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই সরবরাহ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রতিবেশী দেশের জলবিদ্যুৎ যুক্ত করার একটি আঞ্চলিক মডেল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের ক্ষেত্রে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে বিকল্প কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানি চালু করা এবং একই সময়ে ভারতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সক্ষমতা তুলে ধরে। কিন্তু দুর্যোগের কারণে উৎপাদন অবকাঠামোর ঝুঁকি, বিকল্প কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা এবং আন্তদেশীয় সঞ্চালন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ভবিষ্যতেও এই বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সৌদি আরবে গিয়ে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের দুই নাগরিক। সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশটিতে যাওয়ার পর তাঁদের একজন ছিলেন জেদ্দার সংশোধনাগারে, অন্যজন নারী কারাগারে। পরিবারও জানত, তাঁরা কারাগারে আছেন। কিন্তু কী অভিযোগে আটক, তাঁদের বিরুদ্ধে কী মামলা চলছিল কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে—এসব বিষয়ে পরিবারের কাছে স্পষ্ট তথ্য ছিল না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কনস্যুলেটের কাছে থাকা বন্দিদের তালিকাতেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য উল্লেখ ছিল না বলে সরকারি নথিতে উঠে এসেছে। এরপর ১৪ অক্টোবর মক্কায় কার্যকর হয় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড। তাঁদের পরিচয়, আটকের সময়, মামলার বিবরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সামনে আসে একাধিক প্রশ্ন। সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত করেছিল কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুতর উদ্বেগ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ নথি এবং নিহত নারীর পরিবারের বক্তব্য এই ঘটনার বিভিন্ন দিক সামনে এনেছে। নথি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার ২০২৩ সালের আগস্টে পৃথক অভিযোগে আটক হন। কিন্তু বন্দিদের যে তালিকা কনস্যুলেট পেয়েছিল, তাতে তাঁদের কারও মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল না। প্রশ্ন উঠছে—বিদেশের কারাগারে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলা, সাজা ও নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা কার্যকর? আর মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের পক্ষে আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা জানার উপায় কী? ১৯০ মৃত্যুদণ্ড, ১১৬ জন মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিসংখ্যানও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে দেশটিতে ১৯০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১৬ জন মাদক চোরাচালানের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এই ১১৬ জনের মধ্যে ৮০ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। এএফপি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য সংরক্ষণ করে এই হিসাব দিয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের দেশভিত্তিক পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ফলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ওই ৮০ বিদেশির মধ্যে কোনো বাংলাদেশি ছিলেন কি না, তা এ তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একইভাবে, মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি ওই ১৯০ জনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কি না, এএফপির প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি সৌদি আরবে সন্ত্রাসবাদের দায়ে ইস্টার্ন প্রভিন্সে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ইউসেফ আল-মানাসিফ (৩০) নামে সৌদি আরবের আরেক নাগরিকও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কিশোর বয়সে আরব বসন্তের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। এএফপির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটেও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য মৃত্যুদণ্ডকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। দেশটির দাবি, আপিলের সুযোগ শেষ হওয়ার পরই এ শাস্তি কার্যকর করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ। গত জানুয়ারি থেকে সৌদি আরবে সন্ত্রাসবাদের দায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। আগের বছর একই অঞ্চলে ৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। গোপনীয় নথিতে কী আছে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি উঠে এসেছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাঠানো নথিতে। রোববার, ১৮ অক্টোবর, কনস্যুলেটের শ্রম উইং থেকে পাঠানো একটি ‘গোপনীয়’ চিঠি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়। চিঠিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয় হিসেবে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম উল্লেখ করা হয়। নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছিল। পরদিন, ২ আগস্ট, ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেট যে বন্দিদের তালিকা পেয়েছিল, সেখানে তাঁদের আটকের তথ্য ছিল। নজরুল ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি ছিলেন জেদ্দা মহিলা কারাগারে। দুজনই ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে তালিকাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল। ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলেও নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলামে কোনো তথ্য ছিল না। তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে—এমন তথ্যও ওই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি। কনস্যুলেটের নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের নজির তাদের জানা নেই। তবে এ বক্তব্যকে সৌদি আরবে এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো নজির নেই—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও বিচারিক রায় যাচাই করা প্রয়োজন। নথি থেকে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা ও সাজা সম্পর্কে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কতটা তথ্য পেয়েছিল? বন্দিদের তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকলে সেই তথ্য হালনাগাদ করার দায়িত্ব কার ছিল? আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের পক্ষে আইনি সহায়তা বা কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া রায়ের অনুলিপি, অভিযোগপত্র, আদালতের কার্যবিবরণী এবং সাজা কার্যকরের সরকারি নথি প্রয়োজন। সৌদি কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে জানায়নি: কনস্যুলেটের অভিযোগ কনস্যুলেটের পাঠানো নথিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি। এমন দাবি সত্য হলে তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের তথ্যপ্রাপ্তি ও নাগরিক সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কোন পর্যায়ে কনস্যুলেটকে অবহিত করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। ঘটনার পর কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়েছে। এতে দুই বাংলাদেশির মামলার রায়ের অনুলিপি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। কনস্যুলেট জানিয়েছে, রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হবে। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি কার্যকরের আগে বাংলাদেশের নাগরিকদের আইনি অবস্থান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মামলার জন্য নয়, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ পথে সৌদি আরব, তারপর কারাগার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি প্রক্রিয়ায় যাওয়া কর্মীদের পরিচয়পত্র দেয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো—বিএমইটি। নজরুল ও সুইটি, দুজনেরই এ ধরনের পরিচয়পত্র ছিল বলে জানানো হয়েছে। এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে অন্তত বোঝা যায়, তাঁরা বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করার সময় সরকারি ব্যবস্থার আওতায় ছিলেন। তবে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়া মানেই পরবর্তী সময়ে কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, কোনো অভিযোগে আটক হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত—এমনটিও নয়। এ ক্ষেত্রে বিচারিক রায় ও মামলার প্রমাণই নির্ণায়ক। নথি অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে সুইটির পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় ২০২২ সালের মে মাসে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিএমইটির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সরকারি লোগো সংবলিত পরিচয়পত্রে বলা হয়েছে, কার্ডধারী ব্যক্তি বিমা-সুবিধা এবং কল্যাণসেবা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কারাগারে আটক হওয়ার পর তাঁর পরিবার কতটা সহায়তা পেয়েছিল, কীভাবে মামলা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অজানা ছিল অভিযোগ ও মামলার পরিণতি সুইটি আক্তারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে তাঁর কারাবন্দি থাকার কথা তাঁরা জানতেন। কিন্তু ঠিক কী অপরাধে তিনি আটক হয়েছিলেন, কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে মামলার বিচার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তা তাঁরা জানতেন না। পরিবারের দাবি, সুইটি সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এবং টাকা পাঠাতেন। পরে যোগাযোগ কমে যায়। একপর্যায়ে সৌদি আরবে থাকা আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, সুইটি কারাগারে রয়েছেন। সুইটির বড় বোনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। পরে কারাগারে থাকার বিষয়টি জানালেও অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি তাঁদের এ বিষয়ে বেশি প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলেন এবং দেশে ফিরে সব জানাবেন বলেছিলেন। বড় বোনের বর্ণনায়, সুইটি একবার বলেছিলেন, তাঁরা কয়েকজন নারী একই কক্ষে থাকতেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গাড়ি কেনার ঘটনায় মালিক তাঁদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তবে এই বক্তব্যের অর্থ কী, গাড়ি কেনার অভিযোগের সঙ্গে সুইটির মামলার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, কিংবা এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো নথি রয়েছে কি না—তা নিশ্চিত নয়। পরিবারের এই বর্ণনা থেকে সুইটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য আদালতের রায় ও মামলার নথি অপরিহার্য। সুইটির বড় বোন আরও জানান, পাঁচ বোনের মধ্যে সুইটি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে তিনি সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিলেন। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। দুই বছর সংসার করার পর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০২৩ সালে তিনি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না; তিনি নিজের বোনের মেয়েকে লালন-পালন করতেন বলে তাঁর বাবা জানিয়েছেন। সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস সুইটি নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর সেই অর্থ পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের জন্য তাঁর উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া ছিল আর্থিক সংকটের আরেকটি কারণ। মৃত্যুদণ্ডের খবর জানল পরিবার ফেসবুক থেকে সুইটির পরিবারের দাবি, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তাঁরা আগেভাগে জানতে পারেননি। বড় বোন জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে তাঁরা প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সুইটির এক বান্ধবী ফোন করে খবরটি জানান এবং পরে একটি ভিডিও পাঠান। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, সুইটি কারাগার থেকে সাধারণত ১৫ দিন বা এক মাস পরপর ফোন করতেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের সপ্তাহেও তিনি ফোন করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি। তবে সেদিন টেলিফোন লাইনে সমস্যার কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরিবারের আরেক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগের মঙ্গলবারও সুইটি ফোন করেছিলেন। কিন্তু তখনও পরিবার তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানত না। পরিবারের এই বক্তব্যের সঙ্গে কনস্যুলেটের নথিতে মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে অবহিত না হওয়ার দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। তবে দুটি বক্তব্য একসঙ্গে থাকলেও এর মাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। সেটি নির্ধারণ করতে হলে সৌদি আইনে প্রযোজ্য বিধান, বিচারপ্রক্রিয়ার নথি এবং দুই দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ যাচাই করতে হবে। তবু ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছেছিল কি না, বন্দির সঙ্গে শেষবার যোগাযোগের সুযোগ কী ছিল এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কী ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল? নজরুলের বিষয়ে এখনো অস্পষ্টতা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অন্য বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম আব্দুল বশিরের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। কনস্যুলেটের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে তাঁকে আটক করা হয়। তিনি জেদ্দা সংশোধনাগারে বন্দি ছিলেন এবং ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, মামলার প্রমাণ কী, কোন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং আপিলের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি। সুইটি আক্তারের মতো নজরুলের ক্ষেত্রেও বন্দিদের তালিকায় অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ কিংবা মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। দুই ব্যক্তির মামলার প্রকৃতি পৃথক হলেও তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ কী তথ্য পেয়েছিল, তা একই ধরনের জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে, দুই নাগরিকই দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে নথিতে উঠে এসেছে। সৌদি আরবে ৩০৬ বাংলাদেশি বন্দি কনস্যুলেটের নথিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে ৩০৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। এ ছাড়া সাইবার অপরাধের তিনটি পৃথক মামলার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ছিল। এই পরিসংখ্যান প্রবাসী বাংলাদেশিদের কারাবন্দি হওয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরে। তবে শুধু এ তথ্য দিয়ে সৌদি আরবে মোট কতজন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন, তাঁদের কতজন বিচারাধীন, কতজন সাজাপ্রাপ্ত কিংবা কতজনের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে—তা নির্ধারণ করা যায় না। কারাবন্দি নাগরিকদের সংখ্যা ও তাঁদের মামলার অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ, আইনি সহায়তার প্রাপ্যতা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করা—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। তাঁদের কারাবন্দি হওয়ার পর পরিবার প্রায়ই আয়ের পাশাপাশি তথ্যের সংকটেও পড়ে। সুইটির পরিবারের বক্তব্যে সেই সংকটের একটি চিত্র দেখা যায়। টাঙ্গাইলের পরিবার, প্রশাসনের সীমিত ভূমিকা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তিনি ওই নারীর বাড়ি ও বাবার পরিচয় সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তবে তখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি বলে তিনি জানান।প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং মরদেহ দেশে আনার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দেশে আনার আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এদিকে, সুইটির পরিবারের দাবি, তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আগে জানতেন না। ফলে মরদেহ দেশে আনার আবেদন, আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য পরিবারকে কী সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৃত্যুদণ্ডের আগে কূটনৈতিক সহায়তা কতটা কার্যকর ছিল? সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি, আদালতের রায় এবং সাজা কার্যকরের সরকারি আদেশ সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁদের আটকের পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের নথি যাচাই করা দরকার। তৃতীয়ত, তাঁরা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, আপিল করেছিলেন কি না এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কী ছিল—এসব তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কনস্যুলেটের মধ্যে বন্দিদের তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বন্দিদের তালিকায় কারও বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকলে তা শনাক্ত ও হালনাগাদ করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও তদন্তের বিষয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কেবল একটি গোপনীয় নথি বা পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে নথিতে বর্ণিত তথ্য ও পরিবারের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তথ্যপ্রাপ্তি এবং কূটনৈতিক সহায়তার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। এখন প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুমান নয়, নথিভিত্তিক সত্য উদ্ঘাটন। কোন অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আদালত কী প্রমাণ পেয়েছিলেন, আপিলের সুযোগ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে কোনো পর্যায়ে জানানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে, সুইটির পরিবারের মতো যেসব পরিবার বিদেশে বন্দি স্বজনের বিষয়ে সীমিত তথ্য পায়, তাদের জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মসংস্থানের আগে সরকারি ছাড়পত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া হলেও বিদেশে আটক হওয়ার পর নাগরিকদের সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, সেটিও মূল্যায়ন করা দরকার। কনস্যুলেট ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। সেই নথি হাতে পাওয়ার পর মামলার প্রকৃত অবস্থা, সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হতে পারে। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তাই শুধু দুটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, কূটনৈতিক সহায়তা এবং সরকারি জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব নথি সংগ্রহ, তথ্যের অসংগতি যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা।