ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন:
নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয় গভীর অসন্তোষ।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় একদলীয় বাকশালব্যবস্থা। সংকুচিত হয়ে পড়ে বহুদলীয় রাজনীতির পরিসর।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অস্থিরতা এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুতর সংকটের মুখে পড়ে।
এমন এক অস্থির সময়ের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ইতিহাসে আসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। দিনটি শুধু একটি সামরিক পালাবদলের ঘটনা ছিল না; বরং এর মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক গতিপথ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা ঘটে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
এই ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—সামরিক কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফ, জাসদ-সংশ্লিষ্ট বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতা কর্নেল আবু তাহের এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।
তিনজনের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য এক ছিল না। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন করে ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হয়। অন্যদিকে কর্নেল তাহের ও তাঁর অনুসারীরা সৈনিকদের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সামরিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন।
৭ নভেম্বর ভোরে সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। খালেদ মোশাররফের ক্ষমতার অবস্থান ভেঙে পড়ে এবং তিনি নিহত হন। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান নতুন মাত্রা পায়।
এই পর্যায়ে সিপাহি-জনতার সমর্থন জিয়াউর রহমানকে ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করে। তবে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল এবং কার রাজনৈতিক লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের উত্থানের পেছনে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিচিতি, সামরিক বাহিনীতে অবস্থান এবং জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত তাঁর ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ও আলোচিত করে তোলে।
অন্যদিকে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। জাসদের বিপ্লবী রাজনীতিও দেশকে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয় বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের কাছে একটি অংশের মানুষ স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের প্রত্যাশা করেছিল। ৭ নভেম্বরের পর তাঁর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়।
তবে ঘটনাটিকে কেবল একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সৈনিকদের অসন্তোষ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলেই ৭ নভেম্বরের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের প্রভাব বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় অবস্থানে উঠে আসেন। তাঁর শাসনামলে অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
একদলীয় বাকশালব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। নিষিদ্ধ বা বিলুপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। আওয়ামী লীগও নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ ফিরে পায়।
একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও বিতর্কের বিষয়।
জিয়াউর রহমানের সমর্থকদের মতে, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তিনি সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসর উন্মুক্ত না করলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ সম্ভব ছিল না।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনর্বাসন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নতুন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাত, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং বাজারমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ বাড়ানো, শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া এবং বৈদেশিক সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অর্থনীতির নতুন গতিপথ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
এই সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়। গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এনজিও খাত ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিকাশও এই সময়ের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে যুক্ত।
জিয়াউর রহমানের সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করেছিল।
তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে শুধু একটি সরকারের অবদান হিসেবে মূল্যায়ন করা যথার্থ হবে না। পরবর্তী সরকারগুলোর নীতি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা, বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠছেন, তখন বিশ্বজুড়েও সামরিক অভ্যুত্থান ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটছিল।
লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে সামরিক শাসন চলছিল। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দের সরকার উৎখাতের পর অগুস্তো পিনোশের সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনাতেও ১৯৭৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসন শুরু হয়।
আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রভাব ছিল। লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের রাজনৈতিক কাঠামোতে সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে ছিল না। তবে জিয়াউর রহমানের শাসনামলের মূল্যায়নে শুধু সামরিক ক্ষমতা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি নয়, তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি বিপরীত মূল্যায়ন রয়েছে।
তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেন, অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করেন এবং জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে সামনে আনেন। তাঁদের কাছে ৭ নভেম্বর ছিল জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর সামরিক ও বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
বিশেষ করে তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া, সামরিক আইন, রাজনৈতিক দল পুনর্গঠন এবং পরবর্তী নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক এখনো অব্যাহত।
ফলে ৭ নভেম্বরকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আবেগের পাশাপাশি ঐতিহাসিক দলিল, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
এই দিনটি দেশের ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে দেয়। জিয়াউর রহমানের উত্থানের পথ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনীতি, বাজারমুখী অর্থনীতি এবং নতুন রাজনৈতিক ধারার বিকাশে এর প্রভাব পড়ে।
৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে দৃশ্যমান ছিল।
দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যের অধিকারী, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
স্বাধীনতার পর বিভক্ত, বিপর্যস্ত ও অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথে ৭ নভেম্বর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। সেই অধ্যায়ের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে তাই ৭ নভেম্বরকে শুধু একটি অভ্যুত্থান হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক ঐক্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং গণতন্ত্রের গতিপথ নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয় গভীর অসন্তোষ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় একদলীয় বাকশালব্যবস্থা। সংকুচিত হয়ে পড়ে বহুদলীয় রাজনীতির পরিসর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অস্থিরতা এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুতর সংকটের মুখে পড়ে। এমন এক অস্থির সময়ের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ইতিহাসে আসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। দিনটি শুধু একটি সামরিক পালাবদলের ঘটনা ছিল না; বরং এর মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক গতিপথ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর: ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। এই ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—সামরিক কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফ, জাসদ-সংশ্লিষ্ট বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতা কর্নেল আবু তাহের এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। তিনজনের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য এক ছিল না। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন করে ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হয়। অন্যদিকে কর্নেল তাহের ও তাঁর অনুসারীরা সৈনিকদের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সামরিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। খালেদ মোশাররফের ক্ষমতার অবস্থান ভেঙে পড়ে এবং তিনি নিহত হন। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান নতুন মাত্রা পায়। এই পর্যায়ে সিপাহি-জনতার সমর্থন জিয়াউর রহমানকে ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করে। তবে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল এবং কার রাজনৈতিক লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে। জিয়াউর রহমান কেন হয়ে উঠলেন ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র? ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের উত্থানের পেছনে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিচিতি, সামরিক বাহিনীতে অবস্থান এবং জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণাসংক্রান্ত তাঁর ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ও আলোচিত করে তোলে। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। জাসদের বিপ্লবী রাজনীতিও দেশকে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয় বলে সমালোচকেরা মনে করেন। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের কাছে একটি অংশের মানুষ স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের প্রত্যাশা করেছিল। ৭ নভেম্বরের পর তাঁর অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়। তবে ঘটনাটিকে কেবল একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সৈনিকদের অসন্তোষ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলেই ৭ নভেম্বরের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। বাকশাল থেকে বহুদলীয় রাজনীতির পথে ৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের প্রভাব বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় অবস্থানে উঠে আসেন। তাঁর শাসনামলে অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। একদলীয় বাকশালব্যবস্থার পরিবর্তে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। নিষিদ্ধ বা বিলুপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। আওয়ামী লীগও নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ ফিরে পায়। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও বিতর্কের বিষয়। জিয়াউর রহমানের সমর্থকদের মতে, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তিনি সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিসর উন্মুক্ত না করলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনর্বাসন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। অর্থনীতিতে পরিবর্তন: রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থেকে বাজারমুখী উদ্যোগ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নতুন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাত, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং বাজারমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ বাড়ানো, শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া এবং বৈদেশিক সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অর্থনীতির নতুন গতিপথ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়। গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এনজিও খাত ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিকাশও এই সময়ের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারার সঙ্গে যুক্ত। জিয়াউর রহমানের সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করেছিল। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে শুধু একটি সরকারের অবদান হিসেবে মূল্যায়ন করা যথার্থ হবে না। পরবর্তী সরকারগুলোর নীতি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা, বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠছেন, তখন বিশ্বজুড়েও সামরিক অভ্যুত্থান ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটছিল। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে সামরিক শাসন চলছিল। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দের সরকার উৎখাতের পর অগুস্তো পিনোশের সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনাতেও ১৯৭৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসন শুরু হয়। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রভাব ছিল। লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের রাজনৈতিক কাঠামোতে সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে ছিল না। তবে জিয়াউর রহমানের শাসনামলের মূল্যায়নে শুধু সামরিক ক্ষমতা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি নয়, তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নির্বাচন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা, নাকি সামরিক শাসনের নতুন অধ্যায়? জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি বিপরীত মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেন, অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করেন এবং জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে সামনে আনেন। তাঁদের কাছে ৭ নভেম্বর ছিল জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর সামরিক ও বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া, সামরিক আইন, রাজনৈতিক দল পুনর্গঠন এবং পরবর্তী নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক এখনো অব্যাহত। ফলে ৭ নভেম্বরকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আবেগের পাশাপাশি ঐতিহাসিক দলিল, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি। ৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ? ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই দিনটি দেশের ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে দেয়। জিয়াউর রহমানের উত্থানের পথ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনীতি, বাজারমুখী অর্থনীতি এবং নতুন রাজনৈতিক ধারার বিকাশে এর প্রভাব পড়ে। ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে দৃশ্যমান ছিল। দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যের অধিকারী, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার পর বিভক্ত, বিপর্যস্ত ও অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথে ৭ নভেম্বর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। সেই অধ্যায়ের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে তাই ৭ নভেম্বরকে শুধু একটি অভ্যুত্থান হিসেবে নয়, বরং স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক ঐক্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং গণতন্ত্রের গতিপথ নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাসস: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশে জুলাই আগস্ট মাসে যে আন্দোলন হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে ছিল জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে। জনগণ যখন সম্পূর্ণভাবে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে, তখনই আন্দোলন সফল হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পরিষ্কারভাবে সাফ বলে দিয়েছি এই জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের সর্বস্তরের জনগণের। এর কৃতিত্ব কোন একক ব্যক্তি, একক কোন রাজনৈতিক দলের এটি কোন ক্রেডিট নয়। বিগত ১৭ বছর এই দেশের মানুষ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরও অনেকগুলো রাজনৈতিক দল সবাই ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল। মাঠ ছেড়ে আমরা কখনো চলে যাইনি। আমরা কখনোই জনগণকে একা ফেলে মাঠ ছেড়ে চলে যাইনি।’ আজ মঙ্গলবার বিকেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ-এ (কেআইবি) ‘গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনিবার সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম কথা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে- এখন সময় হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন করার। এখন সময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের ব্যাপারে ধৈর্য সহকারে ঠান্ডা মাথায় তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। জনগণকে সতর্ক করা এবং ঠিক একইভাবে আমরা যেই পরিকল্পনা জনগণের সামনে দিয়েছি, আমরা জনগণের জন্য যা করতে চাইছি, দেশকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা যা করতে চাইছি, সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা। জনগণের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা।’ বিএনপি জনগণের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা নিয়ে এগিয়ে চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপিই প্রথম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশের মানুষের সামনে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেছিল, যা পরবর্তীতে রাজপথের মিত্র দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ৩১ দফায় রূপ নেয়। গত সাধারণ নির্বাচনে দেশের জনগণ এই ৩১ দফায় পূর্ণ আস্থা ও ম্যান্ডেট দিয়েছে। ফলে এটি আর কেবল বিএনপির একক রূপরেখা নয়, বরং এটি দেশের সমগ্র জনগণের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে।’ সরকার পরিচালনার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ’১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখা গেছে স্বৈরাচারী শাসনামলের বিগত ১৭ বছরে দেশের প্রতিটি খাতকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বিভাজিত প্রশাসনের মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার তাতক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখনো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।’ জ্বালানি সংকটের সাময়িক কষ্ট স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার ‘পেট্রোনাস’ কোম্পানির সাথে আলোচনা চুড়ান্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কনটেইনারের মাধ্যমে এলএনজি গ্যাস দেশে আনা হবে। এর ফলে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করে দ্রুততম সময়ে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশীয় শক্তি বৃদ্ধি করতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অকার্যকর রাখা ‘বাপেক্স’-কে পুনরুজ্জীবিত করে দুটি নতুন রিগ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে বিশাল এলাকায় নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলছে, যেখানে চীনা ও কোরিয়ান বিনিয়োগ আসবে। পাশাপাশি বিটিএমসি-র বন্ধ পড়ে থাকা প্রায় ৫০টি মিল-কারখানা বেসরকারি খাতে চালু করে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ ফান্ড চালু করা হয়েছে।’ স্বাস্থ্যখাতের আমূল পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সকল উপজেলা হাসপাতালে ন্যূনতম ১০ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট চালু করা হবে। ইতিমধ্যেই জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ডায়ালিসিস সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এছাড়া বাজেটে ডিউটি ও ট্যাক্স কমিয়ে হার্টের রিং (স্টেন্টিং), ডায়ালিসিস, চোখের লেন্স এবং আইটি উপকরণের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা হয়েছে।’ শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শিক্ষা কার্যক্রমকে আনন্দের মাধ্যমে শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) ধারণায় ঢেলে সাজাতে চাই। আমাদের সন্তানরা কী চায়, তা বুঝতে হবে এবং তাদের জন্য সঠিক পথ তৈরি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সর্বদা দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেছেন; সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও জনগণের সেবায় নিবেদিত।’ তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সম্প্রতি প্রাইমারি স্কুল পর্যায়ে ২২ লক্ষ শিশুর ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং ১২-১৪ বছর বয়সীদের জন্য নতুন গতি স্পোর্টস প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। তরুণদের মেধা ও শক্তি বিকাশে সঠিক পথ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।’ জনগণের মৌলিক চাহিদার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সাধারণ মানুষ রাজপথে শান্তি চায়, সন্তানের শিক্ষার সুব্যবস্থা চায়, উন্নত চিকিৎসা চায়, নিরাপত্তা চায় এবং নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ চায়। একই সাথে নাগরিকরা সময়মতো তাদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে চায়। জনগণের এই চাওয়াগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও অসংখ্য অরাজনৈতিক সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকার এবং দলের সাধ্যমতো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছি এবং থাকব।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন তাদের সুচিকিৎসা এবং যাদের কর্মসংস্থান প্রয়োজন তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।’ পরিশেষে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিগত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পাশাপাশি দেশের শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। বিএনপি’র মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টি কাজী জাফর এর সভাপতি মোস্তফা জামান হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি,গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক নূর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ডক্টর ফরিদুজ্জামান ফরহাদ,জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এর মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন, ভাসানি জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, যুবদল, সেচ্ছাসেবকদল,কৃষকদল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা: আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রণীত বিদ্যমান আইন ব্যবহার করেই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম। রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা প্রায় ১৫ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে এবং দল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি আইনের আওতায় তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি জানান, শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ একাধিক নির্দিষ্ট মামলায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। বিদ্যমান আইন নিয়েই কেন আলোচনা? প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রণীত আইনই দলটির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এর ফলে নতুন আইন প্রণয়ন ছাড়াই বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে কোন নির্দিষ্ট আইনের কোন ধারা প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সরকারের অবস্থান এর এক দিন আগে, শনিবার (৪ জুলাই) জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনাকারী আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর রাজনীতি করতে পারবে না। মন্ত্রী দাবি করেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন ইতোমধ্যেই ঘটেছে এবং দলটি রাজনৈতিকভাবে আর পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে না। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা, প্রমাণ এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। এ কারণে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান এবং দলটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থা এখন তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। মূল বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির দাবি, বিদ্যমান আইনেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়ায় দলটিকে নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে বলে বক্তব্য। শাপলা চত্বরসহ একাধিক মামলায় শেখ হাসিনার বিচারিক কার্যক্রমের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।