বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত প্রায় আঠারো মাসের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্নে নানা আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর এই সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা এবং সেই হিসেবেই তাদের সাফল্য- ব্যর্থতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সরকারের দিক থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, এ সরকারের মূল্য লক্ষ্য ছিল তিনটি- সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার' এবং সরকার ঘোষিত রূপরেখার মধ্যেই সংসদ নির্বাচন আয়োজন।এসব ক্ষেত্রে 'সফল' কিংবা যথেষ্ট অগ্রগতির দাবি করা হচ্ছে সরকারের দিক থেকে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার মোটা দাগে তিন এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য দেখালেও সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে সংস্কার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে 'বিচার নাকি প্রতিশোধ' সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তারা মনে করেন, শুরু থেকেই মব সংস্কৃতি এমনভাবে চলেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে একটি শক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে।
এছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার পাশাপাশি নারীর সমতার ক্ষেত্রটিও এ সরকারের আমলে বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক ভালো করলেও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিকে এগুতে পারাটাও সরকারের একটা সাফল্য বলে মনে করেন তিনি।টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কারের বিষয়ে সরকার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে 'বিচার নাকি প্রতিশোধ' সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার চাইলে এড়াতে পারতো বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মব সন্ত্রাস, যাদের হামলায় গত দেড় বছরে আক্রান্ত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন থেকে শুরু করে বহু মাজার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০০৪ সালের ৮ই অগাস্ট ক্ষমতায় এসেছিল মি. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার। এরপর তিনি 'সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকেই' তার সরকারের মূল এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার চাপের মুখে প্রথমে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। পরে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সাথে আলোচনার পর সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেদিন একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে সরকার শুরুতেই রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক মোট এগারটি কমিশন গঠন করে এবং সেসব কমিশনের সুপারিশসহ রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত অন্তত ত্রিশটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্যে চারটি প্রশ্নে গণভোট হতে যাচ্ছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই। সরকার নিজেও সেই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেছে।
যদিও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সংস্কার কমিশন ও জুলাই চার্টারের কৃতিত্ব সরকার নিতে পারে।
"কিন্তু এটি পিক অ্যান্ড চুজ এবং এডহকিজমের শিকার হয়েছে। যে কারণে একদিকে শিক্ষাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার কমিশনই হয়নি, আবার যেসব বিষয়ে হয়েছে সেগুলোর অনেক কিছু সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আসলে সংস্কারের যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটি সরকারের বিবেচনাতেই ছিল না,' বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
যদিও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এর এক আলোচনায় বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যতটা সংস্কার হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে তেমনটি এর আগে আর হয়নি।
তবে গণভোটে 'না' ভোট জয়ী হলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সব সংস্কার উদ্যোগ ভেস্তে যায় কি-না তা নিয়েও অনেকের মধ্যে কৌতূহল আছে।
বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সংস্কারের পরেই গুরুত্ব পেয়েছে 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার'। ইতোমধ্যেই একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার অপর আসামি পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে ( রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১৭ই নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করে।
এছাড়াও গত অক্টোবরে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে হত্যার অভিযোগে মোট ৮৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে"।
এর মধ্যে ৪৫টি মামলার বিচারকাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। এ ছাড়া তখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতে পুলিশ ১৯টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল। এসব হত্যা মামলা বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।
তবে সরকারের শুরু থেকেই ঢালাও হত্যা মামলা এবং এসব মামলায় শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে জড়িত করা নিয়ে সমালোচনা হয়ে আসছে।
ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, সাংবাদিকসহ অনেকের বিরুদ্ধে অনেক হত্যা মামলা হয়েছে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রশ্নবিদ্ধভাবেও অনেককে আটক রাখা হয়েছে, যার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
"আবার যেসব মামলায় বিচার হচ্ছে, তাও কতটা প্রভাবহীন ও স্বচ্ছ- সেই প্রশ্নও আছে। তাই সত্যিকার অর্থেই বিচার নাকি প্রতিশোধ—সেই প্রশ্ন উঠবে। এটি সরকার চাইলে এড়াতে পারতো। ঢালাও মামলার কারণে সত্যিকার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, আর মব সন্ত্রাস। এই সময়কালে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এমনকি এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বসত বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্র হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারের দিক থেকে সবসময়ই বলা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলার বেশিরভাগ ঘটনা রাজনৈতিক কারণেই ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর – অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, অধ্যাপক ইউনূসের সরকার গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসেছিল এবং সে কারণে সরকারের সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জই ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।
"সবদিক বিবেচনা করলে এ তিনটির মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার অন্যগুলোর চেয়ে তুলনামূলক ভালো করেছেন। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফলতা হলো তার নির্বাচনের দিকে এগিয়েছে। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যেভাবে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রকট হয়ে এসেছে ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনার পর। গত ১৮ই ডিসেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে ওই হামলা চললেও সরকারের দিক থেকে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, " এই মব কালচারের পেছনে থাকা অতি ক্ষমতায়িত শক্তিকে ম্যানেজ করতে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারের ব্যর্থতায় এই শক্তি উৎসাহিত হয়েছে"।
এর আগে সরকারের শুরু থেকেই সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সূফী-দরবেশ-বাউলদের মাজার আক্রান্ত হতে শুরু করে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের আক্রান্ত হবার ঘটনাও গত আঠারো মাসে বারবার আলোচনায় এসেছে।
এক বছর আগে ২০২৫ সালের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো, ২০২৪ সালের ৪ঠা অগাস্টের পর থেকে পরবর্তী ৫ মাসেই সারাদেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিলো পুলিশ।
এরপরেও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উল্টো নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে।
পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় জুড়েই বিভিন্ন সময়ে নারীদের আক্রান্ত হবার ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে নারী সংস্কার কমিশনের রিপোর্টকে ঘিরে নারীদের আক্রমণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় নারীদের হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছর মার্চে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, "সম্প্রতি নারীদের ওপর যে জঘন্য হামলার খবর আসছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এটি 'নতুন বাংলাদেশ' এর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তার সম্পূর্ণ বিপরীত"।
কিন্তু তার পর থেকে সেই পরিস্থিতির আদৌ উত্তরণ হয়েছে কি-না, সেই প্রশ্ন আছে।
"নারীর সমতার ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাই এসেছে এ সরকারের সময়ে। কারণ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারের ব্যর্থতায় মুক্তিযুদ্ধ, বাক স্বাধীনতা, নারীর সমতাসহ ৭১ ও ২৪ এর মৌলিক চেতনার বিষয়গুলোই ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ সরকার এসবের ওপর আঘাত প্রতিহত করার সৎ সাহস সরকার দেখাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে যারা আঘাত করেছে সেই শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ডঃ ইফতেখারুজ্জামান।
প্রধান উপদেষ্টার দফতরের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাহলো- সংস্কার ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করাকে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে সরকার।
বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে রূপান্তরের জন্য জুলাই ঘোষণাপত্র ও সনদ স্বাক্ষর এবং ২৫টির মতো ডান, বাম মধ্যপন্থী দলগুলোর মধ্যে অন্তত ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোকেই বড় অর্জন হিসেবে সরকারের লোকজন মনে করছে।
তাছাড়া সরকার মনে করে, সবকিছুতে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা গেলেও কোন কোনো জায়গায় সংস্কার দরকার এবং সেখানে করনীয় কি সেটি সরকার চিহ্নিত করতে পেরেছে সংস্কার কমিশনগুলোর মাধ্যমে।
ইতোমধ্যেই সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে আরপিওতে সংশোধনী আনা হয়েছে।
আর বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার একটি মামলার রায় ছাড়া গুম খুনের বিচার শুরু করাকে অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার। কারণ সরকার বলছে, মামলাগুলোর তদন্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন ছাড়াও দ্রুত বিচারের জন্য যা যা করণীয় সেসব পদক্ষেপও যথাসময়ে সরকার নিতে পেরেছে।
এছাড়া গুম খুনের মামলায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনাকেও সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন বলে সরকারের দিক থেকে মনে করা হচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার পরপরই আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া 'আর্থিক খাতের দুর্নীতি' নিয়ে একটি শ্বেতপত্রও প্রকাশ হয়েছে সরকারের উদ্যোগে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, "উত্তরাধিকার সূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে"।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার যা আইএমএফ এর ঘোষিত পদ্ধতি অনুযায়ী এখন ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এছাড়া ব্যাংক খাতেও স্বস্তি ফিরে আসার দাবি করছে সরকার এবং এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুর্বল ৫টি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারেনি। চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
তবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারাটা তাদের জন্য একটি সাফল্য, বিশেষ করে গত বছর রোজায় দ্রব্যমূল্য খুব একটা বাড়েনি বলেই মনে করছেন তারা
যদিও চালের দাম না কমার কারণে খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমেনি বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন।
তবে সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ব্যর্থতা, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ সত্ত্বেও সরকার মনে করছে এর বেশিরভাগ ঘটনাই রাজনৈতিক।
সরকার বলেছে, এ সরকারের আমলে দুটি দুর্গাপূজায় অঘটন ঘটেনি।
সরকারের দিক থেকে সাফল্য হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথাও বলা হচ্ছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় এখন বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সুপ্রিম কোর্টই করবে।
অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো 'অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং ছিলো। সে কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো কিন্তু সরকার পদক্ষেপ নেওয়ায় তা হয়নি'।
সরকার বলছে, জোরপূর্বক গুম, খুন বন্ধ হয়েছে এবং পুলিশ বাহিনীকে সক্ষম করে তোলা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে সরকার মনে করে।
তবে কারাগারে কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার বলছে, আগের মতো সরকার এগুলো প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারের শুরুর দিকে ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। পরে সরকার নিজেই সেটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এখন সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ছাড়া সরকারের পদক্ষেপের কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়নি বরং প্রেস ফ্রিডমের উন্নতি হয়েছে।
যদিও বেশ কিছু সাংবাদিককে আটক, টকশোতে সরকারের সমালোচনার পর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গ্রেফতার এবং সর্বোপরি প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনাগুলোকে মত প্রকাশ কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপরই হামলা হিসেবে বলছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার দীর্ঘ চার মাস পর অবশেষে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। শুক্রবার তেহরানে কড়া নিরাপত্তা ও গভীর শোকের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির ভেতরে ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর সাধারণ মানুষের সমর্থন কিছুটা দুর্বল হলেও, এই শেষকৃত্যের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও শক্তি দেখাতে চাইছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের ওই হামলায় খামেনির সঙ্গে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য মেয়ে, জামাতা, শিশু নাতনি ও পুত্রবধূও নিহত হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সাল থেকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা খামেনিকে আগামী বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার নিজ শহর মাশহাদে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। এর আগে তার মরদেহ কোমে এবং ইরাকের পবিত্র শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড প্রেয়ার হলে খামেনি ও তার পরিবারের কফিনগুলো প্রদর্শনের জন্য রাখার পর দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখা যায়। পাশে জেনারেলদের একটি দল কফিনকে স্যালুট জানিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে রেভল্যুশনারি গার্ডসের নতুন প্রধান আহমদ ওয়াহিদিও ছিলেন, যিনি গুপ্তহত্যার আশঙ্কায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কখনও জনসমক্ষে আসেননি। চলতি বছরের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং নতুন করে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝে এই বিশাল শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানটিকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছে ইরানি প্রশাসন। কফিনগুলো রাখা হয়েছিল একটি চমৎকার খিলানযুক্ত পটভূমির নিচে, সাদা রঙের একটি উঁচু বেদির ওপর। এর দুই পাশে জাতীয় পতাকা এবং কালো শোক পতাকা ওড়ানো হচ্ছিল, যা ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তিকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশ-চীন আলোচনায় নজর রাখছে ভারতবাংলাদেশ-চীন আলোচনায় নজর রাখছে ভারত কফিনের ওপর রাখা হয়েছিল একটি কালো পাগড়ি, যা মহানবী (সা.)-এর বংশধর ধর্মগুরুদের প্রতীক। এর পাশাপাশি রাখা ছিল একটি ভাঁজ করা চারকোনা চাদর, যা ইরানে বিপ্লবী আদর্শ এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ইরানের তাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থায় খামেনি কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই ছিলেন না, বরং নবম শতাব্দীতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতেন। ফলে শত্রুর হামলায় তার এই মৃত্যুকে শিয়া সম্প্রদায়ের চিরায়ত ‘শাহাদাত’ ও শোকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঝুলতে থাকা কালো পতাকাগুলো মূলত সপ্তম শতাব্দীতে শিয়া ইসলামের তৃতীয় ইমাম ইমাম হোসেনের শাহাদাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই পুরো রাষ্ট্রীয় ও প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি বড় ধরনের প্রশ্ন ও গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তিনি এই অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকলেও, রাজনৈতিক মহলে তার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহী বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে চরম উত্তেজনার কারণে এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নিরাপত্তার স্বার্থেই নেওয়া হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনিই মূলত সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ওই বিমান হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন বলে খবর মিলেছিল। এরপর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি এবং তার কার্যক্রম কেবল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত রেকর্ড করা বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইসলামী রীতি অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন করার নিয়ম থাকলেও, যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ সময় পর গত মাসের অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ভারতের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা। এছাড়া কংগ্রেস নেতা সালমান খুরশিদ এবং জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলও প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কারা, আমন্ত্রণ পাননি যারা খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে কারা, আমন্ত্রণ পাননি যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির। তেহরানে আবেগঘন পরিবেশে পাকিস্তানের এই নেতাদের স্বাগত জানান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি এবং স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের পাশে থাকা রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া আঞ্চলিক মিত্রতার প্রতীক হিসেবে হিজবুল্লাহর প্রয়াত নেতা হাসান নাসরুল্লাহর পরিবারের সদস্যরাও শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে এসেছেন। সোমবার তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে একটি বড় শোকমিছিলের পর মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে ইরানের শিয়া ধর্মীয় ব্যবস্থার কেন্দ্র কোমে। বুধবার ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে বৃহস্পতিবার মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা মাজারের কাছে খামেনির দাফন সম্পন্ন হবে। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিদায়ী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শুক্রবার থেকেই তেহরানে সমবেত হতে শুরু করেছেন বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক উপমন্ত্রী এবং খামেনির শেষকৃত্য কমিটির প্রধান আলি আকবর পুরজামশিদিয়ান জানিয়েছেন, আজ তেহরানে বিদেশি নেতা, কর্মকর্তা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। আগামী ৪ থেকে ৮ জুলাই ইরান ও ইরাকের বেশ কয়েকটি পবিত্র শিয়া নগরীতে খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা চলবে। এরপর ৯ জুলাই তার নিজ শহর মাশহাদে চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন হবে। তেহরানের রাষ্ট্রীয় শোকসভার মূল কেন্দ্র আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি মোসাল্লা মসজিদে এই আন্তর্জাতিক বিদায় অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইতোমধ্যে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল এবং ৯০ জনেরও বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কারা তেহরানে খামেনির শেষকৃত্যে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার-প্রধানরা অংশ নিচ্ছেন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমিদি এবং প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ইরানের পাশাপাশি ইরাকেও শোক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। খামেনির মরদেহ একদিনের জন্য ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। এছাড়া জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন ও আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান ইতোমধ্যে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। পাশিনিয়ান নিজেই একদিন আগে বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমি আগামীকাল যাবো এবং আগামীকালই ফিরে আসবো। অবশ্যই ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে।’ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান সংকটে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও তেহরানে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে থাকছেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। খামেনির জানাজা কেন ইরানি শাসনব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জখামেনির জানাজা কেন ইরানি শাসনব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ রাশিয়ার পক্ষে এই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করবেন দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ, যা ক্রেমলিন ও তার সচিবালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। চীন তাদের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান (সংসদের ডেপুটি স্পিকার) হে উই-কে পাঠাচ্ছে। আজারবাইজানের পক্ষ থেকে মিলি মজলিসের (সংসদ) স্পিকার সাহিবা গাফারোভা, উপপ্রধানমন্ত্রী শাহিন মুস্তাফায়েভ এবং নাখচিভান স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রের প্রধান জাব্বার মুসায়েভের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। এর পাশাপাশি কাতার, লেবানন, সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা, বেলারুশ ও উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি হামাস, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিরা তেহরানে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আমন্ত্রণ পায়নি যারা ফক্স নিউজের বরাতে জানা গেছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানালেও নয়াদিল্লি সেখানে তুলনামূলক ‘নিচু স্তরের প্রতিনিধি দল’ পাঠাচ্ছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এই প্রতিনিধিদলে থাকছেন পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা এবং বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সমর্থন করা দেশগুলোকে এই শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তিনি বলেন, খামেনির মৃত্যুর কারণ হওয়া হামলার নিন্দা না করায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্মান অর্জন করতে পারেননি। একই কারণে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক এই সমাবেশের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরানি পুলিশ বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দফতরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আব্দুল্লাহি শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে কোনও ধরনের হামলা না চালাতে আমেরিকা ও ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন। অন্যথায় ‘ইরানি জাতির সন্তানদের কাছ থেকে কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে বলে তীব্র হুমকি দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় (১৩১ দিন) পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার নিজস্ব কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর থেকে জুলাইয়ের শেষকৃত্যের আগ পর্যন্ত আইনি ও ধর্মীয় নির্দেশনাবলি মেনে মরদেহটি হিমাগারে ফরেনসিক মর্গে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ইসলামী রীতি অনুযায়ী মরদেহ দ্রুত, আদর্শগতভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বেশ কিছু মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই আনুষ্ঠানিকতা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রথমত, খামেনির মৃত্যুর পরপরই তেহরানসহ ইরানের অন্যান্য শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। সক্রিয় বিমান হামলার এই হুমকির মুখে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটানো এবং বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানানো অসম্ভব ও অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। গত জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পালন এবং সংঘাত থামানোর প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পরই কেবল বিশাল জনসমাগমের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় কর্তৃপক্ষ। আরাঘচি ও গালিবাফকে হত্যার ছক কষেছিল ইসরায়েলআরাঘচি ও গালিবাফকে হত্যার ছক কষেছিল ইসরায়েল তাছাড়া চলমান নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আশঙ্কার কারণে শীর্ষ নেতাদের জনসমক্ষে আসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলের সক্রিয় নজরদারি এবং হত্যার হুমকির কারণে খামেনির ছেলে তথা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান পুরোপুরি এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত একটি পরিবেশ তৈরি করতে ইরানি কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তারা যেকোনও মূল্যে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির শেষকৃত্যের মতো ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হুড়োহুড়ির পুনরাবৃত্তি এড়াতে চেয়েছিল। ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক রাসায়নিক দিয়ে মরদেহ সংরক্ষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায়, সাবেক এই নেতার মরদেহ সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করেছে। বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে ফরেনসিক মর্গগুলোর ভেতরে হিমঘরে মরদেহটি হিমায়িত করে রাখা হয়েছিল। যদিও এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, তবে শিয়া ফিকহ বা আইনশাস্ত্রে যুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতিতে দাফন বিলম্বিত করা এবং হিমায়িত সংরক্ষণাগারে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে। ফলে সরকারের জন্য এই ধর্মীয় ছাড় বা ফতোয়া পাওয়া সহজ হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির সেই বিমান হামলায় খামেনির সঙ্গে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও নিহত হন এবং তাদের মরদেহও খামেনির সঙ্গেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অবশেষে শুক্রবার (৩ জুলাই) আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং তার আত্মীয়দের কফিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ কমপ্লেক্সে এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠানের জন্য মরদেহটি সেখানে রাখা হয়েছে। এরপর ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরজুড়ে এক সপ্তাহব্যাপী বিশাল গণ-শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী শুক্রবার (৯ জুলাই) খামেনির নিজ শহর মাশহাদের অত্যন্ত সম্মানিত ও পবিত্র ইমাম রেজা মাজারে দাফনের মাধ্যমে এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় ও দাফন অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর কয়েক মাস পর আয়োজিত এই শেষকৃত্যের সময় তার মরদেহ ইরান এবং প্রতিবেশী ইরাকের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হবে। আরাঘচি ও গালিবাফকে হত্যার ছক কষেছিল ইসরায়েলআরাঘচি ও গালিবাফকে হত্যার ছক কষেছিল ইসরায়েল প্রায় চার দশক ধরে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়া খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন। তবে যুদ্ধ চলার কারণে এতদিন তার শেষ বিদায় স্থগিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই জানাজা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চলা বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী দমনপীড়নের ঠিক ছয় মাস পর এই আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে এর মাধ্যমে খামেনির পক্ষে কতটা জনসমর্থন রয়েছে, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করবে দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব। এই লক্ষ্যে সাধারণ জনগণ, সরকারি কর্মচারী এবং আধাসামরিক বাহিনীকে রাস্তায় নামাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তেহরানে খামেনির মরদেহ, শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরুতেহরানে খামেনির মরদেহ, শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি চলায় কর্তৃপক্ষ এখন এই অনুষ্ঠান আয়োজন ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে আনার সাহস পাচ্ছে। কারণ যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ইরানের একাধিক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছে, যার অন্তত একটির ক্ষেত্রে জনসমক্ষে আসার সূত্র ধরে তাদের ট্র্যাক করা হয়েছিল। তবে খামেনির ছেলে এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এই অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বাবার ওপর হওয়া ওই হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয় এবং বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। দিনব্যাপী শেষকৃত্যের কর্মসূচি শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ প্রদর্শনের মাধ্যমে এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যা রবিবারও চলবে। সোমবার তেহরানের রাস্তায় শোকমিছিল শেষে মরদেহটি ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শিয়াদের পবিত্র নগরী কোমে নিয়ে যাওয়া হবে এবং মঙ্গলবার সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। খামেনির কফিন হত্যাস্থলে নেওয়ার কারণ কীখামেনির কফিন হত্যাস্থলে নেওয়ার কারণ কী বুধবার খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরাকের কারবালায়, যেখানে শিয়া মুসলমানদের প্রতিরোধের প্রতীক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের মাজার রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, এই বুধবারেই খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভের বর্ষপূর্তি, যে আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন। দাফন হবে মাশহাদের পবিত্র মাজারে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরাক থেকে ফিরিয়ে আনার পর ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা মাজারে খামেনিকে দাফন করা হবে। ইমাম রেজা ছিলেন শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম। প্রতি বছর লাখ লাখ পুণ্যার্থী এই মাজার জিয়ারত করেন। ইরানি শিয়াদের মতে, যেকোনো দুঃখী বা পাপী ব্যক্তি এখানে এলে মুক্তি পান। এর আগে ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিসহ অনেক প্রখ্যাত শিয়া ধর্মগুরুকে এই মাজারে দাফন করা হয়েছে। খামেনির শেষ বিদায়ের আগে জনসমক্ষে আইআরজিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধানখামেনির শেষ বিদায়ের আগে জনসমক্ষে আইআরজিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান হুড়োহুড়ি ও প্রাণহানির আশঙ্কা লাখ লাখ মানুষের সমাগম হলে অতীতে ইরানে একাধিকবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালের ৬ জুন ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষকৃত্যে লাখ লাখ ইরানি রাস্তায় নেমে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শোকাকুল জনতা কফিনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে খোমেনির সাদা কাপড়ে মোড়ানো মরদেহটি ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায়। ওই বিশৃঙ্খলায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং প্রায় ১১ হাজার মানুষ আহত হন। একইভাবে ২০২০ সালে রেভল্যুশনারি গার্ডসের জেনারেল কাসেম সোলাইমানির দাফন অনুষ্ঠানে হুড়োহুড়িতে অন্তত ৫৬ জন নিহত এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। খামেনির শেষকৃত্যেও এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খামেনির কফিনে লাল পতাকা: কী এই প্রতীকী বার্তাখামেনির কফিনে লাল পতাকা: কী এই প্রতীকী বার্তা চুক্তি নিয়ে টানাপোড়েনের মাঝেই শেষকৃত্য গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের অবসান, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই চুক্তির অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে কাতারে কারিগরি আলোচনা শুরু হলেও তা গভীর মতভেদ এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে মারাত্মকভাবে জটিল হয়ে পড়েছে।ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহবাহী কফিনকে পূর্বঘোষণা ছাড়াই সেই স্থানে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি নিহত হয়েছিলেন। শুক্রবার (৩ জুলাই) তেহরানে খামেনির কফিন জনসমক্ষে আনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে নিজ বাসভবন প্রাঙ্গণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হন। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি হয়েছিল জোমহুরি স্ট্রিটে। পরে শোকাহত মানুষের জন্য ওই স্থানে ‘রাভাঘ কেশভারদোস্ত’ নামে একটি অস্থায়ী প্রার্থনা স্থান তৈরি করে ইরান। খামেনির কফিনে লাল পতাকা: মরদেহ মৃত্যুর স্থানে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনও ধর্মীয় নিয়ম না থাকলেও, ইরানের এই পদক্ষেপটি শাহাদাত ও স্মরণের গভীর ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইরান মনে করে খামেনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন এবং তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে তার হত্যাকারী হিসেবে বিবেচনা করে। দেশটিতে তাকে ‘শহীদ’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলিমদের কাছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দ্বাদশী শিয়া ইসলামে সর্বোচ্চ ধর্মীয় মর্যাদা ‘মারজা-ই তাকলিদ’। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ৪ জুলাই। ৪ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত তার কফিন তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপর তার নিজ শহর মাশহাদে চূড়ান্ত জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হবে। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, ইমাম রেজা মাজারে তাকে সমাহিত করা হবে। ১৯৮৯ সালের ১১ জুন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষ বিদায়ে আনুমানিক ১ কোটি ২ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এবার এর চেয়েও বেশি মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৩৬ বছরেরও বেশি সময় দেশটির নেতৃত্ব দেওয়া এই নেতার শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের আশা, খামেনির শেষ বিদায়ে প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নেবেন। তাহলে এটি হবে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান। খামেনির কফিন হত্যাস্থলে নেওয়ার কারণ কীখামেনির কফিন হত্যাস্থলে নেওয়ার কারণ কী শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা তার নিজ শহর মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজা মাজারে দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ওই হামলায় ইরানের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাও নিহত হন।যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনের ওপর দেশটির মাশহাদ শহরের ইমাম রেজা মাজারের লাল পতাকা রাখা হয়েছে। আগামী ৯ জুলাই ওই মাজারেই খামেনিকে দাফন করা হবে। এর আগে ইরানে তার শোক ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট অ্যান্ড ইসলামিক পলিটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি আল জাজিরাকে জানান, এই লাল পতাকাটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলীর আত্মত্যাগের প্রতীক। সপ্তম শতকে কারবালার যুদ্ধে তিনি নিহত হন এবং শিয়া ইসলামে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : পাকিস্তানের অন্যতম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জিও নিউজের সম্প্রচার লাইসেন্স ১৫ দিনের জন্য স্থগিত করেছে দেশটির গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অভিযোগ, মহররম উপলক্ষে সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে এমন কিছু ধর্মীয় দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জনশৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। রোববার (২৮ জুন) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, ২৬ জুন সম্প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত কিছু দৃশ্য পাকিস্তানের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাদের দাবি, সম্প্রচারের আগে সম্পাদকীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও সতর্কতা অনুসরণ করা হয়নি। ক্ষমা চাইল জিও নিউজ ঘটনার পর জিও নিউজ এক বিবৃতিতে জানায়, বিতর্কিত বিষয়বস্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে সম্প্রচারিত হয়েছে এবং এটি চ্যানেলটির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের প্রতিফলন নয়। চ্যানেলটি আরও জানায়, সংশ্লিষ্ট ভিডিও ইতোমধ্যে তাদের সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনার জন্য তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে। জিও নিউজের দাবি, সম্প্রচারিত ফুটেজে মূলত ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অঞ্চলের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক দিক তুলে ধরা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শের প্রচার বা সমর্থন নয়; বরং স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি উপস্থাপন করা। অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশ পাকিস্তানের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, সম্পাদকীয় ত্রুটির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জিও নিউজকে অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি সংস্থাটির কাউন্সিল অব কমপ্লেইন্টসের কাছেও পাঠানো হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কেন এত সংবেদনশীল এই বিষয়? পাকিস্তানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং ইসলামের অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিত্বকে ঘিরে যেকোনো দৃশ্য, প্রতিকৃতি বা উপস্থাপনাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে দেখা হয়। অতীতে এ ধরনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশটিতে বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার নজির রয়েছে। এ কারণেই মহররমসহ ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে সম্প্রচারমাধ্যমের ওপর বাড়তি নজরদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক এই ঘটনা আবারও পাকিস্তানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার মতে, দেশটিতে বিভিন্ন সময়ে টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার স্থগিত, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের চাপের অভিযোগ উঠে এসেছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম, যা দেশটির গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গত ৪৫ দিনের মধ্যে ২৩টির বেশি মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ ভাঙা বা আংশিক উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মুসলিম মিরর। প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশ সংঘটিত হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে। প্রতিবেদনটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এসব অভিযান কি কেবল অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ, নাকি এর প্রভাব পড়ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের ওপরও? কী বলছে প্রশাসন? বিভিন্ন রাজ্যের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি জমি দখলমুক্ত করা, অনুমোদনহীন স্থাপনা অপসারণ এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং আইন অনুযায়ী অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ কী? অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশের অভিযোগ, যেসব স্থাপনা উচ্ছেদ বা আংশিক ভাঙা হয়েছে, তার অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তাদের দাবি, বহু বছর ধরে বিদ্যমান এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, ধর্মীয় স্থাপনার ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় না নিয়েই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন রাজ্যে ধারাবাহিক উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় মানবাধিকার সংগঠন ও সংখ্যালঘু অধিকার পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিতর্কের কেন্দ্রে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলছেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্থাপনার বিষয়ে অধিক সংবেদনশীলতা দেখানো প্রয়োজন ছিল। তাদের মতে, প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ও বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা উচিত ছিল। তবে প্রশাসনের অবস্থান ভিন্ন। কর্মকর্তারা পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, এসব অভিযান কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়নি এবং আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা? ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্থাপনা সংক্রান্ত যে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রায়ই সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। একদিকে আইন প্রয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্ন, অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার ও নিরাপত্তার উদ্বেগ—এই দুই অবস্থানের সংঘাতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির ভারসাম্য নিয়ে বৃহত্তর জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।