ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : মেঘ, পাহাড় আর হাওরের জেলা হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ। কৃষিনির্ভর এ জেলার অর্থনীতিতে বোরো ধানের পাশাপাশি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মৌসুমি ফল চাষ। সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ সীমান্তঘেঁষা হাসাউড়া এলাকার আনারস, যা স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। জেলা শহরের সীমান্তবর্তী রঙ্গারচর ইউনিয়নের হাসাউড়া, রসুলপুর, দর্পগ্রাম, পেচাকোনা ও বনগাঁও এলাকায় বিস্তৃত টিলাভূমি এখন আনারস চাষের কেন্দ্রবিন্দু। বছরের পর বছর ধরে এসব এলাকায় বিশেষ এক জাতের আনারস চাষ হয়ে আসছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘হাসাউড়ার আনারস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে এই আনারস দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে। পাহাড়ি টিলাজুড়ে আনারসের রাজ্য সীমান্তবর্তী পূণ্যনগর এলাকার ছোট ছোট সবুজ টিলাগুলো বর্ষা মৌসুমে যেন এক বিশাল আনারস বাগানে পরিণত হয়। খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাসঘেরা পাহাড়ি জনপদের এসব টিলায় চোখ যতদূর যায়, দেখা মেলে আনারসের সারি। মে মাস থেকে ফল সংগ্রহ শুরু হলেও জুনজুড়ে চলে সবচেয়ে বড় বেচাকেনা। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাকা আনারস সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন কৃষকরা। এ সময় পুরো এলাকা ভরে ওঠে আনারসের মিষ্টি সুবাসে। কেন আলাদা হাসাউড়ার আনারস? স্থানীয় কৃষক ও ক্রেতাদের মতে, হাসাউড়ার আনারসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর স্বাদ ও সুবাস। এ অঞ্চলে মূলত ‘হানিকুইন’ জাতের আনারস চাষ হয়। এ জাতের আনারসে আঁশ তুলনামূলক কম, রস বেশি এবং স্বাদ অত্যন্ত মিষ্টি। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা সরাসরি বাগানে এসে আনারস সংগ্রহ করেন। আনারস চাষি নিতাই চন্দ্র দাস জানান, বাজারে ‘হাসাউড়ার আনারস’ নাম শুনলেই ক্রেতারা আগ্রহ দেখান। পুরোপুরি পাকার পরই তারা ফল সংগ্রহ করেন, যাতে স্বাদ ও গুণগত মান অক্ষুণ্ণ থাকে। আরেক চাষি ইসলাম উদ্দিন বলেন, এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। যারা একবার এ আনারস খায়, তারা পরবর্তী মৌসুমেও এর খোঁজ করে। রাসায়নিক ছাড়াই উৎপাদন স্থানীয় কৃষকদের দাবি, আনারস চাষে তারা কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, পরিচর্যা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করেই ফল উৎপাদন করা হয়। ফলে আনারসের স্বাভাবিক স্বাদ ও গুণগত মান বজায় থাকে। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য উৎপাদন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ কৃষি চর্চার বিষয়ে আরও প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই প্রয়োজন হবে। লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা, কিন্তু রয়ে গেছে চ্যালেঞ্জ একটি উন্নতমানের আনারস উৎপাদনে কয়েক মাসের পরিচর্যা প্রয়োজন। চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সেচ এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কৃষকদের দীর্ঘ সময় শ্রম দিতে হয়। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব কৃষি প্রণোদনার সীমাবদ্ধতা বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব রপ্তানি উপযোগী অবকাঠামোর ঘাটতি কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় অনেক সময় দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। পতিত টিলায় নতুন সম্ভাবনা দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিরুল হক জানিয়েছেন, হাসাউড়ার পাশের মাঠগাঁওসহ আরও কয়েকটি এলাকায় আনারস চাষের উপযোগী টিলাভূমি রয়েছে। একই মত দিয়েছেন রঙ্গারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই। তার মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হলে বর্তমানে পতিত থাকা অনেক টিলায় আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করা সম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দা মো. বুরহান উদ্দিনও মনে করেন, বর্তমানে যে পরিমাণ আনারস উৎপাদিত হচ্ছে, বাস্তবে তার কয়েকগুণ বেশি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ৩০ হেক্টর আবাদ, সামনে রপ্তানির সম্ভাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসাউড়া এলাকায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে হানিকুইন জাতের আনারস চাষ হচ্ছে। উৎপাদিত আনারসের মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে মিষ্টি ও রসালো ফলের চাহিদা থাকায় এ আনারস রপ্তানিরও সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, সারাদেশে হানিকুইন আনারসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জিআই স্বীকৃতির পথে হাসাউড়ার আনারস? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, স্বাদ, সুবাস এবং দীর্ঘদিনের চাষাবাদের ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে ‘হাসাউড়ার আনারস’ জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতির জন্য শক্তিশালী দাবিদার হতে পারে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, হাসাউড়ার আনারসকে জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। যদি সেই স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হয়, তাহলে শুধু কৃষকরাই নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিও নতুন গতি পেতে পারে। বিশ্লেষণ: স্থানীয় ফল থেকে জাতীয় ব্র্যান্ড? হাসাউড়ার আনারসের গল্প কেবল একটি ফলের গল্প নয়। এটি সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতির পরিবর্তনের গল্প। প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত একটি স্থানীয় ফল ইতোমধ্যে জাতীয় বাজারে পরিচিতি পেয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—সরকারি সহায়তা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ব্র্যান্ডিং এবং জিআই স্বীকৃতি নিশ্চিত করা গেলে কি ‘হাসাউড়ার আনারস’ বাংলাদেশের পরবর্তী কৃষি-রপ্তানি সাফল্যের উদাহরণ হতে পারবে? বর্তমান বাস্তবতা বলছে, সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের পাশে টেকসই সহায়তা। সেই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে পাহাড়ি টিলার এই মিষ্টি ফল একদিন আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের পরিচয় বহন করতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :সুনামগঞ্জে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও মাঠপর্যায়ে তথ্য না পৌঁছানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সক্রিয়তার কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। সরকারি ঘোষণায় প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। গত রোববার (৩ মে) থেকে সুনামগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে ধান সংগ্রহ শুরু হয়েছে, যা চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক এখনো এই দামের বিষয়ে অবগত নন। এই সুযোগে স্থানীয় ব্যাপারীরা খলা থেকেই কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন। ভেজা বা আর্দ্র ধানের অজুহাতে প্রতি মণ ধান ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় কেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। সুনামগঞ্জের দেখার হাওর পাড়ের গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক এমরান মিয়া ও সামরান মিয়া জানান, ধার-দেনা করে ১৭ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তারা। কিন্তু অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ৭ বিঘার ধান এখনো পানির নিচে। শ্রমিক সংকট ও হারভেস্টার না পাওয়ায় সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয়নি। লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের জানিগাঁও গ্রামের কৃষক জব্বার মিয়া বলেন, “ঋণ করে চাষ করেছি। খলায় আনার পরেই বেপারীরা ৬০০–৭০০ টাকা দাম বলছে। সরকার যে ১৪৪০ টাকায় ধান কিনবে, তা আমরা জানিই না।” একই ধরনের অভিজ্ঞতা জানান জলিলপুর গ্রামের রংমালা বিবি। তিনি বলেন, খলায় ধান ভেজা থাকায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ধান নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, তারা কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বি এম মুশফিকুর রহমান জানান, এ বছর জেলায় ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকরা চাইলে লোকাল সাপ্লাই ডিপোতে (এলএসডি) ধান শুকিয়ে গুদামে দিতে পারবেন। তবে আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের বেশি হলে ধান গ্রহণ করা হবে না। শান্তিগঞ্জ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. আবদুর রব জানান, ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হবে এবং স্যাম্পল যাচাইয়ের পরই ধান গ্রহণ করা হবে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, কেবল প্রচারণা যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে তদারকি না থাকায় ফরিয়া ও দাদন ব্যবসায়ীরা কৃষকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। জেলা কৃষি ও খাদ্য সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় আগাম প্লাবন দেখা দিয়েছে। এতে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক। সুনামগঞ্জের জিনারিয়া হাওরে একটি রক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ায় আকস্মিকভাবে পানি ঢুকে ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৬ হেক্টর জমির মধ্যে আগে থেকেই ৮ হেক্টর জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত ছিল; বাঁধ ভাঙার পর আরও প্রায় ৩ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একজন জানান, মাসের পর মাস বাড়িঘর ছেড়ে হাওরে অবস্থান করে চাষাবাদ করার পর শেষ সময়ে এসে এমন বিপর্যয় তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন, ফলে ক্ষতির বোঝা আরও বাড়ছে। দোয়ারাবাজার উপজেলাসহ সুনামগঞ্জের একাধিক হাওরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ধানের শীষ সম্পূর্ণ পানির নিচে, আবার কোথাও আংশিক ভাসমান। কৃষকেরা কোমরসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা হিসেবে ধান কাটছেন, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। নেত্রকোনার হাওর এলাকাগুলোতেও গত তিন দিনের টানা বর্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের হিসেবে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, যদিও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। জেলায় এ বছর প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ধান কাটার জন্য মাইকিং করা হলেও শ্রমিক সংকট ও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। ফলে পাকা ধানও এখন পানির নিচে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরেও পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রশাসনের দাবি, অধিকাংশ ফসল ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে, তবে কৃষকদের মতে বাস্তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান এখনো মাঠে ছিল, যা বর্তমানে ডুবে যাচ্ছে। হবিগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি প্লাবিত করেছে। কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের জন্য এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। আবহাওয়া অনুকূলে না ফিরলে এবং পানি দ্রুত না নামলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আল হাবিব ,সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় পুকুরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলা সুরমা ইউনিয়নের বৈঠাখাই গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। মৃত শিশুরা হলো- রমজান আলীর মেয়ে রুমা আক্তার (৭), উকিল আলীর মেয়ে পাপিয়া আক্তার (৪)। তারা সম্পর্কে একে অন্যের আপন চাচাতো বোন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে বাড়ির আঙিনায় পুকুর পাড়ে একসঙ্গে খেলাধুলা করছিলো। একপর্যায়ে পরিবারের সবার অগোচরে তারা বাড়ির পাশের একটি পুকুরের কাছে চলে যায় এবং পানিতে পড়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ তাদের দেখতে না পেয়ে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও না পেয়ে পুকুরে সন্ধান চালালে দুইজনের মধ্য রুমা আক্তার (৭) মৃত অবস্থায় তাকে পানিতে পাওয়া যায়। আর পাপিয়া আক্তার (৪) কে তাৎক্ষণিকভাবে পানি থেকে জীবিত উদ্ধার করে দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, একটি পরিবারে দুই শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পেয়েছি।
সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার যুবক মুহিবুর রহমান লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সাগরপথে রওনা দেন, কিন্তু তার স্বপ্নের যাত্রা ভূমধ্যসাগরের মাঝেই থেমে যায়। অনাহার ও তৃষ্ণায় তিনি মারা যান। মুহিবুর রহমান ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুল আমিনের বড় ছেলে। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে সন্তানের মধ্যে মুহিবুর ছিলেন সবার বড়। পরিবারের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের ১২ জনের খবর দেশে আসার পর থেকে মুহিবুরের পরিবার বারবার দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও নিশ্চিত তথ্য পাননি। পরে সোমবার (৩০ মার্চ) একই বোটে থাকা সুনামগঞ্জের যুবক মারুফ আহমদ গ্রিস থেকে মুহিবুরের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবারকে নিশ্চিত করেন। মারুফ জানান, বোটে অনাহারে দুর্বল হয়ে প্রথমে মারা যান মুহিবুর। এরপর একে একে অন্যদের মৃত্যু হয়। মৃতদেহগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে জীবিতরা মাঝ সমুদ্রে এগুলো ফেলে দেন। পরিবারের সদস্যদের কথায়, সুন্দর ও সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে মুহিবুরসহ কয়েকজন যুবক প্রায় ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে পশ্চিম পাগলা গ্রামের দালাল নবীর হোসেনের সঙ্গে চুক্তি করে লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার পথে রওনা হন। মুহিবুরের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, মা মহিমা বেগম বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন এবং বাবা দিশেহারা হয়ে শোক সামলাতে পারছেন না। স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। তারা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহলও ঝুঁকিপূর্ণ এই পথে বিদেশযাত্রা থেকে যুবসমাজকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, “আমি কিছুক্ষণ আগেই এই মর্মান্তিক খবরটা শুনেছি। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।”
সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের নারায়ণতলা খাসপাড়া গ্রামের আঙ্গুর মিয়া এবং তার ছোট ভাই আব্দুর রজ্জাকের মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জেরে আব্দুর রজ্জাক তার ভাই আঙ্গুর মিয়ার দুটি মোরগের পা লাঠি দিয়ে ভেঙে দেয়। শুধু মোরগ দুটি নয়, আঙ্গুর মিয়া আরও জানান যে, তার ভাই ১৮টি মুরগির বাচ্চাও পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ আঙ্গুর মিয়া রোববার (১ মার্চ) বিকেলে মোরগ দুটি নিয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। তার দাবি, তিনি সুষ্ঠু বিচার চাইছেন এবং আশা করছেন যে, পুলিশের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন সেখ বলেন, ঘটনাটি তদন্তের জন্য একজন এসআই নিয়োগ করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনা সুনামগঞ্জবাসীর মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে এমন সহিংসতা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় সরকারি রাস্তার পাশে লাগানো দুটি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত পিয়ার আলী স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শ্রীরামিসি আঞ্চলিক শাখার সভাপতি বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামিসী রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দা পিয়ার আলী ও তার ভাই আহবাব মিয়া গত ২০ ফেব্রুয়ারি কোনো ধরনের সরকারি অনুমতি ছাড়াই শ্রীরামিসি বাজার থেকে মিয়ার বাজার সড়কের পাশে থাকা সরকারি দুটি প্রাপ্তবয়স্ক গাছ কেটে নেন। গাছ দুটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, পিয়ার আলী ও তার ভাই আহবাব হোসেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি জায়গার গাছ কেটে নিয়ে বিক্রি করেছেন। তারা অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। অভিযোগের বিষয়ে পিয়ার আলী বলেন, “যাতায়াতের সময় গাছটি বিদ্যুতের তার ও গাড়ির সঙ্গে লাগছিল। সরল মনে সমস্যা সমাধানের জন্য গাছ কেটে ফেলেছি।” এ বিষয়ে মিরপুর ও সৈয়দপুর শাহাড়পাড়া ইউনিয়নের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সজল তালুকদার বলেন, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা পিয়ার আলী ও আহবাব মিয়া সরকারি রাস্তার পাশের দুটি গাছ কাটার চেষ্টা করছিলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহসীন উদ্দীন বলেন, “বিষয়টি শুনেছি। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি সম্পদ বিনষ্টের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে ‘কনডম’ পাওয়াকে কেন্দ্র করে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দিনভর বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে তাঁর অফিসকক্ষে রেখেই তালাবদ্ধ করে রাখেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক শিক্ষার্থীর দাবি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী-এর একটি দল অস্থায়ীভাবে কলেজের ছাত্রী হোস্টেল ভবনে অবস্থান নেয়। সে সময় হোস্টেলে কোনো ছাত্রী ছিলেন না। পরবর্তীতে ভবনের বাথরুম পরিষ্কার করতে গিয়ে সেনা সদস্যরা কয়েকটি কনডমের প্যাকেট দেখতে পান বলে কলেজের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে অনৈতিক কার্যক্রমের ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রিভার ভিউ পার্ক থেকে মিছিল, কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থান বুধবার বেলা ১১টার দিকে জামালগঞ্জ রিভার ভিউ পার্ক এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি উপজেলা সদরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে অবস্থান নেয়। বিকেল পর্যন্ত সেখানে চলে প্রতিবাদ কর্মসূচি। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, বিষয়টি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কলেজ প্রশাসনকে মৌখিকভাবে জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। আগে থেকেই ছিল অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্রী হোস্টেলের ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে। অতীতেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের পদক্ষেপ, দুই শিক্ষক অব্যাহতি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুজিত রঞ্জন দে জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে কলেজের হল সুপার মুজিবুর রহমান ও ইতিহাস বিভাগের প্রধান পঙ্কজ বর্মণকে হোস্টেলের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তাপস শীল বলেন, দায়িত্বশীলরা আগে থেকেই বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতো না। উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দুই শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তদন্তের অগ্রগতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরবেষ্টিত জনপদ দিরাই ও শাল্লা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্যও সমাদৃত। হাওর-বাওরের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ—যা ভাটি অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। অবস্থান ও পরিচিতি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ভাটিপাড়া গ্রামে অবস্থিত। পিয়ান নদীর তীরে, প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ স্থানীয়ভাবে “ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি মসজিদ” নামে পরিচিত। অনেকের কাছে এটি ‘সাব বাড়ি’ বা ‘সাহেব বাড়ি’ নামেও পরিচিত। নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে মতভেদ স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমিদার ফতেহ মোহাম্মদ আলিফাত্তাহর উদ্যোগে ১৭ শতকের শেষ দিকে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, ১৮৩০ সালের দিকে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে এটি ভাটি অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভাটিপাড়া জমিদারদের জমিদারিত্ব বর্তমান দিরাই, জামালগঞ্জ, শাল্লা ও তাহিরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। দিল্লির আদলে নির্মিত স্থাপত্য মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদের আদলে। চুন-সুরকির তৈরি এই স্থাপনাটির ওপর রয়েছে বিশাল তিনটি গম্বুজ এবং ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬টি মিনার। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে সাদা মার্বেল ও সিরামিক পাথরে ফুল, লতাপাতা ও প্রকৃতির নান্দনিক নকশা খোদাই করা হয়েছে। মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে সাতটি প্রবেশদ্বার। বারান্দা, পিলার, গম্বুজ, ছাদ ও মেঝে—সবখানেই শৈল্পিক নির্মাণশৈলীর পরিচয় ফুটে উঠেছে। সামনে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর, যার স্বচ্ছ পানিতে ভেসে ওঠে মসজিদের প্রতিচ্ছবি। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এই পুকুরের পানিতেই অযু করেন। নির্মাণ কৌশল ও উপকরণ মসজিদ নির্মাণে কোনো ধরনের রড বা আধুনিক পাথর ব্যবহার করা হয়নি। কেবল ইট ও চুনাপাথরের আস্তরণ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। নির্মাণকাজের সময় নদীর তীরে তিনটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে ইট প্রস্তুত করে ব্যবহার করা হতো। স্থানীয়দের মতে, ভারত থেকে হাতির পিঠে করে পাথরের আস্তরণ আনা হয়েছিল। নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। পরে সিমেন্ট আবিষ্কারের পর পুরোনো চুনসুরকির আস্তর তুলে নতুন আস্তর দেওয়া হয়। সে সময় কলকাতা থেকে জাহাজে করে সিমেন্ট আনা হয়েছিল বলে জানা যায়। ধর্মীয় ও নান্দনিক গুরুত্ব মসজিদটিতে প্রতিদিন শতাধিক মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। মুসল্লিদের মতে, ভাটি অঞ্চলে এটি একমাত্র প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন কারুকাজসমৃদ্ধ মসজিদ। এখানে নামাজ আদায় করলে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। সংরক্ষণের দাবি বিশিষ্ট আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এ ধরনের স্থাপত্য নিদর্শন বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের অংশ। জাতীয় সম্পদ হিসেবে এর সংরক্ষণ জরুরি। সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এসব ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারণ এগুলো আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওর ও পিয়ান নদীর তীরঘেঁষা ভাটিপাড়া জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ কেবল একটি উপাসনালয় নয়; এটি ভাটি অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও সামাজিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। সময়ের বিবর্তন সত্ত্বেও তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে—ভাটি বাংলার গৌরবের প্রতীক হয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।