ঢাকা: বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সময় আলোচিত নাম শেখ মামুন খালেদ। বিশেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৩ সময়কালে তিনি ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। ক্ষমতার উত্থান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় থেকে তার উত্থান শুরু হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তিনি দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের মার্চে তাকে ডিজিএফআই থেকে সরিয়ে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) পদে পাঠানো হয়। এ সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সরাতে অনাগ্রহী ছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। আয়নাঘর ও গুমের অভিযোগ তার দায়িত্বকালেই ‘আয়নাঘর’ নামে কথিত গোপন বন্দিশালা এবং গুম-খুনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত কোনো বিচারিক রায় নেই, তবুও রাজনৈতিক ও মানবাধিকার মহলে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। গণমাধ্যম দমন ও সম্পাদক গ্রেফতার ২০১১ সালে শীর্ষনিউজ ডটকমের সম্পাদক একরামুল হককে গ্রেফতারের ঘটনায়ও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার, জেলগেটে পুনরায় আটক, এমনকি কারাগারে সাক্ষাৎ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ-এর নামও এ ঘটনায় আলোচনায় আসে, তবে মূল ভূমিকা মামুন খালেদের ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। জামিনে মুক্তির পরও সম্পাদককে হুমকি দেওয়া হয় এবং তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করা হয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও হুমকি ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট শীর্ষনিউজে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই তা প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে জানা যায়। এমনকি সম্পাদক পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠে, যার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেওয়া হয়। আর্থিক অনিয়ম ও ব্যবসায়িক অভিযোগ বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি শেয়ারবাজার, ভিওআইপি ব্যবসা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে আর্মি হাউজিং সোসাইটি (এএইচএস) প্রকল্পে সেনা কর্মকর্তাদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আলোচিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, শত কোটি টাকার লেনদেন ও আত্মীয়স্বজনের নামে কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠে। দ্বৈত রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজ অবস্থান শক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থানই তাকে দীর্ঘ সময় প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে সহায়তা করে। শেখ মামুন খালেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও আলোচনা চলমান। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো স্পষ্টভাবে জনসম্মুখে আসেনি। ফলে তার ভূমিকা নিয়ে মতবিরোধ আজও বিদ্যমান—একদিকে কেউ তাকে কৌশলী কর্মকর্তা হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে সমালোচকরা তাকে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া-এর ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য তলব করেছে। সোমবার (২ মার্চ) দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো এক চিঠিতে তার অ্যাকাউন্ট খোলার ফরম, লেনদেনের বিবরণসহ যাবতীয় তথ্য আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিএফআইইউতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাতে বিএফআইইউয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান সূত্র জানায়, একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে দ্রুত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারে ভূমিকা জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদসহ তিনজন ছাত্র প্রতিনিধি। তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক ও বর্তমান সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা পদ ছাড়েন। রাজনৈতিক ও ছাত্রজীবন ১৯৯৮ সালে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার আকুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আসিফ মাহমুদ। তার পিতা মো. বিল্লাল হোসেন ও মাতা রোকসানা বেগম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদ-এর সভাপতি ছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালে আত্মপ্রকাশ করা গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরবর্তী পদক্ষেপ বিএফআইইউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে। বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে। সম্পদের হিসাব দিয়ে এসেছি: আসিফ মাহমুদ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সোমবার (২ মার্চ) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ব্যাংক হিসাব তলব করে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে। এ খবর প্রকাশের পর এবার মুখ খুললেন এই অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে এ বিষয়ে মন্তব্য করেন তিনি।স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, আগামীকাল আমি নিজেই ব্যাংক স্টেটমেন্ট সবার জন্য উন্মুক্ত করবো।ওই স্ট্যাটাসে আসিফ মাহমুদ আরও লেখেন, পদত্যাগের আগেই আয়-সম্পদের হিসাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দিয়ে এসেছি।
ইরানে নতুন করে ভয়াবহ হামলা হয়েছে। সীমান্তবর্তী একটি রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে এ হামলা হয়। এতে ৪৩ সেনা নিহত হয়েছেন। এরপরই ভয়াবহ হামলা শুরু করেছে ইরানও। জানা গেছে, ইসরাইলকে লক্ষ্য করে নতুন করে মিসাইল হামলা শুরু করেছে ইরান। গত এক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত তিনবার মিসাইল ছুড়েছে দেশটি। যার প্রভাবে ইসরাইলের বেশিরভাগ জায়গায় সতর্কতামূলক সাইরেন বাজছে। দ্য টাইমস অব ইসরায়েল বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত পৌনে ২টার দিকে জানায়, ইরান নতুন করে মিসাইল ছুড়েছে। এতে করে দক্ষিণাঞ্চলে সাইরেন বাজছে। জনগণ আতঙ্কিত হয়ে বাংকারে লুকাচ্ছেন। অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে, একটি মিসাইল সরাসরি তেলআবিবে আঘাত হেনেছে। তবে বাকি মিসাইলগুলো আকাশে ভূপাতিত করে দেওয়া হয়েছে কি না সেটি নিশ্চিত নয়। আইডিএফ মিসাইল প্রতিহতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে। ইরানের সরকারি রেডিও-টেলিভিশন ভবনে হামলা ইরানের সরকারি রেডিও ও টেলিভিশন সদরদপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। তবে পুরো সদরদপ্তরের বদলে এটির আংশিক জায়গায় হামলা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়াত্ত্ব টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে সম্প্রচার এখনো সক্রিয় আছে বলে জানিয়েছে তারা। কর্তৃপক্ষ বলেছে, “প্রযুক্তি দল ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করছে।” গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও টেলিভিশন ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। তবে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা আবার সম্প্রচারে ফিরেছিল। ইরানে দূতাবাস বন্ধ করে দিল আরব আমিরাত ইরানে নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরান একাধিকবার হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার দিবাগত রাতে এক বিবৃতিতে বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানে তার দূতাবাস বন্ধ করার এবং রাষ্ট্রদূতসহ দূতাবাসের সকল কূটনৈতিক সদস্যকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছে। আমরা আমাদের ভূখণ্ডে ইরানের ন্যাক্কারজনক মিসাইল হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমিরাতের ওপর ইরানের 'সরাসরি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ' মিসাইল হামলার প্রতিক্রিয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইরানের হামলা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর এক নগ্ন আগ্রাসন, যা আবাসিক এলাকা, বিমানবন্দর, বন্দর এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং নিরপরাধ সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এদিকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মেহরানে নতুন করে ভয়াবহ হামলা হয়েছে। সীমান্তবর্তী একটি রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে এ হামলা হয়। এতে ৪৩ সেনা নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, রোববার (১ মার্চ) ইরাকের সীমান্তবর্তী ওই শহরটিতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। নিহতদের বেশিরভাগই সীমান্তরক্ষী। এছাড়াও হামলায় আশপাশের কিছু ভবনও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের বরাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের এজেন্টরা এই বোমা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা মেহের নিউজ। চলমান মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় ইরানের ৪৮ জন নেতা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাদের তালিকা প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে, এ তালিকায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নামও রয়েছে। দুই শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল তেহরান ইরানের রাজধানী তেহরানে আরও দুটি প্রবল বিস্ফোরণ ঘটেছে। এ তথ্য জানিয়েছেন বার্তা সংস্থা এএফপির দুজন সাংবাদিক। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ওই দুই সাংবাদিকের আবাসিক ভবনের জানালা কেঁপে ওঠেছে, যারা একে অপরের থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিলেন। রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৯টায় এই বিস্ফোরণ দুটি ঘটে। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছিল যে তাদের সম্প্রচার কেন্দ্রকে হামলার লক্ষ্য করা হয়েছে। তবে এখনো স্পষ্ট নয়, এই বিস্ফোরণের প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল। তেহরানে অবস্থানরত ওই দুই সাংবাদিক বলেন, হামলাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থানে থেকে তারা হামলার তীব্রতা অনুভব করেন। হামলার সময় তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালার কাঁচ কেঁপে ওঠে। স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে এই বিস্ফোরণগুলো ঘটে। ঠিক একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছিল যে, তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু কী ছিল তা পরিষ্কার হওয়া যায়নি। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভশনের সম্প্রচার সচল ছিল। এর আগে ইসরায়েল জানিয়েছিল, তারা নতুন দফায় তেহরানে হামলা শুরু করেছে। মাথা নত করবে না ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার পর সেটাকে ভেনেজুয়েলার পর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ‘রেজিম পরিবর্তন’ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে ইরানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় শাসনব্যবস্থা মূলত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তার অধীনে তুলনামূলকভাবে তার দুর্বল সহযোগীরা ছিলেন। কিন্তু ইরানে সুপ্রিম লিডার থাকলেও, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, সামরিক বাহিনীতে, ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) এবং গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মুলরয় বলেন, সুপ্রিম লিডারকে সরিয়ে দেয়া হলেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে ‘রাজি’ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, তারা (ইরান) বরং বর্তমান বক্তব্য ও সাম্প্রতিক বিবৃতির ভিত্তিতে পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করতে পারে এবং পুরো অঞ্চলকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে পরিণত করতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। মুলরয় আরও বলেন, তাদের (ইরানের) হাতে ড্রোন রয়েছে। সেগুলো আমরা দুবাই ও বাহরাইনের বিভিন্ন ভবনে আঘাত হানতে দেখছি। তারা এগুলো ব্যাপক হারে উৎপাদন করতে পারে এবং বহু বছর ধরে রাশিয়াকেও তারা তা সরবরাহ করে আসছে। এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তিনি আরও বলেন, অবশ্যই এসব ড্রোন সাধারণত সহজেই ভূপাতিত করা যায়। কিন্তু আমরা দেখেছি অনেকগুলো লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়েছে। হয়তো তারা একসঙ্গে এত বেশি সংখ্যায় পাঠিয়েছিল যে, সবগুলো প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরিস্থিতি দেখে তাই মনে হচ্ছে এবং এটিই সম্ভবত তাদের সবচেয়ে বড় হুমকি। ফের সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সৌদি আরব রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে ইরানি এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার দাবি জানিয়েছে সৌদি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও মার্কিন বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি জানিয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সৈন্যরা অবস্থান করছেন। ইরানি ওই হামলার বিষয়ে অবগত উপসাগরীয় একটি সূত্র এএফপিকে হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা হিজবুল্লাহর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এক বিবৃতিতে হেজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম বলেছেন, এই গোষ্ঠী সম্মান ও প্রতিরোধের ক্ষেত্র ত্যাগ করবে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে অপরাধের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে অভিহিত করেছেন কাসেম। তিনি বলেন, সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা ও সমর্থনের ওপর আস্থা রেখে আমরা এই আগ্রাসন মোকাবিলায় আমাদের কর্তব্য পালন করবো। হিজবুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি শিয়া মুসলিম সংগঠন; যেটি লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের পারস্য উপসাগরে মোতায়েনরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধে মার্কিন ওই রণতরীতে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।রোববার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে ওই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এক বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কনে চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ইরানের এই বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘‘জল এবং স্থল—উভয়ই হবে সন্ত্রাসী আগ্রাসনকারীদের কবরস্থান।’’ তবে পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার যে দাবি ইরান করেছে, তা নাকচ করে দিয়েছে পেন্টাগন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, আব্রাহাম লিঙ্কন আক্রান্ত হয়নি। যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, সেগুলো আব্রাহাম লিঙ্কনের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।’’ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদরদপ্তর ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদরদপ্তর ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। রোববার (১ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আমেরিকার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রয়েছে। আইআরজিসির এখন আর কোনো সদরদপ্তর নেই। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড আরও বলেছে, গত ৪৭ বছরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক হাজারেরও বেশি আমেরিকানকে হত্যা করেছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ আকারের হামলা ‘সাপের মাথা কেটে ফেলেছে’।এর আগে, ইরানের আকাশসীমায় প্রায় ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘এয়ার সুপ্রিমেসি’ প্রতিষ্ঠার দাবি করে ইসরায়েলিবিমান বাহিনী (আইডিএফ) এবং মার্কিন বিমান বাহিনী (ইউএসএএফ)।
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন, পরে যান শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে। ১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। তরুণ আলী খামেনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। তার নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং এখন যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত। আলী খামেনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর, আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে সহায়তাও করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার ওপর ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে। রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিক এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। এই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন। আলী খামেনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে ১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা 'গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ' অর্জন করতে পারেননি। পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনে বলা হয়েছিল যে, সর্বোচ্চ নেতাকে "ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। পরে রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল। ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ইরানের সংবিধানও পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল। আয়াতুল্লাহ খামেনি শাসনামলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। যাদের অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেননি। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। মি. খাতামি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন। মি. খাতামি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তখন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মি. খাতামির পরে তার উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে। মি. আহমাদিনেজাদকে কেউ কেউ আয়াতুল্লাহ খামেনির অনুসারী মনে করতেন। কিন্তু অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে আহমাদিনেজাদ সরকারের অবস্থান তখন ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই সাথে মি. আহমাদিনেজাদ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সাথে তার বিরোধিতা হয়। ২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনঃ-নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ওই নির্বাচনের ফলাফল বৈধ বলে ঘোষণা দেন এবং তীব্র আন্দোলন দমনে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই দমন অভিযানে অনেক বিরোধী কর্মী নিহত হন, গ্রেফতার হন হাজার হাজার মানুষ। ২০১৩ সালে ইরানের উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। রুহানি সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে একটি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। সোলেইমানি আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। এই হামলার পর খামেনি সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। পরে তিনি বলেছিলেন, ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল 'আমেরিকার গালে চপেটাঘাত'। খামেনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, "এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।" শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনি বহুবারই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে "একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার" আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলার ফেলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্ট বা 'ইহুদি গণহত্যা' আদৌ ঘটেছিল কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৪ সালে তার টুইটার অ্যাকাউন্টে উদ্ধৃত একটি বার্তায় বলা হয়েছিল: "হলোকাস্ট এমন এক ঘটনা যার বাস্তবতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, আর যদি ঘটেও থাকে, সেটা কীভাবে ঘটেছিল, তাও স্পষ্ট নয়। " ২০২০ সালে, আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং ইরানের সরকার দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রথম সংকটটি শুরু হয় ওই বছর আটই জানুয়ারি। তখন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ভুল করে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ১৭৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি নাগরিক। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ফলে ইরানের ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কট্টরপন্থী সংবাদপত্রগুলি পদত্যাগের দাবি জানায় এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভের নতুন ঢেউ ওঠে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলির ব্যবহারও করে বলে অভিযোগ ছিল। সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, "বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত"। তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ইরানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ছড়িয়ে পড়ে। আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথমে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন যে ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বাছাই হয় কিভাবে? ২০২১ সালে ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা এব্রাহিম রাইসি। চলতি বছরের জুনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৯শে মে ইব্রাহিম রাইসি এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলে প্রেসিডেন্ট পদটি শূন্য হয়ে যায়। রাইসির মৃত্যুর পর জুলাইয়েই ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কারপন্থী নেতা মাসুদ পেজেশকিয়ান। প্রায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যায় ভুগছেন গত কয়েক বছর ধরে। তিনি মারা গেলে বা পদত্যাগ করলে কে হবেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা, এই প্রশ্ন ঘিরে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। আয়াতুল্লাহ খামেনির বয়স এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তিনি যে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে, সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে কে তার উত্তরসূরি হতে পারেন তা নিয়ে অবিরাম জল্পনা-কল্পনা চলছে। আয়াতোল্লোহ খামেনির পরবর্তীতে ইব্রাহিম রাইসিকেই পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হবেন বলেই মনে করা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের সময় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম জানিয়েছিলেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই পদে কে থাকবেন তা নির্ধারণ করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ। ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতোল্লা আলি খামেনেই দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে আসীন দ্বিতীয় ব্যক্তি। এই মণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন করা হয় প্রতি আট বছর অন্তর। কিন্তু কারা গোষ্ঠীর সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন তা নির্ভর করে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল নামে একটি কমিটির অনুমোদনের ওপর। আর এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। অর্থাৎ এই দুটি পরিষদ বা মণ্ডলীর ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে। গত তিন দশক ধরে আলী খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞ মণ্ডলীর নির্বাচিত সদস্যরা যেন রক্ষণশীল হয় - যারা তার উত্তরসূরি নির্বাচনের সময় তারই নির্দেশ মেনে চলবে। নির্বাচিত হবার পর, সর্বোচ্চ নেতা তার পদে আজীবন বহাল থাকতে পারেন। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হবে একজন আয়াতুল্লাহকে, অর্থাৎ যিনি একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা। কিন্তু আলী খামেনিকে যখন নির্বাচন করা হয়েছিল, তিনি আয়াতুল্লাহ ছিলেন না। তখন তিনি যাতে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল।
মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে বরিশালে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সাবেক দুই সংসদ সদস্য। শুধু এই দুজনই নন, গত এক সপ্তাহে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতিসহ অন্তত তিনজন প্রভাবশালী নেতা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের আরও অন্তত ডজনখানেক নেতা জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ইউনুসের জামিনে আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা সোমবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম শরিয়তউল্লাহর আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস। বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনি আসামি ছিলেন। মামলাটিতে আরও আসামি রয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীরসহ দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা। সরকার পতন ও মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক ছিলেন ইউনুস। হঠাৎ আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করায় আদালত প্রাঙ্গণে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। মহানগর ও জেলার দুই পাবলিক প্রসিকিউটর এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সম্পাদক আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিনের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি ছিল—মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা রয়েছে এবং এটি ছিল আবেদনের প্রথম দিন। তবুও শুনানি শেষে আদালত তাকে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত জামিন দেন। ইউনুসের আইনজীবী কাইয়ুম খান কায়সার দাবি করেন, ২০১৮ সালের একটি তথাকথিত ঘটনার ভিত্তিতে ২০২৪ সালে দায়ের করা মামলাটি মিথ্যা। বিচারক সব দিক বিবেচনা করেই জামিন দিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সাদিকুর রহমান লিংকন বলেন, ইউনুসের বিরুদ্ধে মোট তিনটি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় জামিন পেলেও বাকি দুটি মামলার বিষয়ে পুলিশ আদালতকে তাৎক্ষণিক অবহিত করেনি বা গ্রেফতারের আবেদন করেনি। জেবুন্নেসা আফরোজসহ আরও তিনজনের জামিন ইউনুসের জামিনের মাত্র ছয় দিন আগে বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেসা আফরোজ আদালত থেকে জামিন পান। একইদিনে জামিন পান যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন এবং মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিমউদ্দিন। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তিন থেকে সাতটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। একের পর এক জামিন পাওয়ার পর ওইদিনই তারা কারাগার থেকে মুক্তি পান। পাবলিক প্রসিকিউটরদের আপত্তি বরিশালের মেট্রোপলিটন পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. নাজিমউদ্দিন আহম্মেদ পান্না অভিযোগ করেন, মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে নামঞ্জুর হওয়া জামিনও নিম্ন আদালত মঞ্জুর করেছেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে জেবুন্নেসা আফরোজ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর ভাতিজা মঈন আব্দুল্লাহর জামিনের প্রসঙ্গ তোলেন। তার মতে, উচ্চ আদালতের আদেশ অগ্রাহ্য করলে বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. হাফিজ আহম্মেদ বাবলু বলেন, ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া মামলার বেশিরভাগ আসামিই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তাদের সহজে জামিন পাওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। বিএনপির প্রতিক্রিয়া বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. আবুল কালাম শাহিন বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পরও সবক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। তার অভিযোগ, একটি বিশেষ শ্রেণি সুযোগ নিয়ে জামিন অযোগ্য ধারার আসামিদের জামিন পাইয়ে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, এতে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে এবং জরুরি ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয়ের নজর দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক জামিনের ধারাবাহিকতা বরিশালের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়া মেনেই জামিন দেওয়া হচ্ছে; অন্যদিকে বিএনপি ও সরকারপক্ষের আইন কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে যত আসন পেয়েছে, তা আগে আর কখনোই পায়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতা করা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির নেতাদের পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জড়িত থাকারও অভিযোগ রয়েছে। সেই ইতিহাসকে সাথে নিয়েই এবার বাংলাদেশের সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজধানী ঢাকায় কোনো আসন পেতে সক্ষম হলো। এবার তারা রাজধানী ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনে জয় পেয়েছে, যার একটিতে জিতেছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা জেলার ২০টি আসনে তার জয় সাতটিতে।অবশ্য খুলনায় নিজের আসনে হেরে গেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। কিন্তু সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এককভাবে ৬৮টি সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছে এবং এগুলোসহ জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন নিয়ে এবার প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনের ফলই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে জামায়াতের এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাদের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিকূল পরিবেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার দক্ষতার পাশাপাশি অনেক আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে দলটি আগের তুলনায় এবার অনেক বেশি আসন পেয়েছে। একই সঙ্গে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের না থাকাটাও কোনো কোনো জায়গায় জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তবে জামায়াত নেতাদের দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একজন নেতা বলেছেন, দলীয় বৈঠকে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। এবার নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে থেকেই জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ক্ষমতায় যাওয়ার আলোচনা সামনে নিয়ে আসেন এবং সেটিই পুরো নির্বাচনী প্রচারে দল ও জোটের মুখ থেকে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে সবসময়ই সমালোচনার শিকার হওয়া জামায়াতে ইসলামী এর আগে বিএনপির সঙ্গে মিলে ক্ষমতার অংশীদার হলেও এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা দলটির নেতাদের মুখে এভাবে আগে কখনোই শোনা যায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দৃশ্যপট পাল্টে যায় এবং পুরনো মিত্র বিএনপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করে দলটি। শেষ পর্যন্ত অনলাইন ও অফলাইনে দলটির নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা এমন প্রচার শুরু করে যে, দলটি ক্ষমতায়ও আসতে পারে। এক পর্যায়ে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ ১০টি দল নিয়ে জোট গঠন করে দলটি। পরে নির্বাচনী প্রচারের সময় জনসভায় কয়েকজনকে মন্ত্রী করা হবে বলেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার পর তিনি সরকার গঠন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। দল ক্ষমতায় গেলে কী কী করবেন- গত ২০শে জুন তাও তুলে ধরেছিলেন শফিকুর রহমান। বিশেষ করে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে 'জামায়াত ক্ষমতায় যাচ্ছে' এমন একটি প্রচার গড়ে তোলা হয় নির্বাচনের আগে থেকেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি বাস্তবে পরিণত হয়নি। তবে এবারের ভোটে দলটি ৬৮টি আসনে জয় পেয়ে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই এককভাবে অংশ নিয়ে ১৮টি আসন পেয়েছিল জামায়াত। জামায়াতের রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষক ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, জামায়াতের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাই এতো আসনে জয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি। "এর কৃতিত্ব হলো জামায়াত আমিরের। তিনি জামায়াতকে নবজন্ম দিয়েছেন এবং সব ধর্ম ও পেশার মানুষদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছেন। দীর্ঘদিন বৈরি পরিবেশে থেকেও দলটি নির্বাচনে ভালো করার মূল ভিত্তি হলো তাদের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। মি. বাবর বলেন, এবারই ঢাকায় প্রথম আসন জেতা এবং ঢাকার এলিট এলাকা বলে পরিচিত জায়গাগুলোতে জামায়াতের শক্ত অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে এই নির্বাচনে। প্রসঙ্গত, গুলশান-বনানীকে অনেকে এলিট বা অভিজাত এলাকা বলে থাকেন। এই এলাকায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনে পাঁচ হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীকে পরাজিত করতে পেরেছেন। জামায়াত ৩০টি আসনের ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে। দলটির দাবি, ভোট পুনর্গণনা হলে ঢাকা-১৭সহ অনেক আসনের ফল পাল্টে যাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, জামায়াতের সাংগঠনিক কাজ ও এর মাধ্যমে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেও তরুণদের মধ্যে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারার বিষয় নির্বাচনে আসন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। "আওয়ামী লীগ নেই। ফলে তাদের সমর্থকরা হয়তো কোথাও কোথাও বিকল্প হিসেবে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। তবে জামায়াত সারাদেশেই সংগঠনকে সক্রিয় করতে পেরেছে। তরুণদের মধ্যে তাদের অবস্থানও নির্বাচনে ভালো ফল করতে সহায়তা করেছে," বলেছেন তিনি। নিষিদ্ধ থেকে সংসদে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অস্তিত্ব দৃশ্যত স্বাধীন বাংলাদেশে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে তখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এ অবস্থায় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অনেকে তখনকার ক্রিয়াশীল কিছু রাজনৈতিক দলে ভিড়ে যান। দলটির বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের লতিফুর রহমানসহ অনেকেই তখন জাসদ ছাত্রলীগ কিংবা জাসদের রাজনীতিতে মিশে যান। দলটির ওয়েবসাইটে বলা আছে যে, এখনকার আমির শফিকুর রহমান নিজেও জাসদ ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর জামায়াতের জন্য পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ১৯৭৬ সালের তেসরা মে তখনকার রাষ্ট্রপতি এ. এস. এম সায়েম একটি অধ্যাদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরেও মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতার ইস্যুতে জনমনে তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দলটির গোপনে সক্রিয় থাকা নেতারা তখনো জামায়াত নামে দলের কার্যক্রম না শুরু করে ভিন্ন নামে দল গঠন করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নেন। এর ধারাবাহিকতা ১৯৭৬ সালেই আরও কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আই.ডি.এল) নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামী তৎপরতা শুরু করে। দৃশ্যত এই নির্বাচনের মাধ্যমেই জামায়াতে ইসলামীর নেতারা ভিন্ন পরিচয়ে হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে প্রথমবারের মতো আসতে সক্ষম হন। জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আইডিএল- এর ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর ছয় জন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। গোপন থেকে স্বনামে প্রকাশ্যে আইডিএল এর ব্যানারে জামায়াত নেতাদের সংসদে যাওয়ার পর ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতে ইসলামীর নামেই একটি কনভেনশন আহ্বান করা হয় দলটির তখনকার একজন নেতা আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে। সেই কনভেনশনেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমের একটি ভাষণ পড়ে শোনানো হয়। এই কনভেনশনে একটি নতুন গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয় এবং তার ভিত্তিতে ১৯৭৯ সালের ২৭শে মে চার দফা কর্মসূচী নিয়ে জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের প্রকাশ্য কর্মতৎপরতা শুরু করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন গোলাম আযম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ দিকে ২২শে নভেম্বর ঢাকা ছেড়ে পাকিস্তান চলে যান তিনি। পরে ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে অসুস্থ মাকে দেখার কথা বলে ঢাকায় এসে তিনি আর ফিরে যাননি। তবে গোলাম আযম স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮১ সালে প্রথম জনসমক্ষে আসেন। যদিও এর আগে ১৯৭৯ সালে জামায়াত সক্রিয় হওয়ার পর থেকে তার নির্দেশনাতেই দলটি পরিচালিত হয়েছে বলে দলটির নেতারা পরবর্তীতে প্রকাশ করেছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত এক নেতা একেএম নাজির আহমেদের বই 'রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী' তে বলা হয়েছে, "১৯৭৮ সনে দেশে ফেরার পর থেকে অধ্যাপক গোলাম আযম বারবার আমিরে জামায়াত নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তার নাগরিকত্ব ছিল না বিধায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ভূমিকা পালন করতেন ভারপ্রাপ্ত আমির জনাব আব্বাস আলী খান"। এর মধ্যে ১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আসেন আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। একপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে তাতে সামিল হয় জামায়াতে ইসলামীও। আন্দোলন সামাল দেওয়ার জন্য এরশাদ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যখন আলোচনায় বসেন, তখন জামায়াতে ইসলামীকেও ডাকা হয়েছিল। এরশাদ সরকারের অধীনে প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। জামায়াতের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, দলটি সেই নির্বাচনে দলটির ১০ জন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত অংশ নেয়নি। সরকার গঠনে ভূমিকা জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। তখন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি এবং মূলত এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে দলটি। তখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হয় তাতে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ছিল বলে পরে জানা যায়। কিন্তু এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তীব্র গণআন্দোলন তৈরি হলে ৯২ সালের মার্চ মাসে গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে 'বিদেশি নাগরিক হয়ে দেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল'। তখন নাগরিকত্বের প্রশ্নে হাইকোর্টে জামায়াত রিট মামলা করে এর পক্ষে রায় পেয়েছিল। কিন্তু তখন সরকার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গিয়েছিল। এরপর সুপ্রিমকোর্টে আপিল বিভাগ থেকে নাগরিকত্ব ফিরে পেয়ে ১৬ মাস জেল খাটার পর মুক্তি পেয়েছিলেন গোলাম আযম। কিন্তু এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দল আন্দোলন গড়ে তুললে তাতেও আলাদা থেকেই সামিল হয় জামায়াত। তখন বিএনপি সরকারের সময়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ আন্দোলনরত দলগুলো। এক পর্যায়ে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ করে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তখনকার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের জুনে হওয়া নির্বাচনে জামায়াত মাত্র তিনটি আসনে জয় পেতে সক্ষম হয়। পরে আবার বিএনপির সাথে মিলে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনেও সামিল ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং এক পর্যায়ে বিএনপির জোটে জামায়াত সরাসরি যোগ দেয়। তাদের চারদলীয় জোট ২০০১ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল জয় পেলে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায় জামায়াত। দলটির তখনকার দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ খালেদা জিয়ার নেতৃ্ত্বাধীন সরকারে মন্ত্রীত্ব পান। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল তাদের মধ্যেই ওই দুজনও ছিলেন। সংকট ও বিপাকে পড়ে নাম বদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন- সেই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট সহিংসতায় রূপ নিলে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে হওয়া নির্বাচনে জামায়াত মাত্র দুটি আসনে জয় পায়। ওই বছর নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পাওয়ার জন্য 'জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ' নাম পরিবর্তন করে 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী' করা হয়। ওই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জামায়াতে ইসলামী। অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য কিংবা নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে এলেও ১৯৭৯ সালে সক্রিয় হওয়ার ৪০ বছর পর এসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলটি এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে নিবন্ধন হারিয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় দলের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়। এর আগে থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় দলটির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা আটক হলে বেশ চাপের মুখে পড়ে দলটি। ওই বছরেই সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে দলটি। এরপর তিনটি নির্বাচনে জামায়াত আর অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালের বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলেও জামায়াত নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজা খাটা অবস্থায় ২০১৪ সালের অক্টোবরে মারা যান গোলাম আজম। একই ধরনের মামলায় ২০১৫ সালে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের এবং ২০১৬ সালে আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হলে চরম বিপাকে পড়ে দলটি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে দলটির আপিল আবেদন খারিজ করে দেয়। এর ফলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ই বহাল থাকে। পরে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালতের নির্দেশে আবার দলটি নিবন্ধন ফিরে পায়। চারবার নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের ৩১শে জুলাই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে দলটি দ্বিতীয়বারের মতো নিষিদ্ধ হয়। এর আগে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। এর আগে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়েছিলো মূলত ব্রিটিশ আমলে। সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী ১৯৪১ সালের ২৬শে অগাস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে পরের বছরেই এর সদর দপ্তর লাহোর থেকে নেওয়া হয় ভারতের পাঠানকোটে। ধর্মের কথা বলা হলেও অনেকেই মনে করেন মূলত ভারতের কমিউনিজম বিরোধী শক্তি হিসেবেই এ সংগঠনটির জন্ম হয়েছিল এবং তখনকার ব্রিটিশ শাসকদের আনুকূল্যও তারা পেয়েছিলো। ১৯৪৫ সালে এর প্রথম কনভেনশন হয় অবিভক্ত ভারতে এবং এর দু'বছর পর দেশভাগের আগ পর্যন্ত এই সংগঠনটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলো। ইসলামি সংবিধানের দাবিতে ১৯৪৮ সালে প্রচারণা শুরু করলে পাকিস্তান সরকার জননিরাপত্তা আইনে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীকে গ্রেফতার করে। তবে ওই বছর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও জামায়াতের কার্যক্রম শুরু হয়। দু'বছর পর মি. মওদুদী জেল থেকে ছাড়া পান। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ১৯৫৮ সালে অন্য সব দলের সাথে জামায়াতের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেন তখনকার সেনা শাসক আইয়ুব খান। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে জামায়াতকে আবার নিষিদ্ধ করা হয়। মওদুদী ও গোলাম আজমসহ অনেককে আটক করা হয়। সে বছরের শেষ দিকে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ১৫১টি আসনে প্রার্থী দিয়ে চারটি আসন পায় দলটি। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় দলটি। তখন পাকিস্তানি শাসকদের সহযোগিতায় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এই দলটির নেতৃত্বেই রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনী হয়েছিলো যারা ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ যুদ্ধকালীন গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য তীব্রভাবে সমালোচিত।
শুধু দীর্ঘ কারাবাস নয়; প্রহসনের বিচারে রীতিমতো মৃত্যুদণ্ড। বলা যায়, মাথার উপরেই ঝুলছিল ফাঁসির দড়ি। কিন্তু নিয়তির পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। জুলাইয়ের রক্ত বন্যায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। এরপর আসে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বৈরাচারের কারাগার থেকে বেরিয়ে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়ান নেতারা—এবং রায় দেন ভোটাররাই। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু এবং জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। বাবর: ১৮ বছরের অন্ধকার শেষে আলোর পথে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ২০০৭ সালে গ্রেফতার হন। এরপর একদিনের জন্যও জামিন মেলেনি তার। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই কেটে যায় দীর্ঘ ১৮ বছর। পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে মলিন মুখে আদালতে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য ছিল চিরচেনা। অনেকেই মনে করতেন, বাবর আর কোনোদিন জেল থেকে মুক্তি পাবেন না। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনি প্রক্রিয়ায় সব মামলা থেকে খালাস পান তিনি। গত বছর ১৬ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে যান নিজের নির্বাচনি এলাকা নেত্রকোনায়। মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরি নিয়ে গঠিত আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এক লাখ ২০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পিন্টু: মৃত্যুদণ্ড থেকে সংসদ ভবন বাবরের মতোই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু। দীর্ঘ ১৭ বছরের কারাজীবনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর। মুক্তির পর তিনি ফিরে যান জন্মস্থান টাঙ্গাইলে। স্থানীয় গোপালপুর-ভূঞাপুর আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন। ভোটযুদ্ধে প্রায় দুই লাখ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ কারাবাস ও মৃত্যুদণ্ডের রায় পেরিয়ে তার এই বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আজহার: ফাঁসির মঞ্চ থেকে ভোটের মঞ্চে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামও হয়েছেন সংসদ সদস্য। রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করেন তিনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক বছরের মধ্যে গ্রেফতার হন আজহার। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ২০১২ সাল থেকে দীর্ঘ এক যুগ কারাবন্দি ছিলেন তিনি। গত বছর ২৮ মে কারাগার থেকে মুক্তি পান। আর কিছুদিন গেলেই হয়তো তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হতো—এমন ধারণা ছিল রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু সেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতাই আজ জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ এই তিন নেতার বিজয় শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘ কারাবাস, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়া—সবকিছুর পর জনগণের ভোটে তাদের জয় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলেই মনে করা হচ্ছে। জনতার রায়ে কারাগার পেরিয়ে সংসদ ভবনে—এই প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
পটুয়াখালী-২ আসন এলাকায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে সহকারী রিটার্নিং অফিসার আবু সালেহ বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল সংগ্রহ শেষে উপজেলা নতুন অডিটরিয়ামের ভোট কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ মনিটরিং সেল থেকে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ভোটের ফলাফল পোস্টাল ভোট ছাড়া ড. মাসুদ মোট ৯৯ হাজার ৪৩৮ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. সহিদুল আলম তালুকদার পেয়েছেন ৭২ হাজার ১৯১ ভোট। এ ছাড়া— হাতপাখা প্রতীকের মালেক হোসেন পেয়েছেন ১৪ হাজার ১৫৯ ভোট ঈগল প্রতীকের মো. রুহুল আমিন পেয়েছেন ৪০৫ ভোট ট্রাক প্রতীকের মো. হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ৩৪৮ ভোট সর্বমোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৯৩ ভোট গৃহীত হয়। ভোটার পরিসংখ্যান আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৫ হাজার ২৮২ জন। এর মধ্যে— নারী ভোটার: ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৭৯ জন পুরুষ ভোটার: ১ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার: ২ জন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ছোটখাট কিছু ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিজয়ীর প্রতিক্রিয়া ফলাফল ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, এলাকায় প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়—ন্যায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে তার মূল লক্ষ্য। তিনি আরও জানান, কেউ অন্যায় অপকর্ম করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ সময় তিনি ৬০ দিনের মধ্যে এলাকা মাদকমুক্ত এবং ৯০ দিনের মধ্যে বাউফলকে দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এলাকাবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।