ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ঢাকার মিরপুরে শতবর্ষী শাহ আলী বোগদাদির মাজারে মধ্যরাতের হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি গত প্রায় দুই বছরে বাংলাদেশজুড়ে সুফি মাজার, দরবার শরীফ, বাউল আখড়া ও পাগল-ফকিরদের আস্তানায় সংঘটিত ধারাবাহিক হামলার নতুন সংযোজন। ভিডিওতে দেখা গেছে, লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক মাজারে জড়ো হওয়া ভক্তদের ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। আতঙ্কে নারী-পুরুষ ছোটাছুটি করছেন। কয়েকজনকে মারধর করে বের করে দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ তুলেছেন, হামলাকারীদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয়ে সংগঠিত ছিল। যদিও অভিযুক্ত রাজনৈতিক দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই হামলার মধ্য দিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে কি সুফি ঐতিহ্য, বাউল সংস্কৃতি ও মাজারকেন্দ্রিক ধর্মীয় চর্চা ক্রমেই সংগঠিত আক্রমণের মুখে পড়ছে? শাহ আলী মাজারে কী ঘটেছিল? মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত শাহ আলী বোগদাদির মাজারে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে নিয়মিত জলসা বসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্তরা সেখানে জড়ো হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক ও হাতে লাঠি নিয়ে একদল লোক হঠাৎ হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাজারসংলগ্ন খোলা জায়গায় মাদুর বিছিয়ে বসা ভক্তদের লক্ষ্য করেই হামলা শুরু হয়। হকারদের দোকানপাটও ভাঙচুর করা হয়। আতঙ্কে অনেকেই পালিয়ে যান। পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে এখনো কোনো মামলা হয়নি এবং কাউকে আটকও করা হয়নি। এই ঘটনার পর স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—এটি কি দেশজুড়ে চলমান মাজারবিরোধী সহিংসতার আরেকটি ধাপ? হামলার পরিসংখ্যান: কতটা বিস্তৃত এই সহিংসতা? সুফি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য একত্র করলে দেখা যায়— শতাধিক মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩ জন আহত হয়েছেন কয়েক শত মানুষ বহু মাজার পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে অনেক জায়গায় ওরস, কাওয়ালি ও বাউল সংগীত বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। কুমিল্লা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলার ধরন: শুধু ভাঙচুর নয়, সাংস্কৃতিক দমনও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হামলাগুলোর ধরন প্রায় একই রকম: প্রথমে ভক্ত ও খাদেমদের মারধর করে সরিয়ে দেওয়া এরপর মাজারে ভাঙচুর লুটপাট কোথাও কোথাও অগ্নিসংযোগ কিছু ঘটনায় বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া বাউল গান, কাওয়ালি ও ওরস বন্ধে চাপ প্রয়োগ কিছু ঘটনায় মাইকিং করে লোক জড়ো করারও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভক্তদের চুল-দাড়ি কেটে অপমান করার অভিযোগও এসেছে। কেন টার্গেট মাজার? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। ১. ধর্মীয় মতাদর্শগত সংঘাত মাজার সংস্কৃতির সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, কিছু মাজারে গান, ধূমপান, নারী-পুরুষের একসঙ্গে অবস্থান বা আচার ইসলামী শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে সুফি অনুসারীরা বলছেন, মাজার হচ্ছে বহুত্ববাদী ও আধ্যাত্মিক চর্চার জায়গা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ অংশ নেয়। এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বই সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ২. রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ ‘মাকাম’-এর প্রতিবেদনে কয়েকটি হামলায় রাজনৈতিক কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। বিভিন্ন ঘটনায় ইসলামপন্থী দলগুলোর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নাম উঠে এসেছে। যদিও অভিযুক্ত দলগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায় অস্বীকার করেছে। ৩. প্রশাসনিক শূন্যতা ও দায়মুক্তি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে বহু এলাকায় ‘মব’ হামলা বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হয়নি, তদন্ত হয়নি বা বিচার হয়নি। ফলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বাউল ও সুফি সংস্কৃতির ওপর প্রভাব মাজারভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের বড় অংশ। ওরস, কাওয়ালি, বাউলগান ও ফকিরি সাধনা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বহু মানুষের জীবিকা ও পরিচয়ের অংশ। কিন্তু হামলার পর— অনেক মাজারে গান বন্ধ ওরস স্থগিত শিল্পীরা বেকার খাদেম ও ভক্তরা পালিয়ে আছেন মাজার পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে বাউল শিল্পীরা বলছেন, তারা সংঘর্ষে জড়াতে চান না, কিন্তু ক্রমাগত ভয় ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছেন। ঐতিহ্যের ওপর আঘাত আক্রান্ত মাজারগুলোর অনেকই শত শত বছরের পুরোনো। কিছু মাজার মুঘল আমল কিংবা মধ্যযুগীয় ইসলামী প্রচারের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। গবেষকদের মতে, এসব স্থাপনা শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়—এগুলো বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ। কিছু মাজারে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষের যাতায়াত ছিল। ফলে হামলাকে অনেকে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের ওপর আঘাত হিসেবেও দেখছেন। মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১৯ মাসে দেশে ‘মব সন্ত্রাস’, ‘গণপিটুনি’, মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। আর বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দুই মাসের কাছাকাছি সময়ে কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলার ঘটনাটি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থান না নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে। মাজার সংস্কৃতি ইসলামী মরমীবাদের পরম্পরাগুলো তরিকা বা সিলসিলা নামে পরিচিত। প্রতিটি তরিকার মধ্যে পীর, ফকির ও পাগল ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাধক দেখা যায়। আবার কলন্দরিয়া ও মাদারী তরিকা মূলত পাগলদের তরিকা। সেমেটিক ও ভারতীয় ঐতিহ্যে প্রাচীনকাল থেকে সাধকদের মধ্যে পাগলপন্থা একটি প্রবহমান ধারা। সবধরনের সামাজিকতা আর বিধি-বিধানকে পাশ কাটিয়ে স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন পাগলদের সুফি পরিভাষায় বলা হয় 'মজ্জুব'। সুফি গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসানুল হাদী ইসলামী ঐতিহ্যে পাগল-ফকিরি ধারার সূচনা প্রসঙ্গে বলেন, 'সুফি শব্দের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি মত আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, "সুফফা" শব্দ থেকে সুফি শব্দের উদ্ভব। সুফফা হচ্ছে মসজিদে নববী সংলগ্ন একটি স্থান, সেখানে মক্কা থেকে হিজরত করে আসা একদল তরুণ অবিবাহিত মুহাজির দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করতেন। তাদের "আসহাব আল সুফফা", "আহলুস সুফফা" অথবা "আহলে সুফফা" বলা হয়। সুফফা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাসুল (স.)। রাসুলের (স.) সাহচর্যের জন্য আহলে সুফফারা উন্মুখ হয়ে থাকতেন, এবাদতে মগ্ন থাকতেন। পাশাপাশি তারা ধর্ম, কৃষি ও শিল্পসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করতেন।' ড. হাদী আরও বলেন, 'আহলে সুফফাদের নিয়মিত খাবার জুটতো না। কারও কারও পোশাক ছিল ছেঁড়া। আহলে সুফফাদের উপহাস করে কেউ কেউ পাগল বলতো।' সুফিদের প্রার্থনাসহ তৎপরতা পরিচালনার কেন্দ্র দরবার শরীফ মূলত কমপ্লেক্স ধরনের হয়। একেকটি কমপ্লেক্সে মসজিদ, মাদ্রাসা, হেফজখানা, গ্রন্থাগার, এতিমখানা, লঙ্গরখানা, হাসপাতাল, অফিস, অতিথি নিবাস ও ভাণ্ডারকক্ষ থাকে। কোনো কোনো দরবার শরীফের রয়েছে একাধিক শাখা দরবার ও খানকাহ। সুফি ঐতিহ্যে যেমন দরবার শরীফ, তেমনি বাউল-ফকিরদের মধ্যে রয়েছে আখড়া-আশ্রম প্রতিষ্ঠার রেওয়াজ। বাউল-ফকিরদের আখড়া ও আশ্রমের পরিসর সাধারণত দরবারের তুলনায় ছোট হয়। অনেকক্ষেত্রে বসতবাড়ির এক কোণে একটি ঘর তৈরির পর পরিণত করা হয় আখড়া বা আশ্রমে। এ ছাড়া, পাগল-ফকিরদের কিছুটা স্থায়ী অবস্থানস্থলকে বলা হয় আস্তানা। অনুসন্ধানে জানা যায়, ইসলামী ঐতিহ্যের মরমী ধারার চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে পাগল-ফকিরদের, বিশেষ করে পাগলদের মাজার। যেখানে ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার প্রবেশাধিকার এবং প্রার্থনার অংশ হিসেবে নিয়মিত সংগীতচর্চা ছিল। অনুষ্ঠিত হতো বাৎসরিক ওরস ও মেলা। এ প্রসঙ্গে কবি এবং সুরেশ্বরী তরিকার ফকিরি ধারা অনুশীলনকারী সৈয়দ তারিক বলেন, 'মাজারের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। এখানে ভক্তিবাদী সাংস্কৃতিক আবহ বিরাজ করে। মাজারে সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষ আসে। এখানে নারীদের প্রবেশাধিকার আছে। যার যেভাবে মন চায়, সেভাবেই প্রার্থনা করে। কোনো ধর্মীয় কঠোরতা নেই। মাজার হচ্ছে আধ্যাত্মিক মুক্তাঞ্চল।' 'মাজার ভাঙার মাধ্যমে সংগীতচর্চা বন্ধ, নারীদের প্রবেশ ও ভক্তি প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। জোর করে শরিয়ত সিস্টেম চাপিয়ে দিয়ে মাজারের নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংসের পায়তারা চলছে। নিজের নিয়ম অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা অগণতান্ত্রিক। মাজারে জোর-জবরদস্তি করলে ফল ভালো হবে না। শরীয়ত বনাম মারিফত লড়াই বেঁধে যেতে পারে', বলেন তিনি। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অভিযোগ পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারও হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মী ও গবেষকরা বলছেন, ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ঘটনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অনেক ভুক্তভোগী নিরাপত্তাহীনতার কারণে মামলা করতেও সাহস পাচ্ছেন না। সামনে কী আশঙ্কা? বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ, এই হামলাগুলো এখন আর শুধু ধর্মীয় স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক পরিচয়, আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা ও সামাজিক সহনশীলতার প্রশ্নে রূপ নিচ্ছে। শাহ আলী মাজারে মধ্যরাতের হামলার পর তাই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—বাংলাদেশ কি তার দীর্ঘদিনের সুফি-লোকজ ঐতিহ্যের ওপর সংগঠিত চাপের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে?
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের মানুষের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা দেশ ইসরাইল। এর পরেই রয়েছে উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরান। বিপরীতে সবচেয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তির দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সুইডেন ও ইতালির নাম। গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক জনমত নিয়ে পরিচালিত নতুন আন্তর্জাতিক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ শীর্ষক এই সমীক্ষা পরিচালনা করেছে বৈশ্বিক জরিপ সংস্থা Nira Data। জরিপে বিশ্বের ১২৯টি দেশ ও তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিয়ে ৪৬ হাজার ৬৬৭ জন উত্তরদাতা মতামত দিয়েছেন। একইসঙ্গে সংস্থাটির ‘গ্লোবাল ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ জরিপে ৯৮টি দেশের ৯৪ হাজার ১৪৬ জন নাগরিক নিজ নিজ দেশে গণতন্ত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গাজা যুদ্ধের প্রভাব জরিপ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান, ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা, খাদ্য ও মানবিক সহায়তায় অবরোধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরাইলের ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আদালতগুলোও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধ আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা অভিযানের পর বিশ্ব জনমতের পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হয়। এতে বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, গাজার অধিকাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত অবস্থায় পড়েছে। জাতিসংঘের একাধিক বিশেষজ্ঞ ও গণহত্যা গবেষক পরিস্থিতিকে “গণহত্যাসদৃশ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতেও বড় পতন সমীক্ষায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার নাটকীয় অবনতি। জরিপ অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনমতের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সবচেয়ে নেতিবাচকভাবে দেখা পাঁচ দেশের একটি। এমনকি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সূচকে দেশটি রাশিয়া ও চীনেরও নিচে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেট ইতিবাচক ধারণার স্কোর ছিল +২২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে -১৬ শতাংশে। মাত্র দুই বছরে ৩৮ পয়েন্ট পতনকে গবেষকেরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর পররাষ্ট্রনীতি, ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে উত্তেজনা, আগ্রাসী শুল্কনীতি, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে বিতর্কিত অবস্থান, ইউক্রেনকে সহায়তা কমানো এবং ইরানকে ঘিরে মার্কিন-ইসরাইল জোটের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া বহু উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে এখন “বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি” হিসেবে দেখছেন। এ তালিকায় রাশিয়া ও ইসরাইলের পরই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান উঠে এসেছে। ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ অভিযোগ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘে ইসরাইলকে জবাবদিহি থেকে রক্ষা করা, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং মানবাধিকার প্রশ্নে নির্বাচিত অবস্থান নেওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মার্কিন নীতিকে “দ্বৈত মানদণ্ড” হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অনেকের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শুধু একটি বৈশ্বিক শক্তি নয়; বরং আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত রাজনীতিরও প্রতীক হয়ে উঠছে। গণতন্ত্র মূল্যায়নের নতুন ধারা ‘গ্লোবাল ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৬’ নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ষিক গণতন্ত্র জরিপ হিসেবে দাবি করেছে। বিশেষজ্ঞভিত্তিক রেটিংয়ের পরিবর্তে এই জরিপে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গণতন্ত্রের মান মূল্যায়ন করা হয়। জরিপে যেসব সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নাগরিক শিক্ষা ক্ষমতার ভারসাম্য আইনের শাসন সরকারের স্বচ্ছতা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ এবং মানবাধিকার সংকট এখন শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : গাজা উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপের নগরী। স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের দাবি, ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের নিচে এখনো অন্তত ৮ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে আছে। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি না থাকায় সেসব মরদেহ বের করা সম্ভব হচ্ছে না। আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল বলেন, তাদের হাতে থাকা উদ্ধার সরঞ্জাম “পুরোনো ও অকার্যকর”। ব্যাপক ধ্বংসস্তূপ সরানোর মতো সক্ষমতা বর্তমানে তাদের নেই। তার ভাষায়, “ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রতিদিন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।” ধ্বংসস্তূপে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাড়ছে ইঁদুরের উপদ্রব গাজার মানবিক সংকট এখন শুধু খাদ্য ও চিকিৎসা ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নেই। সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসস্তূপ পড়ে থাকায় সেখানে ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর বিস্তার ঘটছে, যা নতুন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। মাহমুদ বাসসালের অভিযোগ, ভারী উদ্ধারযন্ত্র গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ইঁদুরনাশক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে ৬ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ জমে আছে। এর মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। ৮১ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত দীর্ঘ সামরিক অভিযান, বিমান হামলা ও বিস্ফোরণে গাজার অবকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী— ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে আরও প্রায় ৭৫ হাজার ভবন আংশিক বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত গাজার মোট অবকাঠামোর প্রায় ৮১ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুরো গাজা পরিষ্কার ও পুনর্গঠনে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় হতে পারে। নিহত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিহতদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। পশ্চিম তীরে সহিংসতা: ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পথে ইইউ এদিকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে সহিংস ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, হাঙ্গেরির নতুন সরকার এ বিষয়ে আর বাধা দেবে না বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নিষেধাজ্ঞা অনুমোদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এই উদ্যোগ আটকে রেখেছিলেন। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। কাজা কালাস বলেন, “সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।” ইউরোপে বাড়ছে কঠোর অবস্থানের চাপ ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভাল্টোনেন পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেনডসেন আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এসব ঘটনায় কার্যত দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ জন এবং আটক হয়েছেন প্রায় ২২ হাজার মানুষ।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুটি হত্যা মামলার আসামি থাকা সত্ত্বেও তার এই পদায়নকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—গুরুতর অভিযোগের মুখে থাকা একজন কর্মকর্তাকে কীভাবে জেলার শীর্ষ পুলিশ পদে নিয়োগ দেওয়া হলো? গত ৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ফেনীর এসপি হিসেবে পদায়ন করা হয়। এর একদিন পর, ৬ মে, তার পদায়ন বাতিল এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেন নিহত যুবদল নেতার পরিবারের সদস্য সেতাউর রহমান। দীর্ঘদিনের অভিযোগ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মাহবুব আলম খান দীর্ঘদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং একাধিক গুম-হত্যার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বদলি হন। সর্বশেষ তিনি সিএমপির ডিবি পশ্চিম জোনের উপ-কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে আসে। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। “বন্দুকযুদ্ধের” আড়ালে হত্যা? দুটি মামলার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিতটি যুবদল কর্মী মিজানুর রহমান হত্যা মামলা। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ছাত্রদল নেতা সেতাউর রহমানকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে আইনাল হকের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেতাউরকে না পেয়ে তার ভাই মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ তাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তারা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি “খোঁজ নেওয়ার” আশ্বাস দেন। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিজানুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। এজাহারে আরও বলা হয়, মিজানুরকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহযোগিতায় পরিবার ৯ লাখ টাকা জোগাড় করে পুলিশের হাতে দেয়। কিন্তু এরপরও আরও ১১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ঘটনার মধ্যে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর মিজানুরের আরেক ভাই রেজাউল করিমকেও রাজশাহী নগরী থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর দীর্ঘ সময় দুই ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল শিবগঞ্জে পুলিশের কথিত “বন্দুকযুদ্ধে” মিজানুর নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়। তবে পরিবারের দাবি, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অন্যদিকে রেজাউল করিম আজও নিখোঁজ। আট বছর পরও নিখোঁজ এক ভাই সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করেন মিজানুর ও রেজাউলের পরিবারের সদস্যরা। তারা অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর আট বছরেও রেজাউলের সন্ধান মেলেনি। একই ঘটনায় থানায় মামলা করার পাশাপাশি গুম কমিশনেও অভিযোগ জমা দিয়েছেন তারা। গত ফেব্রুয়ারিতে গুম কমিশন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা ঘটনাটি তদন্ত করতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যান। মিজান হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, শিবগঞ্জ থানার পরিদর্শক মাহমুদ বলেন, মামলায় ৬ থেকে ৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। দ্বিতীয় হত্যা মামলাও মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের হয় ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর। ফিরোজ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি শিবগঞ্জ থানায় মামলাটি করেন। ওই মামলায় ১২ জন আসামির মধ্যে মাহবুব আলম খানকে তিন নম্বর আসামি করা হয়। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমরান হোসেন জানান, “প্রাথমিক তদন্তে তার নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো জমা দেওয়া হয়নি।” “আমাদের পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছেন” মাহবুব আলম খানের পদায়ন বাতিলের আবেদনকারী সেতাউর রহমান বলেন, “তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় আট বছর চাকরি করেছেন। এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তিনি করেননি। আমাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। মামলা থাকার পরও কীভাবে তাকে এসপি করা হলো—আমরা এর বিচার চাই।” মাহবুব আলম যা বলছেন অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুব আলম খান বলেন, দুটি হত্যা মামলার একটিতে তাকে ইতোমধ্যে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি প্রশিক্ষণে ছিলেন এবং এ সংক্রান্ত প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তার ভাষায়, “আইনাল হকের মামলার ঘটনার সময় আমি ট্রেনিংয়ে ছিলাম। প্রমাণ দিয়েছি। আশা করছি, ওই মামলাতেও আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।” পুলিশ সদর দপ্তরের নীরবতা বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (এডমিন) আবু সালেহ রায়হান বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। বিস্তারিত খোঁজ না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।” “এসপি পদে এমন নিয়োগ উদ্বেগজনক” মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলছেন, ফৌজদারি মামলার আসামি হয়ে জামিন না নেওয়া মানে কার্যত পলাতক থাকা। তার মতে, “এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ থাকা ব্যক্তিকে জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উদ্বেগজনক। এতে বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।” তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে জনআস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তদন্তের আগেই পুরস্কার? মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রশ্ন—তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হলো? বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ বহু বছর ধরেই বিতর্কের বিষয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদায়ন বা পদোন্নতি রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও মানবাধিকার প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেশকিছু মামলায় ব্যক্তিগত সুবিধা চরিতার্থ করার জন্য কিছু সাধারণ ও নিরীহ লোককে আসামি করা হয়েছে। কিছু সুবিধাবাদী শ্রেণি এই মামলাগুলো করেছে যেগুলো আমাদের নজরে এসেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই মামলাগুলো থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেয়া হবে। এজন্য জেলা পর্যায় থেকে মামলাগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (৬ মে) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের চতুর্থ ও শেষ দিনের তৃতীয় অধিবেশন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এ কথা জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ অধিবেশন হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মামলা হয়েছে, যেগুলো গণহত্যার মামলা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা। আমরা তাদের (ডিসি) কাছে তালিকা চেয়েছি জেলা পর্যায়ে যে জেলাওয়ারি কতগুলো মামলা সে রকম দাখিল হয়েছে। এগুলো রিমোট ডিস্ট্রিক্টগুলোতে হয়তো কম, কিন্তু মহানগরগুলোতে সংখ্যা একটু বেশি। তাতে আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব যেন আপনারা সবাই জানেন অনেক মামলার মধ্যে হাজার হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব প্রকৃত অর্থে প্রকৃত আসামি কারা, সেটা তদন্ত কর্মকর্তারা তদন্ত করে দেখবেন এবং যেন স্বল্প সময়ের ভেতরে সেটা ডিসপোজ অব (নিষ্পত্তি) করতে পারে। তিনি বলেন, আর যাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাদের যেন নিষ্কৃতি দেয় সেই সুপারিশ আমরা করেছি। তবে এটা আইনানুগভাবেই হবে, আইনি প্রক্রিয়ায় হবে। ডিসিদের মামলাগুলো পাঠানোর জন্য কত দিন সময় দেওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি এটা দ্রুত পাঠাতে। মৌখিকভাবে বলেছি সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে পাঠাতে। কোনো ক্ষেত্রে কেউ যদি বিলম্ব করে থাকে, আমরা ন্যায় বিচারের স্বার্থে সেটা বিবেচনা করব। আশা করি যারা মামলা প্রত্যাহার চান, তারা তো বিলম্ব করবেন না।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলা পর্যায়ে যে কমিটি আমরা করে দিয়েছিলাম হেডেড বাই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এডিএম, এসপি, পিপি এবং আরও একজন প্রতিনিধি আছে। তারা এই কমিটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে জনসাধারণের কাছে জানিয়েছে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এই সমস্ত ভুয়া মামলা, মিথ্যা মামলাগুলো যদি কারো বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তারা একটা ফরম আছে এই ফর্মের মধ্যে আবেদন করবে উইথ আইদার চার্জশিট, এফআইআর এবং এজাহারসহ। চার্জশিট হয়ে থাকলে চার্জশিটসহ কোন আদালতে মামলা ইত্যাদি তথ্য উল্লেখ করে। তারা সেটা যাচাই-বাছাই করে যদি সত্যিকারে সেই শ্রেণিভুক্ত মামলা হয়ে থাকে তখন সেগুলো প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ করবেন। মন্ত্রী বলেন, এগুলা প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসবে। আমরা এর ওপরে কোনো আইনি ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে নেব না। আমরা এটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। ওখানে আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কমিটি আছে, তারা ভেটিং করে যদি সঠিক পায় যে সমস্ত মামলা প্রত্যাহারের জন্য উপযুক্ত মনে করবেন তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠালে আমরা সিআরপিসির ৪৯৪ অনুসারে সেগুলো প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বা হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যেসব ভুয়া গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়েছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সময়ে, সেই মামলাগুলোর বিষয়ে আমরা আবার একটা পত্র দিয়েছিলাম দায়িত্ব গ্রহণের পরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কিছু কিছু মামলা, কিছু শ্রেণির মামলা অন্তর্ভুক্ত করা ছিল না তখন। যেমন হত্যা মামলা, অস্ত্র মামলা, নারী নির্যাতন, মাদকপাচার, মানবপাচার এই সমস্ত কিছু মামলা এই আওতাভুক্ত করা ছিল না তখন। তিনি বলেন, ‘আমরা পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিবেচনা করেছি যে আমাদের বিরুদ্ধেও অনেক অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা ছিল, আমার জানামতে অন্তত দুই-তিনটা, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায়। চৌদ্দগ্রামের মামলাসহ আমার বিরুদ্ধেও একই মামলাগুলো ছিল। অস্ত্র মামলাও ছিল। আমাদের অনেক নেতার বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেওয়া হয়েছিল, নারী নির্যাতনসহ যে কোনোভাবে যেন আটক রাখা যায় সেই মামলাগুলো দেওয়া হয়েছিল।’
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার ঘটনায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে মোট ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য শনাক্ত করেছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) ঢাকায় প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, নিহতদের পরিচয় পরিবার-স্বজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “মামলার তদন্ত কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী ৭ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে।” বর্তমানে চট্টগ্রাম অংশের কিছু কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি। নিহতদের ভৌগোলিক বণ্টন প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী: ঢাকায় নিহত: ৩২ জন নারায়ণগঞ্জে: প্রায় ২০ জন চট্টগ্রামে: ৫ জন কুমিল্লায়: ১ জন এর আগে রোববার কেবল ঢাকায় ৩২ জন নিহতের তথ্য জানানো হয়েছিল। সর্বশেষ হিসাবে চার জেলায় মোট ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার দাবি চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মামলায় আসামির সংখ্যা ৩০ জনের কম হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে অন্যদের নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তদন্তে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বাহিনী প্রধান ও পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়। ‘শত শত নিহত’ দাবি নিয়ে অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে ‘শত শত’ নিহতের দাবি থাকলেও, প্রসিকিউশন বলছে তাদের তদন্তে ৫৮ জনের তথ্যই নিশ্চিত হয়েছে। “তদন্তের বাইরে কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়,” বলেন আমিনুল ইসলাম। ঘটনার প্রেক্ষাপট ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি পায়। ওইদিন গুলিস্তান এলাকায় সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে সন্ধ্যায় সমাবেশকারীরা শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ২টার আগেই ১৮ থেকে ২০ জন হতাহত হন। মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় আরও হতাহতের ঘটনা ঘটে। চিফ প্রসিকিউটর এ ঘটনাকে “সিস্টেমেটিক ও ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক” এবং “টার্গেটেড কিলিং” হিসেবে উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে অবস্থান হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমঝোতা, বৈঠক বা কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার মতো বিষয় তদন্তে প্রভাব ফেলবে কি না—এ প্রশ্নে প্রসিকিউটর বলেন, “রাজনৈতিক কার্যক্রম এক জিনিস, আর আমাদের বিচারের পরিধি আলাদা। হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাগুলো আমাদের তদন্তে আসবে না।”
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশে এপ্রিল মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। মঙ্গলবার (৫ মে) প্রকাশিত সংগঠনটির মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাসজুড়ে অন্তত ৭৫ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। মোট ৪০টি ঘটনায় সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৭ জন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং ১০ জন হুমকির মুখে পড়েন। এছাড়া তিনজন সাংবাদিককে আটক করা হয় এবং চারটি মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, একই সময়ে দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৪৪টি ঘটনায় ২২ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। রাজনৈতিক সহিংসতাও এপ্রিলে অব্যাহত ছিল। ৯৮টি ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং ৫৩৩ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি এসব ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সাতটি জনসভা ও সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ৪৯ জন আহত এবং দুজন আটক হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। এপ্রিল মাসে ২৯৪ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৮টি ধর্ষণ এবং ৭৯টি যৌন হয়রানির ঘটনা রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় মারা গেছেন ৬৪ জন নারী। শ্রম খাতেও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র পাওয়া গেছে। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা ও অনিরাপদ পরিবেশে ১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : ২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের হলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই শুরু হয় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতন। এ সময়ে চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মগোপনে রয়েছেন অনেকেই। দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জানিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২৬৬ জনকে অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে। গত বছরের ৪ আগস্ট এ তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি। এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া চার সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে। আসক বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কমবেশি নির্যাতন বা হয়রানি করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপাকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ফজলুল করিম নামের একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ছাড়া রাজধানীর আদাবরে পোশাকশ্রমিক রুবেল হত্যা মামলাতেও তাদের দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তারা কারাগারে আছেন, এখনো জামিন পাননি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া কয়েকটি হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। তিনি বর্তমানে কারাগারে। গত বছরের এপ্রিলে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হয়। দলটির চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক যুবককে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়ে মাসের পর মাস কারাগারে বিনা বিচারে কারাবন্দি রয়েছেন। বারবার জামিনের জন্য আবেদন করলেও সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে। সাংবাদিকদেরই অনেকে বলছেন, সাংবাদিকেরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তাদের লেখালেখি বা বক্তব্যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে তার আইনি প্রতিকার রয়েছে। এমনকি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু ঢালাওভাবে হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে নাম ধরে ধরে আসামি করা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ বিষয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তাহলে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা এবং দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা নোয়াবের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বলেছি। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা হবে বলে আশা রাখছি।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন। সেখান থেকেই তিনি লাইভ সম্প্রচার করেন। অন্য টেলিভিশনেও সেই সম্প্রচারের দৃশ্য দেখা গেছে, যার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। কিন্তু একই দিন বিকেলে মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁকেও আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন এসব তথ্য উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর প্রশ্ন, একই ব্যক্তি একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকেন কীভাবে? এখন বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শাহনাজ শারমীনের ঘটনাটিই একমাত্র ঘটনা নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে করা বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছিল। বিভিন্ন পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ সাংবাদিক এখনো মামলার বোঝা বহন করছেন এবং কারাবন্দীদের অনেকেই জামিন পাচ্ছেন না। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৪ মার্চ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও সদস্য। গত বছরের আগস্টে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে গিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না)। মাস তিনেক পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এসব ঘটনায় অন্যদের মধ্যেও কিছুটা আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই, মামলাগুলোর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের ক্ষেত্রে আদালত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেবেন। এর আগে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের জামিন পাওয়ারও প্রত্যাশা করছেন তারা। কারাবন্দি সাংবাদিকদের জামিন বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল। প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখছে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে দায় পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করছেন। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির একটি চিত্র তুলে ধরে। বিষয়টি সংবেদনশীল এবং এতে নানা পক্ষের দাবি–পাল্টা দাবি আছে। সংক্ষেপে এবং বিশ্লেষণ করে বললে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে: ১. সংখ্যাগত চিত্র * Transparency International Bangladesh (টিআইবি) অনুযায়ী: * ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার * ২৬৬ জন হত্যা/সহিংসতার মামলায় আসামি * Ain o Salish Kendra (আসক): * এক বছরে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন/হয়রানির শিকার * Manabadhikar Sangskriti Foundation: * ২৬৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা * অন্তত ১৪ জন গ্রেপ্তার অর্থাৎ, বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়—সংখ্যা ভিন্ন হলেও “বড় আকারে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও চাপ” একটি বাস্তব প্রবণতা হিসেবে উঠে এসেছে। ২. মামলার ধরন নিয়ে বিতর্ক * অধিকাংশ মামলাই **হত্যা বা সহিংসতা সংক্রান্ত**, যা খুব গুরুতর অভিযোগ * অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ: * একই ঘটনায় বহুজনকে আসামি করা হয়েছে * কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঘটনাস্থলে ছিলেন না—এমন দাবিও এসেছে * আইনজীবীদের মতে, এসব মামলার “প্যাটার্ন প্রায় একই” এতে প্রশ্ন উঠছে—আইন কি নির্দিষ্ট অপরাধ বিচারের জন্য ব্যবহার হচ্ছে, নাকি কখনো কখনো **রাজনৈতিক বা প্রতিশোধমূলক চাপের হাতিয়ার** হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? ৩. দীর্ঘদিন জামিন না পাওয়া * অনেক সাংবাদিক: * মাসের পর মাস, এমনকি দেড়–দুই বছর কারাগারে * এখনো চার্জশিট হয়নি * অভিযোগ: * জামিন শুনানিতে বারবার সময় নেওয়া * হাইকোর্টে জামিন পেলেও স্থগিত হয়ে যাচ্ছে এটি **ন্যায়বিচারের গতি ও প্রক্রিয়া** নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। ৪. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট * গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু গোষ্ঠী সাংবাদিকদের “পূর্ববর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে * বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ এসেছে * ফলে বিষয়টি শুধু রাষ্ট্র বনাম সাংবাদিক নয়, বরং **বহুমাত্রিক চাপের পরিবেশ** তৈরি হয়েছে ৫. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া * Committee to Protect Journalists (CPJ) * Reporters Without Borders * Article 19 এসব সংগঠন বলছে: * অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই * সাংবাদিকতার কারণে টার্গেট করা হতে পারে * মুক্তি ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে ৬. মূল দ্বন্দ্ব: আইন বনাম স্বাধীনতা এই পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে: **একদিকে:** * কেউ অপরাধ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি **অন্যদিকে:** * ঢালাও মামলা, দীর্ঘ আটক, প্রমাণহীন অভিযোগ → এগুলো হলে তা **মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের ওপর চাপ** হিসেবে দেখা হয় ৭. সারসংক্ষেপ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলো হলো: * মামলার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা * দীর্ঘ প্রি-ট্রায়াল আটক * সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে “গণহারে” অভিযোগ * বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আইন কি সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি কখনো তা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?** আইন যেন নিপীড়নের হাতিয়ার না হয়' গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল অভিযোগ সাংবাদিকদের অনেকের। সংবাদমাধ্যমের অফিসে হামলা, শত শত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং তিন দফায় সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে এমন মামলা ও গ্রেফতারের সমালোচনা করছেন মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবীরা। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, আর্টিকেল ১৯, রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস এর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও এ ঘটনার সমালোচনা করে আসছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এর আগে এক বিবৃতিতে, সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং হত্যা মামলার আসামি করা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে সম্প্রতি চারজন সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করেছে- তারা হলেন, মোজাম্মেল হক বাবু, শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ। সিপিজের চিঠিতে বলা হয়েছে, নথিপত্র, স্বজনদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা বলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। কোনো অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়নি। ”আটক রাখার ধরন দেখে মনে হয় মূলত সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাদের এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে”- লিখেছে সিপিজে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের সময়েও এরকম ঢালাও মামলা করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছিল। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানবাধিকারকর্মী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, "আইন যেন নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেবে, কিন্তু যাতে কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত না করা হয় এবং মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া না হয়। আইনের অবশ্যই নিরপেক্ষ, সুষ্ঠ এবং সৎ প্রয়োগ হতে হবে।" বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের এই উপদেষ্টা বলছেন, "মানবাধিকারকর্মী হিসেবে স্বাধীন মত প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় এরকম কাজের বিরোধিতা করি।" এদিকে, নোয়াবের সভাপতি ও সাংবাদিক নেতা মতিউর রহমান চৌধুরী জানান, নির্বাচিত এই বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের এই প্রসঙ্গে ইতিবাচক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংবাদিক নেতাদের জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের মামলাগুলো এই সরকারের আমলে দায়ের হয়নি কিংবা কেউ গ্রেফতারও হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সুরাহা করার আশ্বাস দিয়েছেন উল্লেখ করে মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক বলেন, "আমরা আশা করি যেহেতু পুরোনো মামলা, এই মামলাগুলো সরকার রিভিউ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে"।
লেবাননের সাংবাদিক আমাল খলিল নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাংবাদিকরা কি পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাচ্ছেন, নাকি তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন? লেবাননের দৈনিক আল-আখবার-এর প্রতিবেদক খলিল বুধবার এক হামলায় নিহত হন। তিনি তখন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জেইনাব ফারাজের সঙ্গে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। লেবাননের কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে “যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে চলতি বছরে লেবাননে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অন্তত ২৯৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে লক্ষ্যবস্তু করা নিয়ে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, একাধিক ঘটনায় সন্দেহ দেখা যাচ্ছে—সাংবাদিকদের কি তাদের পেশাগত পরিচয়ের কারণেই টার্গেট করা হচ্ছে? কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, “এই ঘটনার অনেক প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন রয়ে গেছে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, হামলার পর কেন উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। তার মতে, চিকিৎসা সহায়তা বাধাগ্রস্ত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। ইসরায়েলের অবস্থান ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের “বৈধ সামরিক লক্ষ্য” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সিপিজে ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব দাবির পক্ষে অনেক সময় পর্যাপ্ত বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় না। বিতর্কিত উদাহরণ ২০২৫ সালের আগস্টে গাজার আল-শিফা হাসপাতালের কাছে এক হামলায় আল জাজিরার সাংবাদিক আনাস আল-শরিফ নিহত হন। পরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তিনি হামাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সিপিজে বলছে, তারা যে তথাকথিত প্রমাণ পেয়েছে তা ছিল একটি স্প্রেডশিটে নামের পাশে একটি লোগো—যা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত নয়। একইভাবে, সাংবাদিক আলি শোয়েইবের ক্ষেত্রেও একটি ছবি প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়, যা পরে বিকৃত বলে জানা যায়। আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন জাতিসংঘ বলছে, আন্তর্জাতিক আইনে কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করতে হলে কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানান, শুধুমাত্র “সম্পৃক্ততা”র অভিযোগ যথেষ্ট নয়—এটি স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। প্রবেশাধিকার ও আটক গাজায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশ দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধ। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সংগঠনগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আদালতে গেলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এদিকে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের আটক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২০০-র বেশি সাংবাদিক আটক হন, যাদের মধ্যে কয়েক ডজন তখনও হেফাজতে ছিলেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, আটক থাকা কিছু সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ বিভিন্ন ঘটনায় তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হলেও সেগুলোর ফলাফল খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকাশিত হয়—এমন অভিযোগ তুলেছে সিপিজে। জাতিসংঘ বলছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কার্যকর প্রয়োগ নির্ভর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর। তথ্যপ্রবাহে প্রভাব বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিক নিহত হওয়া, প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধতা এবং আটক—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। সংঘাতের বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য যেখানে নিরপেক্ষ তথ্য জরুরি, সেখানে প্রতিটি সাংবাদিকের মৃত্যু একটি সম্ভাব্য তথ্যসূত্র হারিয়ে যাওয়ার সমান।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : রানা প্লাজা ধসের এক দশকেরও বেশি সময় পরও ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থামেনি। সরকারি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় গঠিত একটি কাঠামোবদ্ধ তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ সহায়তা পেলেও, এর বাইরে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ—যার অনেকগুলোরই এখনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। ক্ষতিপূরণের কাঠামো: একটি আন্তর্জাতিক মডেল রানা প্লাজা ধসের পর গঠিত ‘রানা প্লাজা ক্লেইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ কমিটি ছিল ক্ষতিপূরণ বণ্টনের মূল কেন্দ্র। সরকার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে এই তহবিল পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে মেডিক্যাল অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত। সেই অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হয়— অঙ্গহানির ক্ষেত্রে এককালীন অর্থ না দিয়ে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) করা হয় সাধারণত ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকার মধ্যে এই আমানত নির্ধারণ করা হয় নিহত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তাদের আয় অনুযায়ী নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ বণ্টন করা হয় এই প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের আপত্তি পাওয়া যায়নি, এবং সংশ্লিষ্টরা এটিকে তুলনামূলক স্বচ্ছ ও কাঠামোবদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করেন। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: বেসরকারি উদ্যোগ তবে বিতর্ক শুরু হয় তহবিলের বাইরে সংগৃহীত অর্থ নিয়ে। ২০২৩ সালে অভিযোগ ওঠে, রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চ্যারিটি আয়োজনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থ ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছেনি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিলেটের একটি আদালতে মামলা দায়ের করেন এক মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান। অভিযোগে বলা হয়, লন্ডনে আয়োজিত কয়েকটি অনুষ্ঠানে একজন নিখোঁজ শ্রমিকের ছবি ব্যবহার করে প্রায় ২৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ: “নাম ব্যবহার, টাকা নয়” ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের একাংশের বক্তব্যে উঠে এসেছে হতাশা ও ক্ষোভ। পারুল বেগম, যিনি ধসে গুরুতর আহত হয়েছিলেন, বলেন— তার চিকিৎসা ব্যয় এখনও মাসে ৮-১০ হাজার টাকা। সরকারি সহায়তা পেলেও বেসরকারি সংস্থা থেকে তিনি পেয়েছেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা। তার ভাষায়: “আমাদের নাম দিয়ে কোটি কোটি টাকা আনা হয়, কিন্তু আমরা পাই খুব সামান্য।” একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন মাসুদা আক্তার। তার দাবি, বিভিন্ন মিটিং-মিছিল ও প্রচারণায় তাদের ব্যবহার করা হয়েছে বিদেশ থেকে অর্থ আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তারা পেয়েছেন নামমাত্র সহায়তা তার অভিযোগ, “মানুষ দেখিয়ে টাকা আনা হয়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের হাতে তা পৌঁছায়নি।” সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া: প্রমাণের অভাব অভিযোগের বিষয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, এ ধরনের অভিযোগ শোনা গেলেও তার কাছে নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির পক্ষ থেকে বলা হয়— সরকারি ও আন্তর্জাতিক তহবিলের অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে গেছে সেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ ছিল না তবে তারা স্বীকার করেন, আইনে নির্ধারিত পূর্ণ ক্ষতিপূরণ অনেকেই পাননি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বচ্ছতার প্রশ্ন: “হিসাব প্রকাশ জরুরি” শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা হলো স্বচ্ছতার অভাব। অভিযোগগুলো প্রমাণ করা কঠিন হলেও কিছু সাধারণ বিষয় উঠে এসেছে— অল্প সহায়তা দিয়ে বড় অঙ্কের প্রচারণা চিকিৎসা খরচে অতিরিক্ত বিল দেখানোর অভিযোগ সহায়তার নামে স্বাক্ষর নেওয়ার অসঙ্গতি তাদের মতে, সমাধানের একমাত্র পথ হলো: কে কত টাকা সংগ্রহ করেছে কোথা থেকে এসেছে কাকে কত দেওয়া হয়েছে এই পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা। তদন্তের দাবি জোরালো শ্রমিকনেতা ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অভিযোগগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের। তাদের দাবি— স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর জবাবদিহি ভবিষ্যতের জন্য স্বচ্ছ তহবিল ব্যবস্থাপনা অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি রানা প্লাজা ধসের পর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই এখনো অপূর্ণ— আহতদের আজীবন চিকিৎসা পুনর্বাসন স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা সময়ের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাতেও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শেষ কথা রানা প্লাজা শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়, এটি শ্রমিক অধিকার, করপোরেট দায়বদ্ধতা এবং মানবিক ন্যায়বিচারের একটি বৈশ্বিক প্রতীক। কিন্তু এক দশক পরও যদি প্রশ্ন থেকে যায়— কে কত পেল, কে কত নিল— তাহলে তা শুধু অতীতের ব্যর্থতা নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
পিরোজপুর : পিরোজপুরে চুরির অভিযোগে আটক এক অস্থায়ী কেয়ারটেকারকে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের দাবি, তাকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ভুক্তভোগী মো. ইউনুস ফকির (৪০) পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি একটি পুলিশ অফিসার্স মেসে অস্থায়ী কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তার কক্ষ থেকে টাকা চুরির অভিযোগ তুলে ইউনুস ফকিরকে আটক করা হয়। কক্ষের একটি চাবি তার কাছে থাকায় তাকে সন্দেহ করা হয়। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও তাকে হাতকড়া পরিয়ে মারধর করা হয় বলে দাবি পরিবারের। তাদের ভাষ্য, নির্যাতনের অংশ হিসেবে ইউনুসকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় এবং গরম মোম গলিয়ে শরীরের সংবেদনশীল স্থানে ঢেলে দেওয়া হয়। চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবার আরও জানায়, পরে তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ‘প্রকৃত অভিযুক্ত শনাক্ত’ ঘটনার কয়েকদিন পর নতুন মোড় আসে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মেসের এক ঝাড়ুদার শাকিল চুরির কথা স্বীকার করেন এবং টাকা ফেরত দেন বলে জানানো হয়েছে। এরপর ইউনুসের পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়। ‘ধামাচাপার চেষ্টা’ অভিযোগ ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি গোপন রাখতে ইউনুসকে হাসপাতালে নিতে বাধা দেওয়া হয় এবং তাকে নিজের আঘাত সম্পর্কে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে চাপ দেওয়া হয়। এমনকি খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরও একই ধরনের বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল বলে দাবি তাদের। ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, “আমার ভাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। পুলিশের ভয়ে আমরা কোনো অভিযোগ করতে পারিনি।” পুলিশের প্রতিক্রিয়া অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তা সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ছুটিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সহ তিনজনকে ক্লোজড করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ঘটনার তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রেক্ষাপট ও প্রশ্ন বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি আবারও মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখন মূল প্রশ্ন—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার কতটা নিশ্চিত করা যায়, এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাবেন কি না।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কুষ্টিয়ায় একটি পীরের দরগায় হামলার ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়—বরং সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বাড়তে থাকা ‘মব জাস্টিস’-এর একটি উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। ইসলাম বিকৃতির অভিযোগ ঘিরে গত শনিবার ‘শামীম বাবার দরবার শরিফে’ যে হামলা হয়, তার আগে-পরে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে উত্তেজনা ছড়ানো, সংগঠিত আক্রমণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধের ঘাটতির এক জটিল চিত্র। হামলার দিন: আলোচনার বদলে আক্রমণ ঘটনার সময় দরগার ভেতরেই ছিলেন এর প্রধান আব্দুর রহমান শামিম, যিনি নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দিতেন। উপস্থিত ছিলেন দরগার খাদেম জামিরন নেসাও। তার বর্ণনায়, হামলার আগে এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল—পীর ইসলামবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। জামিরন নেসা বলেন, শুরুতে ধারণা ছিল স্থানীয় মানুষ আলোচনা করতে আসবেন। “পীর বাবা বলছিলেন, আমার যদি ভুল হয়, আমি মেনে নেবো—কিন্তু তারা যেন কথা বলে,” জানান তিনি। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। এক থেকে দেড়শো মানুষ লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে দরগায় ঢুকে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শামিম আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। তিনি দুই হাত তুলে থামতে বললেও হামলাকারীরা তা উপেক্ষা করে। এলাপাতাড়ি হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি এবং পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ‘ধর্ম অবমাননা’—উত্তেজনা তৈরির হাতিয়ার? এই হামলার পেছনে অন্যতম ট্রিগার হিসেবে উঠে এসেছে একটি ভিডিও। অভিযোগ—পীরের পুরনো বক্তব্য কেটে সম্পাদনা করে তা ‘কোরআন অবমাননা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। অনুসারীদের দাবি, এটি ছিল বিকৃত উপস্থাপন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি পরিচিত প্যাটার্ন। প্রথমে ‘ধর্ম অবমাননা’ বা ‘ইসলাম রক্ষার’ আহ্বান ছড়ানো হয়, এরপর তা জনরোষে রূপ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ধর্মীয় আবেগকে সামনে আনা হলে সাধারণ মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে—কিংবা নীরব থাকে। এতে সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তার ভাষায়, “ইসলাম রক্ষার নামে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত।” লুটপাট ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এই হামলাকে শুধুই ধর্মীয় উত্তেজনার ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। ঘটনাস্থলে লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। নিহতের ভাইয়ের করা মামলায় দরগার সম্পদ ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খাদেম জামিরন নেসাও বলেন, হামলার সময় একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাটে জড়িত ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় অভিযোগকে ব্যবহার করা হয় জমি দখল বা সম্পদ লুটের আড়াল হিসেবে। ধর্মীয় বয়ান ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কিছু ধর্মীয় বক্তৃতায় নির্দিষ্ট পীর, মাজার বা মতাদর্শকে ‘বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা রয়েছে। যদিও ইসলামী গবেষক ড. ওয়ালীয়ুর রহমান দাবি করেন, এসব সহিংসতার পেছনে ‘বড় আলেমদের’ নির্দেশনা থাকে না। তার মতে, অনেক সময় কম শিক্ষিত বা উত্তেজিত তরুণরাই এমন ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ধর্মীয় বয়ানে সতর্কতার অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ইমাম ও খতিবদের উচিত—ধর্মীয় সমালোচনার পাশাপাশি স্পষ্টভাবে বলা যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মব সহিংসতার বিস্তার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে অন্তত ৮৮টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জোবাইদা নাসরীন বলেন, “ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে সরকারসহ সব দলই এ ধরনের ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপে দ্বিধাগ্রস্ত।” সরকারের স্বীকারোক্তি এই প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান স্বীকার করেছেন, মব সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো সরকারের দায়িত্ব ছিল, এবং আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তবে এখন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে।” সরকার আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বললেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে এবং কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। একটি বিপজ্জনক ধারা কুষ্টিয়ার এই ঘটনা দেখায়, কীভাবে গুজব, বিকৃত তথ্য, ধর্মীয় আবেগ এবং সংগঠিত স্বার্থ একত্রে সহিংসতার জন্ম দেয়। আলোচনার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি আক্রমণে যাওয়ার এই প্রবণতা শুধু আইনের শাসনকেই চ্যালেঞ্জ করছে না—বরং সামাজিক সহাবস্থানের ভিত্তিকেও দুর্বল করছে। যদি দ্রুত ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ‘ধর্ম রক্ষার’ নামে এই সহিংসতা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গোপালগঞ্জ: ভারতে স্ত্রী-সন্তানের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি-জমি বিক্রি করে রওনা হয়েছিলেন গোপালগঞ্জের রথিকান্ত জয়ধর (৪৬)। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মহেশপুর উপজেলার পুলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতি নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠানো হয়েছে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মর্গে। রথিকান্ত জয়ধর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পলোটানা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি চার সন্তানের জনক। পরিবার ভারতে, একা রথিকান্ত পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে রথিকান্তের স্ত্রী উজ্জলী জয়ধর চার সন্তানকে নিয়ে ভারতের কলকাতায় চলে যান। এরপর কয়েকবার তিনি সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) জমিজমা ও বসতবাড়ি বিক্রি করে টাকা নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন রথিকান্ত। তবে তিনি কোন পথে বা কার সহায়তায় সীমান্ত পাড়ি দেবেন, তা পরিবারের কাউকে জানাননি। যেভাবে জানা গেল মৃত্যুর খবর রথিকান্তের ছোট ভাই রণজিৎ জয়ধর জানান, “ভাই কলকাতায় যাবে বলে বের হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ থেকে তার মৃত্যুর খবর পাই। পরে গিয়ে লাশ শনাক্ত করি।” পুলিশের বক্তব্য মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, “ইছামতি নদী থেকে লাশ উদ্ধারের সময় তার সঙ্গে একটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।” তিনি জানান, মরদেহে গুলির চিহ্ন রয়েছে, বিশেষ করে বুকে। তবে কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। দালাল চক্রের ঝুঁকি মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খান চমন-ই-এলাহী বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের ক্ষেত্রে দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রতারণা ও হত্যার ঘটনা নতুন নয়। তার ভাষায়, “অনেকেই সর্বস্ব বিক্রি করে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পথে প্রতারণা বা সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এই বিষয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।” তিনি রথিকান্তের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে দ্রুত তদন্তের দাবি জানান।
এইচ এম মিলন ,মাদারীপুর : মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার গদাধরদী গ্রামে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর ধারাবাহিক হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের এক সদস্য প্রাণনাশের আশঙ্কায় ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। স্থানীয় সূত্র ও পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিন্ময় কর্মকার অনীক নামে ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার প্রভাবশালী কিছু মানুষের কাছ থেকে নানা ধরনের হুমকি পেয়ে আসছিলেন। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দেশ ত্যাগ করেন। পরিবারের অভিযোগ, অনীক দেশ ছাড়ার পরও তার বাবা অরুণ চন্দ্র কর্মকার এবং মা অলোকা রানী কর্মকারকে হুমকি দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে অনীককে দেখামাত্র হত্যার হুমকি দিয়েছে বলেও দাবি পরিবারের। এতে করে পরিবারটির মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, সংখ্যালঘু পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ইসরাইলের কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি বন্ধের একটি প্রস্তাব ভোটে পাস না হলেও, মানবাধিকারকর্মীরা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বুধবার অনুষ্ঠিত এই ভোটে ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের বড় অংশ প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নেন। তবে শেষ পর্যন্ত ৪০-৫৯ ভোটে তা নাকচ হয়ে যায়, কারণ সাতজন ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকানদের সঙ্গে যোগ দেন। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি বার্নি স্যান্ডার্স। এতে ইসরাইলের কাছে সামরিক বুলডোজার বিক্রি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ফলাফল ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিঃশর্ত সমর্থনের মধ্যে ফাটলের ইঙ্গিত দেয়। শান্তিবাদী সংগঠন জাতীয় আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত বন্ধু কমিটি-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক হাসান এল-তাইয়্যাব বলেন, “প্রস্তাবটি পাস না হলেও এটি দেখিয়েছে, সিনেটের অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট এখন ইসরাইলকে নিঃশর্ত সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করছেন।” তার মতে, এটি শুধু অস্ত্র বিক্রি নয়, বরং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য বড় সংঘাতের বিরুদ্ধেও একটি রাজনৈতিক বার্তা। এই ভোট এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করছেন, গাজা ও লেবাননে নগর ধ্বংসে বুলডোজার ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তারা ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এদিন আরেকটি ভোটে ৩৬ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইসরাইলের কাছে ১,০০০ পাউন্ড বোমা সরবরাহ বন্ধের পক্ষে ভোট দেন—যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৪ সালে এমন প্রস্তাবে সমর্থন ছিল ১৮টি, আর গত বছর ছিল ২৭টি। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় চলমান যুদ্ধ, দক্ষিণ লেবাননের ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা—এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ। স্যান্ডার্স বলেন, “আমেরিকানরা চায় তাদের করের অর্থ দেশের ভেতরে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হোক, মধ্যপ্রাচ্যে নিরীহ মানুষ হত্যায় নয়।” বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ৮০ শতাংশ এবং ৫০ বছরের নিচে তরুণদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে, শান্তির জন্য ইহুদি কণ্ঠস্বর-এর রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেন, “গাজায় সহিংসতা, লেবাননে বোমাবর্ষণ এবং ইরান ইস্যুর প্রেক্ষাপটে অস্ত্র সরবরাহের পক্ষে ভোট দেওয়া লজ্জাজনক।” তার মতে, সিনেটে ৪০টি সমর্থন ভোটই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে আবারও সামনে এসেছে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির বাস্তবতা। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে কি এ ধরনের সহিংসতা থামছেই না? বাংলাদেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির প্রবণতা কমছে—এমন সরকারি আশ্বাসের বিপরীতে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কুষ্টিয়া ও রাজধানী ঢাকার শাহবাগে সংঘটিত দুটি পৃথক ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, জনতার তাৎক্ষণিক বিচার ও সহিংস প্রতিক্রিয়া এখনো উদ্বেগজনকভাবে সক্রিয়। দুটি ঘটনা, একই প্রবণতা গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তিকে ‘পীর’ পরিচয়ে প্রতারণা এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে স্থানীয় জনতা পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রাণহানি ঘটে। এর মাত্র একদিন আগে, ১০ এপ্রিল, রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামিতার অভিযোগ তুলে একদল নারী-পুরুষের ওপর হামলা চালানো হয়। ঘটনাটি শুধু সহিংসতার নয়, বরং সামাজিক অসহিষ্ণুতার একটি জটিল প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সরকারি বক্তব্য বনাম বাস্তবতা জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ একাধিকবার বলেছেন, দেশে ‘মব কালচার’ শেষ হয়ে এসেছে। এমনকি জাতীয় সংসদেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মবের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।” কিন্তু মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে চুরি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গণপিটুনির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংখ্যা যা উদ্বেগ বাড়ায় মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী: শুধু মার্চ মাসেই ২৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত ১৩ জন, আহত ৩৮ জন গত তিন মাসে ৮৮টি ঘটনায় নিহত ৪৯ জন, আহত ৮০ জন অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়: ২০২৫ সালে গণপিটুনিতে নিহত ১৯৭ জন ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮ অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এই সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন বাড়ছে মব সহিংসতা? অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; বরং বহুমাত্রিক সামাজিক সংকটের ফল। তার মতে, “বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং অনলাইন গুজব—এই চারটি কারণ মব ভায়োলেন্সকে উসকে দিচ্ছে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া জনমনে দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করছে, যা মুহূর্তেই সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সহিংসতা চরমে পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও উপস্থিত থাকলেও উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, “মব ভায়োলেন্স পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।” তবে তিনি জানান, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার ও সামাজিক ঝুঁকি মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যও হুমকি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা মৌলিক অধিকার। মব সহিংসতা এই অধিকারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।” সমাধানের পথ কোথায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়—সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খুঁজতে হবে। মূল সুপারিশগুলো হলো: দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা গুজব প্রতিরোধে কার্যকর ডিজিটাল মনিটরিং জনসচেতনতা বৃদ্ধি সামাজিক সহনশীলতা ও আইনের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্বেগ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মাজার ভাঙচুর ও ‘পীর’ শামীম রেজা জাহাঙ্গীর হত্যা এবং রাজধানীর শাহবাগে নাগরিক ও শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। রোববার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের বিচার দাবি করেছে। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, দিনের আলোতে মানুষ হত্যা ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্নের ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরে শামীম রেজার আস্তানায় হামলা ও তাকে হত্যার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির মতে, সম্প্রতি দেশে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির প্রবণতা বেড়েছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এ ধরণের সহিংসতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। এমনকি শাহবাগের ঘটনায় মামলা করতে গিয়েও ভুক্তভোগীরা অসহযোগিতার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে কমিটির পক্ষ থেকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। শাহবাগের ঘটনায় অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা। ভিন্নমত ও লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ধর্মীয় দোহাই দিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরিকারীদের আইনের আওতায় আনা। সবার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া। মব সহিংসতা একটি পুনরাবৃত্ত সামাজিক সংকেত বাংলাদেশে মব সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি পুনরাবৃত্ত সামাজিক সংকেত। রাষ্ট্র যদি দ্রুত, দৃঢ় এবং বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান সংবলিত ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংশোধনীসহ পাসের সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা শেষে বিশেষ কমিটি চূড়ান্ত রিপোর্টে এই সিদ্ধান্ত জানায়। গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির প্রধান জয়নুল আবদিন এমপি এই প্রতিবেদনটি পেশ করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল অধ্যাদেশে আওয়ামী লীগের নাম উল্লেখ করে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের যে ধারা ছিল, সেখানে কিছু পরিবর্তন বা পরিমার্জন এনে এটি পাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের সংশোধনী আনা হচ্ছে, তা প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারিকৃত এই অধ্যাদেশে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সত্তা বা সংগঠনের সভা, সমাবেশ, মিছিল এবং প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শাসনের অভিযোগে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এই আইনটি আনা হয়। বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশটি সরাসরি বাতিলের তালিকায় না রেখে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের পক্ষে মত দিয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া কঠোর আইনি পদক্ষেপটি বর্তমান সংসদীয় অধিবেশনে কার্যকর হচ্ছে না। গুমের দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জারি করা অধ্যাদেশটি আপাতত স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। সংসদে জমা দেওয়া কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ’ সহ মোট ১৬টি অধ্যাদেশ বর্তমানে অনুমোদন না দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরবর্তীতে বিল আকারে পেশ করতে বলা হয়েছে। এর ফলে গুম বিরোধী এই কঠোর আইনের প্রয়োগ আপাতত ঝুলে গেল। কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মানবাধিকার কমিশন আইনের সংশোধন, তথ্য অধিকার আইন এবং গুম বিরোধী আইনের মতো বিষয়গুলো আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজন। তড়িঘড়ি করে এগুলো পাস না করে পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ বিল হিসেবে সংসদে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে চলতি অধিবেশনে এই অধ্যাদেশটি আর আইনে পরিণত হচ্ছে না। বিগত সরকারের আমলে ঘটা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স বা গুমের ঘটনা তদন্ত ও বিচার করতে অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশটি জারি করেছিল। এতে গুমকে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। মা নবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল গুম বিরোধী আইনটি দ্রুত কার্যকর করা। কিন্তু সংসদীয় কমিটির এই ‘স্থগিত’ রাখার সিদ্ধান্তে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনটি বাতিল করা হয়নি বরং প্রক্রিয়াগত কারণে এটি পরবর্তী অধিবেশনে বিল হিসেবে আসবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় সংক্রান্তসহ মোট ৪টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এছাড়া বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আরও ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত স্থগিত বা ‘শেলভড’ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনে যে ৪টি অধ্যাদেশ বাতিলের (Repealed) প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হলো: ১. জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪। ২. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫। ৩. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫। ৪. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬। বাতিলের তালিকায় থাকা সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ মূলত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও প্রধান বিচারপতির অধীনে পৃথক সচিবালয় গঠনের লক্ষ্যে জারি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করার কথা ছিল। এছাড়া ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিশেষ কমিটির সুপারিশে এই ঐতিহাসিক সংস্কারগুলো বাতিলের মুখে পড়ল। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে ২০টি অধ্যাদেশের ওপর ভিন্নমত (নোট অফ ডিসেন্ট) পোষণ করেছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পর্যালোচিত বিলগুলো আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) থেকে পর্যায়ক্রমে সংসদে উত্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন শুধু যুদ্ধবিমানের শব্দ নয়—ভেসে বেড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক আইনের অস্তিত্ব সংকটের প্রশ্নও। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত নতুন করে বিশ্বকে দাঁড় করিয়েছে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে: রাষ্ট্রগুলো কি আর আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য বোধ করছে? বিশ্বজুড়ে শতাধিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের স্বাক্ষরিত এক খোলা চিঠি সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ ল-এর একটি অনলাইন জার্নালে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের জন্য বিপজ্জনক নজির হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শক্তি প্রয়োগ: আইনের সীমা কোথায়? আন্তর্জাতিক আইনের মূল কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে জাতিসংঘ -এর সনদের মাধ্যমে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে—আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ সেই সীমা অতিক্রম করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে: এটি কি প্রতিরক্ষা, নাকি আক্রমণ? ‘No Quarter’: যুদ্ধনীতির লঙ্ঘন? মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের “no quarter” মন্তব্য—অর্থাৎ শত্রুকে কোনো দয়া না দেখানোর আহ্বান—আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি -এর যুদ্ধনীতি অনুযায়ী, আত্মসমর্পণকারী বা আহত যোদ্ধাকে হত্যা করা যুদ্ধাপরাধ। এই নীতির ভিত্তি হলো—যুদ্ধেও মানবতা রক্ষা করতে হবে। মিনাব: একটি স্কুল, একটি ভুল, নাকি যুদ্ধাপরাধ? ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা এই সংঘাতের সবচেয়ে অন্ধকার দিক তুলে ধরে। হামলায় নিহত হয় অন্তত ১৬৮ জন, যার মধ্যে ১১০ জনই শিশু। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পাশের একটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে গিয়ে পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ভুলবশত স্কুলটিতে আঘাত হানা হয়। যদি এটি অবহেলার ফল হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে—বিশেষ করে যখন বেসামরিক অবকাঠামোকে সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট। সংখ্যার আড়ালে মানবিক বিপর্যয় এই যুদ্ধ শুধু কৌশলগত নয়—এটি এক গভীর মানবিক সংকট। ইরানে নিহত: ১,৬০৬ জন (২৪৪ শিশু) লেবাননে নিহত: ১,৩৪৫ জন ইসরায়েলে নিহত: ১৯ জন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিহত: অন্তত ২৪ জন এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি গল্প, একটি হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ। জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার এই পরিস্থিতিকে “বেপরোয়া” বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, “কোনো এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক আইনকে যেন পাশ কাটানো হয়েছে।” যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: নিরাপত্তা নাকি কৌশল? হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, এই পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদদ ও নিজ জনগণের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ পুনরায় তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের যুক্তি—যদি আইন লঙ্ঘন করেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, তবে সেই নিরাপত্তা কতটা টেকসই? আইনের ভবিষ্যৎ: ভেঙে পড়ছে কি বৈশ্বিক কাঠামো? এই সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়েও একটি পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হ্যারল্ড হংজু কোহ, ওনা এ. হ্যাথাওয়ে এবং জনাথন ট্রেসি-এর মতো ব্যক্তিত্বরা সতর্ক করেছেন—এ ধরনের নজির যদি চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আইনের তোয়াক্কা না করেই সামরিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত হবে। শেষ প্রশ্ন যুদ্ধের ময়দানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে অস্ত্রের শক্তিতে। কিন্তু ইতিহাস বিচার করে—কোন পক্ষ আইন ও মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এই সংঘাত সেই বিচারের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। এখন প্রশ্ন একটাই: আন্তর্জাতিক আইন কি শুধু কাগজে থাকবে, নাকি বাস্তবেও তার প্রয়োগ নিশ্চিত হবে?
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপিত না হওয়ায় এগুলো ১২ এপ্রিলের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ জারির পর পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে তা পাস না হলে সেটি বাতিল হয়ে যায়। ১২ মার্চ সংসদের যাত্রা শুরু হওয়ায় সময়সীমা শেষ হচ্ছে ১২ এপ্রিল। কেন সংসদে তোলা হচ্ছে না? জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, এই ১৬টি অধ্যাদেশ বর্তমান অবস্থায় পাস করার মতো উপযুক্ত নয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোট, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী— এগুলো এখনই বিল আকারে না এনে আরও যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী ও সংশোধিত আকারে পুনরায় উপস্থাপন করা হবে এতে স্পষ্ট যে, আইনগুলোর বিষয়বস্তু নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও নীতিগত দ্বিধা রয়েছে। আইনগত শূন্যতার ঝুঁকি এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আইনগত শূন্যতা তৈরি হতে পারে— গুম প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামো দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সংস্কার রাজস্ব ও করনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, “একই সঙ্গে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল হওয়া প্রশাসনিক ও আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।” ভিন্নমত ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বিশেষ কমিটির রিপোর্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘নোট অব ডিসেন্ট’। জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য ১২টি অধ্যাদেশের বিরোধিতা করেছেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নিয়ে তাদের আপত্তি— অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের সঙ্গে অসঙ্গতি এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আইন প্রণয়নের এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিভাজন গভীর হচ্ছে। ১৩৩ অধ্যাদেশের বড় চিত্র অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে— ৯৮টি সরাসরি পাসের সুপারিশ ১৫টি সংশোধন করে বিল আনার প্রস্তাব ৪টি বাতিলের জন্য বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ অর্থাৎ, পুরো আইন কাঠামোই এখন পুনর্মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাতিলের তালিকায় থাকা অধ্যাদেশ বাতিল হতে যাওয়া ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে—গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬। মূল প্রশ্নগুলো এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— কেন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সময়মতো সংসদে তোলা হলো না? সরকারের ভেতরে কি নীতিগত দ্বন্দ্ব রয়েছে? আইনগত শূন্যতা তৈরি হলে দায় কে নেবে? নতুন বিল কবে নাগাদ আসবে? সামনে কী? ১২ এপ্রিলের পর যদি অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যায়, তবে— সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নতুন করে বিল আনতে হবে পুরো আইন প্রক্রিয়া আবার শুরু হবে এতে সময়, প্রশাসনিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়বে এই পরিস্থিতি শুধু আইন নয়, দেশের শাসন কাঠামোর ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ঈদের দিন সন্তানকে কাঁধে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হওয়া এক তরুণকে আটক করার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তার ২১ মাস বয়সী শিশুকে পরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—যার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিখোঁজ ওই তরুণের নাম ওসামা আবু নাসের (২৫)। তার শিশুপুত্র জাওয়াদ আবু নাসারকে গত ১৯ মার্চ গাজার কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে বাবার সঙ্গে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের বাড়ি, জীবিকা ও নিরাপত্তা হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন ওসামা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিনি সকাল ১০টার দিকে শিশুকে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হন। ওসামার বাবা মুহাম্মদ হুসনি আবু নাসার জানান, প্রতিবেশীরা ফোন করে তাকে জানান, তার ছেলে শিশুকে কাঁধে নিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে—যেখানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। গাজার মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক সীমারেখা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই এলাকায় পৌঁছানোর পর ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি গুলি না চালিয়ে তার আশেপাশে গুলি ছোড়ে। এতে বিভ্রান্ত হলেও ওসামা থামেননি। পরে একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন তার কাছে এসে ভেসে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরপর তাকে শিশুকে নামিয়ে রেখে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং কাপড় খুলে ফেলতে বলা হয়। ওসামার বাবা বলেন, “সে শুধু অন্তর্বাস পরে ছিল এবং শান্ত ছিল, কোনো আক্রমণাত্মক আচরণ করেনি।” ওসামা আটক হওয়ার পর তার বাবা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিতে থাকেন এবং আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নিজের যোগাযোগ নম্বর দিয়ে আসেন। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়, তার নাতিকে তারা পেয়েছে। পরে মাঘাজি বাজার এলাকায় আইসিআরসি কর্মকর্তারা শিশুটিকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। শিশুটিকে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় ফেরত দেওয়া হয়। কম্বল খুলে তার প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। আইসিআরসি জানায়, তারা শিশুটিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে শিশুটির শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। পরিবারের দাবি, বাড়িতে আনার পর শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাঁটুর চারপাশে পোড়া দাগ এবং ধারালো বস্তু দিয়ে করা গভীর ক্ষত ছিল। শিশুটি সারারাত ব্যথা ও আতঙ্কে কেঁদেছে এবং ঘুমাতে পারেনি। পরদিন হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, এসব আঘাত গোলাবারুদের কারণে নয়—বরং নির্যাতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির হাঁটু ফুলে গেছে এবং সেখানে সিগারেটের দাগের মতো ক্ষত রয়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হামাসের প্রচারণার অংশ। এদিকে, আটক হওয়ার পর থেকে ওসামা আবু নাসারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার তুর্ক দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় ‘যত দ্রুত সম্ভব’ তদন্ত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ওই হামলায় ১১০ জন শিশুসহ ১৬৮ জন নিহত হন। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির সামরিক তদন্তকারীরা মনে করছেন, মার্কিন বাহিনী সম্ভবত অনিচ্ছাকৃতভাবে স্কুলটিতে আঘাত হেনে থাকতে পারে। তবে তারা এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে সংঘাতকালীন শিশুদের সুরক্ষা বিষয়ক আলোচনায় তুর্ক বলেন, যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের ওপরই দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জবাবদিহিতার নিশ্চিতের দায়িত্ব বর্তায়। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পৃথকভাবে জানিয়েছে, যে তারা ঘটনাটি তদন্ত করছে। যদিও, ওই স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রই প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল বলে খোদ দেশটির সামরিক বাহিনীর চলমান তদন্তে উঠে এসেছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যারা এ হামলা চালিয়েছে, তাদের ওপরই দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দায়িত্ব বর্তায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তুর্ক বলেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আমি চাই যত দ্রুত সম্ভব এ তদন্ত শেষ হোক এবং এর ফলাফল প্রকাশ করা হোক। যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে, তার বিচার হতে হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানে ৩ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এ সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার ফলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।