* পিআইবিতে ‘অদৃশ্য সেমিনার’: নথিতে খরচ, বাস্তবে অনুষ্ঠান নেই—ফারুক ওয়াসিফকে ঘিরে বিতর্ক * পিআইবিতে সেমিনার না হয়েও লাখ লাখ টাকা খরচ? ফারুক ওয়াসিফকে ঘিরে নথিপত্রে নতুন প্রশ্ন * পিআইবিতে সেমিনার জালিয়াতির অভিযোগ: ফারুক ওয়াসিফের দাবি বনাম এনবিআরের নথি — অনুসন্ধানে নতুন প্রশ্ন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)–এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফকে ঘিরে নতুন করে দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পিআইবিতে যে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়নি—তার জন্য ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। আরও পড়ুন: পিআইবিতে অবসরপ্রাপ্তদের হয়রানির অভিযোগ: ডিজি ফারুক ওয়াসিফ'র অপসারন দাবী পিআইবি মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের লুটপাট , দুই দিনে ২৪ লাখ টাকার অনিয়ম পিআইবিতে ভুয়া সেমিনারের নামে লাখো টাকা আত্মসাৎ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য ফারুক ওয়াসিফ, পিআইবি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি: নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য উদঘাটন জরুরি অন্যদিকে ফারুক ওয়াসিফ এই অভিযোগকে “মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করেছেন। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর উৎস কর সংক্রান্ত নথি ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। এই প্রতিবেদনে সেই অভিযোগ, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অভিযোগের সূত্রপাত দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি পিআইবিতে কোনো সেমিনার হয়নি, অথচ ওই সেমিনারের নামে বিপুল অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়— ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন খাতে খরচ দেখানো হয়েছে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ তোলা হয়েছে অভিযোগ অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে পিআইবির কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। অভিযোগ উঠেছে— ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমন কিছু সেমিনারের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে, যেগুলো বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয়নি। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি অবশ্য অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উৎস কর স্লিপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। এই প্রতিবেদনে সেই নথি, তথ্য ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কী ঘটেছে: ঘটনাপ্রবাহ ডাটা টাইমলাইন বছর ঘটনা ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পিআইবিতে সেমিনার হয়েছে বলে নথি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দ্বিতীয় সেমিনারের খরচ দেখানো অক্টোবর ২০২৫ ভ্যাট ও ট্যাক্স জমা ৫ মার্চ ২০২৬ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ ৯ মার্চ ২০২৬ পিআইবির প্রতিবাদপত্র ডকুমেন্ট বক্স অনুসন্ধানে পাওয়া মূল নথি 📄 মোট উৎস কর স্লিপ: ৫৩টি 💰 উৎস কর জমা: ২,৮২,৬০০ টাকা 📅 উল্লেখিত অনুষ্ঠান: ১৮–১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সেমিনার ✍ জমাদানকারী: পিআইবির কর্মকর্তা এই স্লিপগুলোতে সেমিনারের বিভিন্ন খরচের উল্লেখ রয়েছে। ফারুক ওয়াসিফের বক্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফারুক ওয়াসিফ বলেন: “ওই দুই দিনে কোনো সেমিনার হয়নি। তাই সেমিনারের নামে টাকা তোলার প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও দাবি করেন— প্রকাশিত নথি জাল একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। অনুসন্ধানে নতুন তথ্য তবে অনুসন্ধানী টিমের দাবি, এনবিআরের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তদন্তে পাওয়া যায় মোট ৫৩টি “অর্থ জমা নগদ স্লিপ”। এসব স্লিপে উল্লেখ রয়েছে— সেমিনারের দাওয়াত কার্ড খাবার নাশতা স্টেশনারি গাড়িভাড়া রিসোর্স পারসন সম্মানি এই সব খাতের বিপরীতে উৎস কর জমা দেওয়া হয়েছে। সব স্লিপে পিআইবির সিনিয়র রিসার্চ অফিসার গোলাম মুর্শেদ-এর স্বাক্ষর রয়েছে। মোট উৎস কর জমা হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০০ টাকা। নথিতে কী পাওয়া গেছে তবে অনুসন্ধানে পাওয়া উৎস কর স্লিপে উল্লেখ রয়েছে— সেমিনার খরচের খাত খাত টাকা খাবার ৭৫,০০০ দাওয়াত কার্ড ৩,০০০ স্টেশনারি ৯,০০০ ডেকোরেশন ৬,১০০ সাউন্ড সিস্টেম ৮,৩০০ নাশতা ২,৫০০ গাড়িভাড়া ১,২০০ ডাটা গ্রাফিক সেমিনার খরচ (নথি অনুযায়ী) খাবার ██████████████████████ স্টেশনারি ███████ ডেকোরেশন █████ সাউন্ড সিস্টেম ██████ নাশতা ██ গাড়িভাড়া █ সব মিলিয়ে দুই দিনের অনুষ্ঠানের বিপরীতে উৎস কর জমা দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকার বেশি। রিসোর্স পারসন সম্মানি নথি অনুযায়ী— পাঁচজন বক্তা প্রত্যেকে ১০ হাজার টাকা মোট সম্মানি: ৫০,০০০ টাকা কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাদের নাম বক্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের কয়েকজনই বলেছেন তারা এ ধরনের কোনো সেমিনারে অংশ নেননি। খাবারের বিল নিয়ে প্রশ্ন একটি ভাউচারে উল্লেখ রয়েছে— ১৫০ জনের খাবার প্রতি প্লেট ৫০০ টাকা মোট বিল: ৭৫ হাজার টাকা কিন্তু সংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ এই বিলের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ২৪ লাখ টাকার ব্যয় এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরেকটি বিতর্ক হলো ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব। ফারুক ওয়াসিফের দাবি— এই অর্থের বড় অংশ একটি তথ্যচিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে। প্রোডাকশন কোম্পানির বক্তব্য তথ্যচিত্রটি তৈরি করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির দাবি— তাদের বিল ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা ভ্যাট ও ট্যাক্স কেটে ১৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে ক্যাশে ডকুমেন্ট বক্স লেনদেনের গরমিল নথিতে দেখা যায়— 📅 ইনভয়েস তারিখ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ 🎬 তথ্যচিত্র প্রিমিয়ার: আগস্ট ২০২৫ 💰 পেমেন্ট দাবি: আগস্ট ২০২৫ এই তারিখগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনলাইনে চালান যাচাই সরকারি ওয়েবসাইটে চালান ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে এসব নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। একটি উদাহরণ হিসেবে: ট্র্যাকিং নম্বর: ২৫২৬-০০০৯৪৮৪০৫৯ খাত: ১৮ ফেব্রুয়ারি সেমিনারের খাবার উৎস কর: ৬,২৫০ টাকা ওয়েবসাইটে যাচাই করে এই চালানের তথ্য মিলেছে। এতে জমাদানকারী হিসেবে পিআইবির পক্ষ থেকে গোলাম মুর্শেদের নাম উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে অন্যান্য চালানও যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঢাকার এক আয়কর আইনজীবী নথি যাচাই করে বলেছেন,অনলাইন ভেরিফিকেশন অনুযায়ী এসব চালান সঠিক। অর্থাৎ এগুলো সরকারি সিস্টেমে নিবন্ধিত। ভুয়া ভাউচার অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁর নামে ১৫০ জনের দুপুরের খাবারের বিল দেখানো হয়। প্রতি প্লেট ৫০০ টাকা মোট বিল: ৭৫,০০০ টাকা তবে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ এই বিলের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। সরকারি নিয়ম কী বলে সরকারি কর্মকর্তাদের মতে— সরকারি কাজের পেমেন্ট সাধারণত হয়: ব্যাংক ট্রান্সফার চেক সরকারি অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম ক্যাশে পেমেন্ট দেওয়া নিয়মবহির্ভূত হতে পারে। টেন্ডার ছাড়াই কাজ? অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে— এই প্রকল্পে কোনো টেন্ডার হয়নি কোনো ওয়ার্ক অর্ডার নেই কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই যা সরকারি ক্রয় বিধির প্রশ্ন তুলছে। ব্যাকডেটিংয়ের অভিযোগ নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়— চেক ইস্যুর তারিখ ফেব্রুয়ারি টাকা তোলা হয়েছে জুনে এ ধরনের প্রক্রিয়াকে সাধারণত ব্যাকডেটিং বলা হয়। পুরনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার তদন্তে আরও জানা গেছে— টাকা উত্তোলনের জন্য এমন একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে— যা প্রায় ১০ বছর ধরে ব্যবহার হয়নি। প্রকৃত খরচ কত? অভিযোগকারীদের দাবি— অনুষ্ঠানের প্রকৃত খরচ ছিল প্রায় ৭–৮ লাখ টাকা। কিন্তু নথিতে দেখানো হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। বোর্ড মিটিং ও অডিট ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন— বোর্ড মিটিংয়ে চারজন যুগ্ম সচিব আরও কয়েকজন সদস্য সব নথি পরীক্ষা করেছেন। তার দাবি— “অডিটের পর অনিয়ম থাকার সুযোগ নেই।” এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর নেই এই ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রধান প্রশ্ন ১️,সেমিনার না হলে উৎস কর কেন দেওয়া হলো? ২️.ভুয়া বিল তৈরি করেছে কারা? ৩️.২৪ লাখ টাকার প্রকৃত ব্যয় কত? ৪️.ক্যাশ পেমেন্ট কেন করা হলো? ৫️.সরকারি নথিতে ব্যাকডেটিং হয়েছে কি? বিশ্লেষণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাংবাদিক প্রশিক্ষণের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ উঠলে তা শুধু প্রশাসনিক নয়—নৈতিক প্রশ্নও তৈরি করে। পিআইবি দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ ও পাল্টা দাবির মধ্যেই এখন প্রশ্ন— এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে কি?
মামুনুর রশীদ নোমানী: বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্নীতির আরেকটি আলোচিত ঘটনায় পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দীন মহারাজ, তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম এবং ছেলে শাম্মাম জুনাইদ ইফতির বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের অভিযোগে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এসব মামলা করা হয়। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে—দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময়ে মহিউদ্দীন মহারাজ ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে, যার বড় অংশেরই বৈধ আয়ের উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনায় প্রায় ৫১ কোটি টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আরও পড়ুন: * ৩০০ কোটির অবৈধ সম্পদ: সাবেক এমপি মহারাজ ও পরিবারের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দুদকের * কাগজে ১২৮ সেতু, বাস্তবে নেই একটিও! মহিউদ্দীন মহারাজ পরিবারের ২৩৬ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ * পিরোজপুর এলজিইডিতে ১,৬৪৭ কোটি টাকার দুর্নীতিও ‘লুটতরাজ’, নেপথ্যে হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল সিন্ডিকেট * এলজিইডির শতকোটি টাকার হিসাবরক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম এখনও বহাল তবিয়তে ১২ বছরে সম্পদের পাহাড় মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মহিউদ্দীন মহারাজ নিজের নামে ১২২টি দলিলে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, মার্কেট ও দোকান ক্রয় করেছেন। দুদকের হিসাব অনুযায়ী এসব স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ২৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া তার নামে রয়েছে— বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের সঞ্চয় ব্যবসায় বিনিয়োগ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার দুটি বিলাসবহুল গাড়ি এসব অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে তার পরিবারের ব্যয় হিসাব করা হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ফলে মোট সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আয়ের উৎস মাত্র ৩ কোটি টাকা দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই বিশাল সম্পদের বিপরীতে মহিউদ্দীন মহারাজের গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ফলে প্রায় ৫১ কোটি ২৭ লাখ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই অর্থের বড় অংশ অবৈধভাবে অর্জিত এবং পরে বিভিন্ন ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে এর উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যাংক লেনদেনেই সন্দেহ দুদকের তথ্য অনুযায়ী, মহিউদ্দীন মহারাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোতে বিপুল অঙ্কের লেনদেন পাওয়া গেছে। তদন্তে উঠে এসেছে— প্রায় ৫৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা জমা বিভিন্ন ব্যাংক শাখার মাধ্যমে প্রায় ৫৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা স্থানান্তর এই অর্থের বড় অংশ বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছে দুদক। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের লেনদেন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধ। স্ত্রী উম্মে কুলসুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ মহিউদ্দীন মহারাজের স্ত্রী উম্মে কুলসুমের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করেছে দুদক। মামলার এজাহার অনুযায়ী, তার নামে রয়েছে— জমি, ফ্ল্যাট ও দোকানসহ প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ ব্যাংক সঞ্চয় ও ব্যবসায় বিনিয়োগসহ প্রায় ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ সব মিলিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। পারিবারিক ব্যয়সহ মোট হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। কিন্তু তার বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ২ কোটি ৬ লাখ টাকা। ফলে প্রায় ৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দুদক বলছে, গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তার নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। শিক্ষার্থী ছেলের নামেও সম্পদ মহিউদ্দীন মহারাজের ছেলে শাম্মাম জুনাইদ ইফতির বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ইফতির নামে রয়েছে— জমি ও দোকানসহ প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ ব্যাংক সঞ্চয় ও বিনিয়োগসহ প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ পারিবারিক ব্যয়সহ তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কিন্তু তার বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ফলে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দুদকের দাবি, ইফতি একজন শিক্ষার্থী হওয়ায় তার নিজস্ব আয়ের উৎস থাকার কথা নয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, মহিউদ্দীন মহারাজের অবৈধ উপার্জনের অর্থ তার ছেলের নামে দেখিয়ে বৈধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ দুদক জানিয়েছে, পিরোজপুরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের নির্দেশে মহিউদ্দীন মহারাজ ও তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদ ইতোমধ্যে ক্রোক (জব্দ) করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যাতে তদন্ত চলাকালে সম্পদ বিক্রি বা স্থানান্তর করা না যায়। এলজিইডি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অভিযোগ দুদক সূত্র জানিয়েছে, মহিউদ্দীন মহারাজের বিরুদ্ধে এর আগেও বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারে অংশ নিয়ে কাজ না করেই প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আরও আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত বর্তমানে চলমান রয়েছে। মহিউদ্দীন মহারাজ পিরোজপুর অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগেও আলোচনায় ছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিষয়ে এখনো তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও মানিলন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত হলে রাজনৈতিক দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তারা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, এসব মামলার স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামনে কী হতে পারে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাগুলোর তদন্ত শেষ হলে দুদক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করবে। এরপর আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে মানিলন্ডারিং ও দুর্নীতি আইনের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সেগুনবাগিচা ই/এম বিভাগ-২ এর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার-এর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার সেগুনবাগিচা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-২ এ উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একই সঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন এবং বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর -এর বৈদ্যুতিক দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন। সূত্র মতে, যেখানে বড় প্রকল্প সেখানে উপস্থিত ছিলেন এই প্রকৌশলী। গণপূর্তের হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ নিয়ে তিনি নিজের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন না পেলে তিনি কোনো ফাইলে সই করতেন না। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আবুল বাশার বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মো. আলী হোসেন হাওলাদারের ছেলে। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ধানমন্ডি ৩২ -এর বৈদ্যুতিক দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিজ এলাকায় অন্যের জমি দখল এবং অবৈধভাবে ইটভাটা নির্মাণ করেছেন। এ ঘটনায় কবাই ইউনিয়নের কুদ্দুস মিয়া বাদী হয়ে গত ১২ মার্চ বরিশাল স্পেশাল জজ আদালতে আবুল বাশারসহ চারজনকে বিবাদী করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে জি.আর ২৯৬/২৪ (বাকেরগঞ্জ) মামলার ৩ নম্বর আসামি এবং জি.আর ২৬/২৩ (বাকেরগঞ্জ) মামলার ২ নম্বর আসামি হিসেবে নাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তার বাবার নামে বাকেরগঞ্জের হালুয়া গ্রামে অবৈধভাবে একটি ইটভাটা চালু করেন, যা বর্তমানে এ. এইচ ব্রিকস নামে পরিচিত। এছাড়াও ঢাকায় তার নামে ৫ তলা ভবন, বিভিন্ন প্লট, নিউ মার্কেটে সোনার দোকানসহ নানা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি স্থানীয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ -এর রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন মিছিল-মিটিং ও জনসভায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এলাকায় গিয়ে তিনি নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল হাফিজ মল্লিক-এর পক্ষে কাজ করেছেন এবং ভোটে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল -এর বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল বাশার সাংবাদিকদের বলেন, “এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক। চাকরি জীবনে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সেই সরকারের নির্দেশনা মেনেই আমি দায়িত্ব পালন করেছি।”
ময়মনসিংহে সরকারি চাকরিজীবী এক ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযুক্ত রইছ উদ্দিন শ্যামল ওরফে বাবু এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী হাসিনা খাতুনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত শেষে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পিয়ন থেকে বহুতল ভবনের মালিক ২০০৪ সালে একটি সরকারি বিদ্যালয়ে পিয়ন পদে চাকরিতে যোগ দেন রইছ উদ্দিন শ্যামল। পরবর্তীতে তিনি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল-এ হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি বদলি হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ময়মনসিংহ অঞ্চলে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি নগরীর গোহাইলকান্দি এলাকায় তিন শতাংশ জমির ওপর প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেন, যা তাঁর প্রথম স্ত্রী হাসিনা খাতুনের নামে। এ ছাড়া বাদেকল্পা এলাকায় ছয় শতাংশ জমির ওপর সাততলা ভবনের তৃতীয় তলায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। একই এলাকায় ১৩ শতাংশ জমিতে রয়েছে আরেকটি একতলা বাড়ি এবং আরও দুটি প্লটের মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে। সম্পদ বিবরণীতে অসঙ্গতি দুদকের মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হাসিনা খাতুন সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। যাচাই শেষে ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি দুদক মামলা দায়েরের অনুমোদন দেয়। তদন্তে উঠে এসেছে— ৪৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ২ কোটি ২ লাখ ১৫ হাজার ৮৩৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের উল্লেখযোগ্য গরমিল হাসিনা খাতুন নিজেকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করলেও তাঁর নামে আয়কর নথি খুলে ব্যবসা ও অন্যান্য আয়ের তথ্য প্রদর্শন করা হয়, যার বাস্তব অস্তিত্ব তদন্তে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ: দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ বৈধকরণ দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বামীর ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বৈধ করার উদ্দেশ্যে স্ত্রীর নামে সম্পদ ও আয় প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন রইছ উদ্দিন শ্যামল। ময়মনসিংহ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক রনজিৎ কুমার কর্মকার জানান, দুদকের উপপরিচালক শাহাদাত হোসেন চার্জশিট কমিশনে দাখিল করেছেন। অনুমোদন পেলেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হবে। স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া স্থানীয়দের দাবি, চাকরিতে যোগদানের আগে ভাড়া বাসায় কষ্টে জীবনযাপন করলেও কয়েক বছরের মধ্যে কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠেন শ্যামল। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, “একজন কর্মচারী এত সম্পদের মালিক হলে তার পেছনে অফিস সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা উচিত।” এদিকে অভিযুক্ত রইছ উদ্দিন শ্যামল বলেন, “আমি কী অপরাধ করেছি, সেটা বলতে বাধ্য নই। যা বলার দুদককে বলেছি। অন্যায় করলে শাস্তি হবে, তা মেনেই নিয়েছি।” তদন্তের পরবর্তী ধাপ দুদক সূত্র জানিয়েছে, কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। মাউশির উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, “যেহেতু বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ অর্জনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দুদকের এ পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।