তদন্ত চলাকালেই ১৮ দিনে ফেরা সেই শাজাহান ঘুসের রাজা,বদলী ঠেকাতে শাহজাহান আলীকে মাসে শহিদুল ঘুস দেন ২০ লাখ টাকা,স্কিন শর্ট ফাঁস,১৪৪ টি টেন্ডারের পে অর্ডার সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যাংক থেকে নগদায়ন করে লুট করলেন শহিদুল ।শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) কর্মকর্তাদের পদায়ন, ঠিকাদারি কাজ বণ্টন এবং সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহজাহান আলী এবং বরিশালে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম। ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহজাহান আলীকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনিয়মের অভিযোগের পর গত ২৩ জুলাই তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হলেও মাত্র ১৮ দিনের মাথায় ফের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পেয়েই শাজাহান আলী বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতাদের নিয়ে দেশজুড়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন।আর সেই সিন্ডিকেটের অন্যতম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নির্বাহী সদস্য শহিদুল ইসলাম। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাজাহান আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শহিদুলদের নিয়ে সরকার বিরোধী কর্মকান্ড ও সরকারের সুনাম নষ্টের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।তারা এখনো ফ্যাসিস্ট কার্য্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী ও ছাত্রলীগ নেতাদের ঠিকাদারি কাজ দিচ্ছেন। ফলে ক্ষোভ বাড়ছে বিএনপি নেতাদের মাঝে। এদিকে শাজাহান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে একটি তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকার তথ্যও সামনে এসেছে। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে একই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন-৩ শাখা থেকে ২৩ জুলাই শাহজাহান আলীকে ওএসডি করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আলী ইমামকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়েছিল। এরপর ১২ আগস্ট উন্নয়ন-৩ শাখা থেকে জারি করা আরেক প্রজ্ঞাপনে শাহজাহান আলীকে আবারও প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে বহাল করা হয়। প্রজ্ঞাপনটিতে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহান। সরকারি ওয়েবসাইটের কর্মকর্তা তালিকাতেও মো. শাহজাহান আলীর নাম তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে রয়েছে। কে এই শাহজাহান আলী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শাহজাহান আলী । সাম্প্রতিক সময়ে তার দুর্নীতি,অনিয়ম, পদোন্নতি, ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হওয়া এবং পুনরায় বহাল থাকার ঘটনা নিয়ে বেশ আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে । মো. শাহজাহান আলী বর্তমানে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। পদোন্নতির ইতিহাস: ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান এবং প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ শাখায় চলতি দায়িত্ব পান । আরও পড়ুন: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে দুর্নীতির অদৃশ্য সম্রাট শাহজাহান আলী ওএসডি ও বিতর্ক: অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে এবং তার স্থলে মো. আলী ইমামকে দায়িত্ব দেওয়া হয় । পুনরায় বহাল: ওএসডি হওয়ার মাত্র ১৮ দিন পর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে পুনরায় প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে বহাল করা হয় । আলোচনা-সমালোচনা: তার বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ওএসডি হওয়ার অল্প দিনের মধ্যে স্বপদে ফিরে আসায় অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। কে এই শহিদুল ইসলাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শহিদুল ইসলাম। অভিযোগ ও বিতর্ক: সম্প্রতি মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, ঘুষ, টেন্ডারবাজি, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং ঠিকাদারদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। আরও পড়ুন: বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল যখন ঠিকাদার: ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ ঠিকাদারদের অভিযোগ: তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট হারে কমিশন না দিলে কাজ শেষ হলেও বিল পরিশোধ না করার অভিযোগ এনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঠিকাদাররা। এছাড়া নিজ দপ্তরে বসে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ ও সাব-কন্টাক্টে কাজ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। দুদক ও আন্দোলন: তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত এবং তাঁকে প্রত্যাহারের দাবিতে স্থানীয় ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষ মানববন্ধন ও দুদকে অভিযোগ দায়ের করেছেন। শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১৪৪টি টেন্ডারের পে-অর্ডার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৪৪টি টেন্ডারের পে-অর্ডার নিয়ে অভিযোগটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব পে-অর্ডার সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যাংক থেকে নগদায়ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন— ১৪৪টি টেন্ডারের তালিকা, দরপত্র নম্বর ও সংশ্লিষ্ট নথি; পে-অর্ডার ইস্যু, জমা ও নগদায়নের ব্যাংক রেকর্ড; সরকারি কোষাগার ও সংশ্লিষ্ট হিসাবের বিবরণী; অর্থ জমা ও ফেরতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন; বিভাগীয় তদন্ত বা নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ফলাফল। মাসে ২০ লাখ টাকা ঘুষের দাবি শাহজাহান আলীর পদায়ন ও পুনর্বহাল ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের দাবি, বদলি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে অর্থ দেওয়া হয়। অভিযোগে শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে মাসে ২০ লাখ টাকা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন শাহজাহান আলীকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে। প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব বহুতল ভবনের কয়েকটিতে উদ্বোধনের আগেই দেয়ালে ফাটল, জানালার লিন্টেল বাঁকা হওয়া এবং ছাদ নির্মাণে ত্রুটির অভিযোগ সামনে আসে।এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন শাহজাহান আলী। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির বিরুদ্ধে ১৪টি অডিট আপত্তিতে প্রায় ৩৪ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে নির্মিত ভবনে ফাটল এবং আইসিটি ও বিজ্ঞানাগারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কমিটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই শাহজাহান আলীকে ফের দায়িত্বে বসানো হয়েছে—এমন অভিযোগই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ‘অদৃশ্য কারণে’ ১৮ দিনের মাথায় ফেরত? শাহজাহান আলীকে ওএসডি করার পর মাত্র ১৮ দিনের মাথায় তাকে পুনরায় একই অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে।তবে তাকে কেন এত দ্রুত পুনর্বহাল করা হলো—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাকে একই প্রকল্প বা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত? ‘সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ শাহজাহান আলীকে কেন্দ্র করে ইইডিতে একটি প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় থাকার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের দাবি, উপসহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জোয়ারদার, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ শিমুল আকন্দ এবং বরিশালে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামকে নিয়ে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, মনিরুজ্জামান জোয়ার ও আবু সাঈদ শিমুল আকন্দকে সম্প্রতি যথাক্রমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরে বদলি করা হলেও তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তারা বদলির আদেশ কার্যকর করছেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বদলির আদেশ, মেডিকেল সনদ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদনসহ নথিপত্র যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ঘুষের অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শাহজাহান আলীকে মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি এমন কোনো আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে তার উৎস, লেনদেনের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা হবে কি না। শাহজাহান আলীর বক্তব্য অভিযোগ ও পুনর্বহাল প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহজাহান আলী বলেন, “এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকার ওএসডি করেছিল। আবার সরকারই বহাল করেছে। আমি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যেভাবে দায়িত্ব এসেছে, সেভাবেই পালন করছি।” অর্থাৎ পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে তিনি সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছেন। জবাবদিহি নিশ্চিত করবে তদন্ত শাহজাহান আলীর ওএসডি, ১৮ দিনের মধ্যে পুনর্বহাল, ৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে অভিযোগ এবং শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পে-অর্ডার ও কমিশনসংক্রান্ত অভিযোগ—সব মিলিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন— ১. শাহজাহান আলীকে ওএসডি ও পুনর্বহালের প্রশাসনিক কারণ প্রকাশ করা। ২. কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের প্রকল্পের অডিট আপত্তি ও নির্মাণমানসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি জানানো। ৩. ১৪৪টি টেন্ডারের পে-অর্ডারসংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা করা। ৪. ঘুষ ও কমিশনসংক্রান্ত অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকলে তা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা। ৫. সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্পের অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে আসে। এসব প্রকল্পের নির্মাণমান, দরপত্রের স্বচ্ছতা এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহি সরাসরি জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। অতএব, অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় হিসেবে উপেক্ষা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও দায়মুক্তির সুযোগ দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু একজন কর্মকর্তার ওএসডি বা পুনর্বহাল নয়—সরকারি অর্থের সুরক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণে জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন শাহজাহান আলীকে ঘিরে অভিযোগ, ওএসডি, মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে পুনর্বহাল এবং তদন্ত—সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন— তদন্ত চলাকালে কেন তাকে একই দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে দেওয়া হলো? ৪৩০ কোটি টাকার প্রকল্পে ওঠা লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কি না? তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই হবে কি? অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২৩ জুলাই ওএসডি, ১২ আগস্ট পুনর্বহাল—মাত্র ১৮ দিনের এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের নেপথ্যে সরকারি ব্যাখ্যাটি কী? শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার সরকারি অর্থ, নির্মাণের মান এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই অভিযোগগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত এবং তদন্তের ফল জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তদন্তেই এখন নির্ধারিত হতে পারে—অভিযোগগুলো কতটা সত্য, আর কতটা কেবল অভিযোগ।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। লটারির মাধ্যমে পদায়নের নামে ক্যাটাগরি নির্ধারণে অনিয়ম, গ্রেডিং শিটে কারসাজি, আগে থেকে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পাঠানো এবং প্রায় ১২০ কোটি টাকার কথিত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযোগকারী। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগসহ রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগ। এসব বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের বাসভবন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের মতো দায়িত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলী রেজা তৈমুর মালিক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৫ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনে তাঁর পদায়ন করা হয় বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পদায়নকে ঘিরে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব বণ্টনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে লটারির ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও গ্রেডিং শিট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে। লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ‘এ প্লাস’, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়নি বলে তাঁদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তাদের নাম একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে রেখে লটারির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য আগে থেকেই কয়েকজন কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, রেজা তৈমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও পদায়নপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টন করা হয়ে থাকতে পারে। গ্রেডিং শিটে কারসাজির অভিযোগ লটারির আগে গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাজহার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগে বলা হয়েছে, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ পদায়নে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিজে থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ নয়; এ ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত নথিই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁর পদায়নের যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। রেজা তৈমুর মালিকের পদায়ন ঘিরে বিতর্ক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নকে কেন্দ্র করে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় ও আগের কর্মস্থল নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, রেজা তৈমুর মালিকের বাবা মো. রেজাউল হক মালিক, যিনি মুকুল নামে পরিচিত ছিলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মারা যান। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বাজারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রেজাউল হক মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিচিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রেজাউল হক মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাবে ছেলে রেজা তৈমুর মালিকের চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে আকর্ষণীয় কর্মস্থলে পদায়নেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, রেজা তৈমুর মালিক নিম্নমানের একটি কোম্পানিকে পিডব্লিউডি সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নাম, সিডিউল অন্তর্ভুক্তির নথি, আর্থিক লেনদেনের দলিল কিংবা নিরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাঁর বর্তমান পদায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই, প্রশাসনিক বিধি এবং পেশাগত যোগ্যতা যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। আগের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন সরবরাহ করা তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান, সুব্রত বিশ্বাস এবং রেজা তৈমুর মালিকের বিরুদ্ধে। তাঁদের কয়েকজনের ছবি ফেসবুকে প্রকাশ এবং অন্য কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তাদের আবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের চাকরির রেকর্ড, আগের পদায়ন, কর্মদক্ষতা এবং বর্তমান দায়িত্বের জন্য প্রশাসনিক যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোশ ওজাকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পদায়ন করা হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বদলি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা এ ঘটনাকে সামনে রেখে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নও পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ মাসুম বিল্লাহর পদায়ন সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়নের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন এবং সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় কাজে লাগিয়ে নগর গণপূর্ত বিভাগে প্রথম পদায়ন বাগিয়ে নেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নিয়োগের নথি, কোটার বৈধতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল সরবরাহ করা হয়নি। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর দায়িত্বের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণকাজ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর-সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্ব নিয়েও এ বিভাগের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এত গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড এবং প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। ডিসেম্বরকে ঘিরে পরিকল্পনার অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এই বদলি ও পদায়নের মধ্যে সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই ও দুদকের সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীরা ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অর্থায়ন, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২: কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধেও কমিশন ও দরপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী, যিনি টিপু মুন্সি নামে পরিচিত, তাঁর ভায়রা। টিপু মুন্সির সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন পেয়েছেন এবং এ জন্য ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এ অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আবু নাসের চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি করা হয়। ই-জিপি দরপত্রে পাঁচ শতাংশ কমিশন না দিলে টেকনিক্যাল অনুমোদন দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এর কয়েকটি দরপত্রের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য এবং আবু নাসের চৌধুরীর ই-জিপি আইডিতে আটকে থাকা দরপত্রের কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, দরপত্রের মূল্যায়ন এবং প্রত্যাখ্যানের কারণ যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। বগুড়ায় দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তনের অভিযোগ আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) কাজ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথডে (ওটিএম) আহ্বানের অনুমতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের কাজ এবং এপিপিভুক্ত কয়েকটি দরপত্রের ক্ষেত্রে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে তিনি ১০ শতাংশ কমিশন নিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত অভিযোগে যেসব দরপত্র আইডি উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: ১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ এবং ১০১৮১৫৯। এসব দরপত্রে পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদানের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তন বা একাধিক দরপত্র আইডি উল্লেখ করাই কমিশন গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ করে না। রাজিবুল ইসলাম ও রাশেদ আহসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন অভিযোগে রাজিবুল ইসলামের পদায়নের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং পরে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়নে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালা, আগের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ, পদায়নের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতার নথি পর্যালোচনা জরুরি। লটারিতে বৈষম্য ও ১২০ কোটি টাকার অভিযোগ লটারির আওতায় কোন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কারা বাদ পড়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে না রাখার অভিযোগ রয়েছে। একই পর্যায়ের অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। এদিকে, লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের সিন্ডিকেট প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁদের নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের উৎসও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সুশাসন বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং মন্ত্রীদের বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা সরকার ও প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া এবং পদায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থাকলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তদন্তে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন: ১. নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করার লিখিত নীতিমালা ও অনুমোদনপত্র। ২. গ্রেডিং শিট, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং কর্মকর্তাদের এসিআর ও পেশাগত যোগ্যতার মূল্যায়ন। ৩. লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স, নামের তালিকা, লটারির ভিডিও বা কার্যবিবরণী এবং চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ। ৪. ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে পদায়নের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদন এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি। ৫. অভিযোগে উল্লেখ করা ই-জিপি দরপত্রের মূল্যায়ন, টেকনিক্যাল অনুমোদন, প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং প্রাক্কলন ও ভেরিয়েশন অনুমোদনের রেকর্ড। ৬. কথিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং অর্থের উৎস। ৭. নিয়োগ, বিশেষ বিসিএস, মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী পদায়নের বৈধতা-সংক্রান্ত নথি। জবাবদিহি ও নিরাপত্তা—দুই প্রশ্নেই স্বচ্ছতা জরুরি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ শুধু প্রকৌশলগত দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক জবাবদিহি, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িত। তাই পদায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা অতীতের কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিযোগকে এককভাবে অনিয়ম বা নিরাপত্তাঝুঁকির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রামাণ্য নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। রেজা তৈমুর মালিকসহ যেসব কর্মকর্তার পদায়ন, গ্রেডিং বা দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বদলি-বাণিজ্য বন্ধ করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়নে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ ঘিরেই এখন উঠেছে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। গুরুত্বপূর্ণ পদে কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তার পুনরায় পদায়ন এবং একই ধরনের সুবিধাজনক পদে ফিরে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে—লটারির প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ ছিল? অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির আড়ালে প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা—যাঁদের নাম সারোয়ার—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট নথি কিংবা আর্থিক লেনদেনের যাচাই ছাড়া অনিয়মের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের উপস্থিতিতে সম্প্রতি ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী, ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক্যাল), ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী এবং ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীসহ মোট ১ হাজার ৪৩০ জন প্রকৌশলীর বদলি ও পদায়নের তথ্য প্রকাশ করা হয়। এত বড় পরিসরে লটারিভিত্তিক পদায়নের উদ্যোগকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে এখন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘দুই সারোয়ারের’ ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নের লটারি শেষ হওয়ার পর থেকেই প্রক্রিয়াটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তাঁদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের একজন সারোয়ার পরিকল্পনা ও নির্দেশনার পর্যায়ে এবং অধিদপ্তরের আরেকজন সারোয়ার বাস্তবায়ন ও অফিস গ্রেডিংয়ের কাজে ভূমিকা রেখেছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই দুই কর্মকর্তার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কিছু পদায়ন প্রভাবিত করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, তুলনামূলক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়েছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়ন লটারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে কয়েকটি পদায়নের কথা সামনে এনেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। মেডিকেল ডিভিশনে মাসুদ রানা অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিভিশন-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা, যাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তিনি লটারির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ডিভিশনে পদায়ন পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃতি, সেগুলোর তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী কর্মসম্পাদন, অভিযোগের অবস্থা ও প্রশাসনিক যোগ্যতা কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। স্টাফ অফিসার হিসেবে আহসান হাবিব ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তা এবং একটি হত্যা মামলার আসামি ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। লটারির পর তাঁকে সরাসরি স্টাফ অফিসার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজিবের একই ডিভিশনে ফিরে আসা নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবের পদায়নও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগে রাজউক থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরে ফেরত আসার পর তিনি অর্থের বিনিময়ে মহাখালীর নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে লটারির মাধ্যমে তাঁকে আবার ডিভিশন-১-এ পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, রাজউকে যাওয়ার আগে তিনি একই ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর পুনরায় ফিরে আসার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে অর্থের বিনিময়ে পদ পাওয়ার অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেন, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা সংশ্লিষ্ট নথির স্বাধীন যাচাই,পদায়নের আগে ও পরে তাঁর কর্মস্থল, বদলির আদেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। সিটি ডিভিশনে আন্দালিব রহমান শেরেবাংলা-৩-এ দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আন্দালিব রহমানকেও গুরুত্বপূর্ণ সিটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক মূল্যায়ন হয়েছিল কি না এবং পদায়নের সিদ্ধান্তে সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না। লটারির নিরপেক্ষতা যাচাই হবে কীভাবে? প্রশাসনিক পদায়নে লটারি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিগত পছন্দ, তদবির ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমানো। কিন্তু শুধু লটারি অনুষ্ঠিত হওয়া বা ফলাফল প্রকাশ করাই স্বচ্ছতার পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। লটারির আগে যোগ্যতা নির্ধারণ, পদভিত্তিক শূন্যপদের তালিকা, অফিস গ্রেডিং, সফটওয়্যার বা পদ্ধতির নিরপেক্ষতা এবং চূড়ান্ত ফলাফল অনুমোদনের প্রক্রিয়াও যাচাই করা দরকার। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান বিতর্কে তাই কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: লটারিতে অংশ নেওয়ার জন্য কর্মকর্তা ও পদগুলোর যোগ্যতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল? অফিস গ্রেডিংয়ের মানদণ্ড কী ছিল এবং তা কি লিখিতভাবে সংরক্ষিত আছে? লটারির মূল তথ্য, ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে কি না? গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম, সংশোধন বা বিশেষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না? পদায়নের আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি, আদেশ, গ্রেডিং শিট ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের রেকর্ড পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব। ব্যাংক হিসাব ও কল রেকর্ড যাচাইয়ের দাবি লটারির মাধ্যমে পদায়নে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনরায় দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগকারীদের একাংশ অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব এবং ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ও তাঁদের স্বজনদের আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, প্রাসঙ্গিক আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনার দাবিও উঠেছে। তবে ব্যাংক হিসাব বা যোগাযোগের রেকর্ড যাচাই আইনসম্মত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বক্তব্য অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সারোয়ারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সারোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, পদায়নের সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে নেননি; মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি শুধু অফিস গ্রেডিংয়ের কাজ করেছেন। এই মূল্যায়ন ও গ্রেডিং প্রক্রিয়ায় তাঁর সঙ্গে আরও চারজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পদায়নের সিদ্ধান্তকে শুধু একজন কর্মকর্তার ওপর আরোপ করা সঠিক হবে না। তবে গ্রেডিংয়ের মানদণ্ড, সংশ্লিষ্ট পাঁচ কর্মকর্তার ভূমিকা এবং চূড়ান্ত পদায়নের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। স্বচ্ছতার উদ্যোগ কি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে? বদলি-বাণিজ্য বন্ধের উদ্দেশ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়ন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে প্রক্রিয়াটি কতটা উন্মুক্ত, যাচাইযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক তার ওপর। গণপূর্ত অধিদপ্তরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে একদিকে যেমন প্রকৃত অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ পাবেন। এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তর পদায়নের মূল নথি, গ্রেডিংয়ের মানদণ্ড এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয় কি না। কারণ স্বচ্ছতা কেবল একটি লটারি আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত পরীক্ষা হলো—ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কর্তৃপক্ষ কতটা নিরপেক্ষভাবে তার জবাব দেয়।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোহরার পদে পুনরায় পদায়ন পেতে আবেদন করেছেন বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন মহাফেজখানার নথি রক্ষক (মোহরার) মো. শাহীন হাওলাদার। তাঁর আবেদন ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, একই পদে অন্যরাও আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও আগে আবেদন করা ব্যক্তিদের নথি পেছনে রেখে তাঁর আবেদনটি কীভাবে মহাপরিদর্শক নিবন্ধন কার্যালয়ে আগে পাঠানো হলো? সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের অভিযোগ, তাঁরা চলতি মাসের শুরুতে আবেদন করলেও শাহীন হাওলাদারের আবেদনটি আগে পাঠানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফাইল প্রক্রিয়াকরণের ক্রম কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা ছিল কি না এবং সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। একই পদে ফিরতে আগ্রহী কেন? সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মো. শাহীন হাওলাদার প্রায় আট বছর বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোহরার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তিনি বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন মহাফেজখানায় নথি রক্ষক হিসেবে বদলি হয়ে আসেন। এখন বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোহরারের পদটি শূন্য হওয়ায় সেখানে আবারও দায়িত্ব পালনে আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি। তবে একই পদে পুনরায় পদায়নের ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহের কারণ কী, আবেদনটি বিবেচনার জন্য কী প্রশাসনিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে এবং অন্য আবেদনকারীদের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে আবেদন, নাকি আগে ফাইল পাঠানো? সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই পদে আগ্রহী অন্য ব্যক্তিরা চলতি মাসের শুরুতে আবেদন করেন। অন্যদিকে, শাহীন হাওলাদারের আবেদনে তারিখ উল্লেখ রয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি: কে আগে আবেদন করেছেন এবং কার আবেদন আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ও ফাইল প্রেরণের তারিখ এক বিষয় নয়। আবার আগে আবেদন করলেই পদায়নে স্বয়ংক্রিয় অগ্রাধিকার পাওয়ার বিধান রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নীতিমালা যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অভিযোগ উঠেছে, বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মহাদেব চন্দ্র দাস আগে আবেদন করা ব্যক্তিদের নথি মহাপরিদর্শক নিবন্ধন কার্যালয়ে না পাঠিয়ে শাহীন হাওলাদারের আবেদনটি আগে পাঠিয়েছেন। অভিযোগটি সত্য হলে, এর পেছনে কোনো লিখিত নির্দেশনা বা প্রশাসনিক যুক্তি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর যদি ফাইল পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোনো ক্রম বা বিধি অনুসরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রধান সহকারীর বক্তব্য কী? ফাইল পাঠানোর বিষয়ে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মহাদেব চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো মিথ্যা। বদলির কাগজপত্র পাঠানোর দায়িত্ব তাঁর নয়; এ দায়িত্ব জেলা রেজিস্ট্রারের। মহাদেব চন্দ্র দাসের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদন গ্রহণ, নথি প্রস্তুত ও প্রেরণের দায়িত্ব কোন কর্মকর্তার ওপর ছিল, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যবণ্টন ও নথিপত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ নিয়ে যা বললেন শাহীন হাওলাদার বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পুনরায় পদায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শাহীন হাওলাদার বলেন, “আমি চাইলেই তো আসতে পারব না। যদি কর্তৃপক্ষ আমাকে বদলি না করে, আমি কীভাবে যাব?” অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভাই, ভুল মানুষে হয়। তবে আমি এখন আর কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।” জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার স্বদেশ চন্দ্র চন্দ বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যে আদেশ আসবে, সেই অনুযায়ী তাঁরা কাজ করবেন। তিনি জানান, অল্প কিছুদিন হলো তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শাহীন হাওলাদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংবাদপত্রে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল কি না, তা তাঁর জানা নেই।তবে অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি। স্বচ্ছতার প্রশ্নে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার পদে পুনরায় পদায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি: একই পদে আবেদন করা প্রত্যেক ব্যক্তির আবেদন গ্রহণের তারিখ ও সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারের তথ্য। শাহীন হাওলাদারসহ আবেদনকারীদের নথি কোন তারিখে, কার মাধ্যমে এবং কী নির্দেশনায় মহাপরিদর্শক নিবন্ধন কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ফাইল প্রেরণের ক্ষেত্রে কোনো নির্ধারিত বিধি, অগ্রাধিকার নীতি বা লিখিত প্রশাসনিক আদেশ ছিল কি না। শাহীন হাওলাদারের আগের বদলি, বর্তমান কর্মস্থলে পদায়ন এবং নতুন করে আবেদন করার প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত বা বিভাগীয় কার্যক্রম হয়ে থাকলে তার ফলাফল। এসব নথি যাচাই করা গেলে আবেদন প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যতিক্রম ঘটেছে কি না এবং অভিযোগের পেছনে তথ্যগত ভিত্তি রয়েছে কি না, তা আরও স্পষ্ট হবে। সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজন নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা একই পদে একাধিক ব্যক্তি আবেদন করলে তাঁদের আবেদন কীভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। বিশেষ করে কোনো আবেদন আগে পাঠানো হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত নথির ভিত্তিতে প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করা। বরিশাল সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোহরার পদে শেষ পর্যন্ত কাকে পদায়ন করা হবে, তা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের আগে আবেদনকারীদের নথি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চলতি দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আশরাফুল আলমকে ঘিরে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নিয়ন্ত্রণ, কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, যন্ত্রাংশ ও টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচের হিসাব, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের নথি এবং ডিপো পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯৯৯ সালে ইন্সপেক্টর পদে চাকরিতে যোগ দেওয়া আশরাফুল আলম দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইউনিট প্রধানদের পদায়ন ও বদলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিপোর আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় তাঁর একটি প্রভাববলয় রয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার আর্থিক হিসাব নিয়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত যন্ত্রাংশ খাতে প্রায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং টায়ার খাতে ১০ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরে অভিযোগকারীরা কয়েকটি কেনাকাটার দামের তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি, টোল-ফেরি, আনলোডিং ও অন্যান্য ব্যয়ের নথি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। চাকরিজীবনের শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. আশরাফুল আলম ১৯৯৯ সালে বিআরটিসিতে ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন। ২০০৩ সালে সিনিয়র ইন্সপেক্টর থেকে ম্যানেজার (কারিগরি) পদে আত্মীকরণ হন। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় ২০১৭ সালে তিনি চলতি দায়িত্বে ডিজিএম পদে দায়িত্ব পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গাজীপুরে বিআরটিসির কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় দায়িত্ব পালন। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই সময়ে একটি প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের প্রশ্ন ওঠে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ভলভো বাস মেরামতের জন্য আট কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় ভলভো বাসের পরিবর্তে বিআরটিসির অন্য বাস, বিশেষত দ্বিতল বাস মেরামতের কাজে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ২০ জুন কর্মচারীদের পক্ষে মো. নজরুল ইসলাম একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে ২১ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি চিঠি জারি হয়। চিঠির নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৩৫.০০.০০০০.০১৩.৯৯.০২৪.১৮-১৫১। একাধিক ডিপো ও কারিগরি ইউনিটে দায়িত্ব অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল আলম গাজীপুর বাস ডিপো, জোয়ারসাহারা বাস ডিপো, মতিঝিল বাস ডিপো, কল্যাণপুর বাস ডিপো, তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা, কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এসব কর্মস্থলে ইউনিট প্রধানদের নিয়োগ, বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ের বিআরটিসি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন। সাবেক চেয়ারম্যান মো. জসিম, মো. মিজানুর রহমান, মো. ফরিদ ভূইয়া, এহসানুল এলাহি ও মো. তাজুল ইসলাম এবং বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখিত মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আট বছরে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনকালে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে, যার সঙ্গে আশরাফুল আলমের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করছেন। ঢাকা ট্রাক ডিপো: আয়-ব্যয়ের হিসাবেই প্রশ্ন আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিস্তারিত আর্থিক অভিযোগগুলো ঢাকা ট্রাক ডিপোতে তাঁর দায়িত্ব পালনকাল, অর্থাৎ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে ডিপোটির মোট রাজস্ব আয় ছিল ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলাচল বা সংশ্লিষ্ট একটি খাত থেকে আয় ২৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা এবং বাকি প্রায় ২৫৮ থেকে ২৬০ কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক আয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই হিসাবে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। উদ্বৃত্ত বা নিট লাভ দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী, মোট আয়ের ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ব্যয় এবং ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ উদ্বৃত্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। মাসিক গড় নিট লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে এই হিসাবের সঙ্গে পরবর্তী সময়ের লাভের তুলনা করে অভিযোগকারীরা ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অসংগতি থাকার প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে পরবর্তী ইউনিট প্রধানের সময়ে নিট লাভ হয়েছে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা। মাসিক গড় লাভ প্রায় ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৬ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আট মাসে নিট লাভের পরিমাণ ৭ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাসিক গড় লাভ প্রায় ৮৯ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। এই পার্থক্যকে ভিত্তি করে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আগের সময়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে মাসিক নিট লাভ বাড়ল কেন? তাঁদের দাবি, বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নিলেও আগের সময়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান হওয়া উচিত। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকার অনিয়ম ঘটে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট লেনদেন, নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ কিংবা তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে অভিযোগটির আর্থিক ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। যন্ত্রাংশ কেনাকাটা: একই পণ্যের দাম বাড়ল কতটা? ঢাকা ট্রাক ডিপোতে যন্ত্রাংশ কেনাকাটার হিসাবেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেরামত ও যন্ত্রাংশ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ের ব্যয় ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১১ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ১০০ টাকা। এ সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৬২৭ টাকা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৩ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেনাকাটার মূল্য তুলনায় একটি ক্লাচ প্লেটের উদাহরণ তুলে ধরেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ মার্চ ঢাকার বাংলাবাজারের আইচার মটরস থেকে একটি ক্লাচ প্লেট কেনা হয় ৮ হাজার ৫০০ টাকায়। একই বছরের ২৭ মার্চ বাংলাবাজারের মিজান মটরস থেকে একই যন্ত্রাংশ কেনা হয় ১৩ হাজার ৩০০ টাকায়। দ্বিতীয় কেনাকাটিটি টেন্ডার ছাড়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ১৪ জুন একই যন্ত্রাংশের দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৩৫০ টাকা। অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, এবার মিজান মটরসের কাছ থেকেই টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালে যন্ত্রাংশ খাতের মোট ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের আরও দাবি, বর্তমানে নগদে ভালো মানের একটি ক্লাচ প্লেট ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় কেনা সম্ভব।এ ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ, দরপত্র, সরবরাহকারীর বিল, পণ্য গ্রহণের প্রতিবেদন এবং বাজারদরের তুলনামূলক তথ্য যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ যন্ত্রাংশের পাশাপাশি টায়ার কেনাকাটার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ট্রাক ডিপোতে টায়ার খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৮ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ের ব্যয় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৮ টাকা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ মার্চ বাংলাবাজারের নোমান এন্টারপ্রাইজ থেকে ১০.০০-২০ মাপের একটি এমআরএফ টায়ার কেনা হয় ২৭ হাজার টাকায়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই কেনাকাটা টেন্ডার ছাড়াই হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২২ জুন একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একই মাপের টায়ার কেনা হয় ৩৩ হাজার ৫০০ টাকায়। পরে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ১৫০ টাকা। শেষের কেনাকাটিটি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় আড়াই বছরের ব্যবধানে প্রতিটি টায়ারের দাম ১১ হাজার ১৫০ টাকা বেড়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা, দরপত্রে প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহকারীর সঙ্গে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের মতে, যন্ত্রাংশ ও টায়ারের মতো বড় ব্যয়ের খাতগুলোতে ক্রয়প্রক্রিয়া ও বাজারদর যাচাই করা হলে সম্ভাব্য অনিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। জ্বালানি ব্যয়ে কিলোমিটারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ঢাকা ট্রাক ডিপোর জ্বালানি খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়েছে ১০৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা ওই সময়ের মোট আয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ লগবুক এবং ট্রাফিক বিভাগের জ্বালানি লগবুকে উল্লেখ করা কিলোমিটারের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে জ্বালানি খরচের হিসাবে অনিয়ম করা হয়েছে। এভাবে চার বছরে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ডিপোর রেকর্ড বইয়ে এ-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এই অভিযোগ যাচাই করতে গাড়ির দৈনিক চলাচলের রেকর্ড, ওডোমিটারের পাঠ, জ্বালানি উত্তোলন ও বিতরণ রেজিস্টার, যানবাহনের মেরামত নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিল একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো গাড়ি কত কিলোমিটার চলেছে, সেই অনুপাতে কত জ্বালানি বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়েছে এবং হিসাবের পার্থক্যের ব্যাখ্যা কী—স্বাধীন তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের নথি কোথায়? জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও টায়ারের বাইরে টোল-ফেরি, আনলোডিং, ভ্যাট-ট্যাক্সসহ অন্যান্য ব্যয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, টোল ও ফেরি খাতে মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হতো। কিন্তু এ ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায় না বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, এসব খাতে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পর তার যথাযথ হিসাব রাখা হয়নি। আনলোডিং খাতেও মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আনলোডিং ব্যয়ও ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে পরিশোধ করা হতো বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, আনলোডিং ব্যয়ের বিবরণী ও প্রকৃত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে এবং আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সময়ে এ খাতে কয়েক কোটি টাকার অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট-ট্যাক্স, টোল-ফেরি, আনলোডিং ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের নামে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং খাতবহির্ভূত চেকের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। বদলি ও পদায়ন ঘিরে প্রভাববলয়ের অভিযোগ আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে ইউনিট প্রধানদের বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ঢাকার বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করলেও ঢাকার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইউনিটে পদায়িত হননি। একই সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মস্থল যেখানেই থাকুক, তিনি প্রায়ই প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ডিপো প্রধানদের বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে আশরাফুল আলমের যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব; বরিশাল ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার, ; খুলনা ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান; টুঙ্গিপাড়া ডিপোর ম্যানেজার মো. জামসেদ আলী; রংপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. জুলফিকার আল ভুঁইয়া; মতিঝিল ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহিদুল; দিনাজপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোস্তাফিজুর; ময়মনসিংহ ডিপোর ম্যানেজার মো. এনামুল; গাজীপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ; সোনাপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. রাজু মোল্লা; কুমিল্লা ডিপোর ম্যানেজার মো. আব্দুল কাদের জিলানি; নরসিংদী ডিপোর ম্যানেজার মো. নূর এ আলম; সিলেট ডিপোর ম্যানেজার মো. রুকনুজ্জামান; মিরপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. ওমর ফারুক মেহেদী; কল্যাণপুর ডিপোর ম্যানেজার মো. শাহরিয়ার বুলবুল; গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার মো. নায়েব আলী এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেন সিদ্দিকি। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের আরও ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তার একটি অংশ ওই বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম মো. মনিরুজ্জামানের নামও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ অভিযোগকারীদের দাবি, বিআরটিসির বিভিন্ন ইউনিট থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা তাঁরা মাসোহারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে আশরাফুল আলমের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. মাসুদ তালুকদার বর্তমানে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ইউনিট প্রধান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাসুদ তালুকদার একটি পৃথক গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ইউনিটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও অর্থ আদায়ের সমন্বয়ে ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া তেজগাঁওয়ের দপ্তরে বিভিন্ন কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াতের বিষয়টিও অভিযোগকারীরা সামনে এনেছেন। তাঁদের দাবি, প্রধান কার্যালয়ের মো. মনিরুজ্জামান, মো. ফারুক, মো. নায়েব আলী এবং চেয়ারম্যানের পিএস মো. মোহাইমিন সজিব সেখানে যাতায়াত করেন। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, জোয়ারসাহারা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান বদলির কয়েকটি ঘটনায় আশরাফুল আলমের পছন্দের প্রার্থীদের পদায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। মো. সুলতান নামের এক কর্মকর্তার বদলির আদেশ দুইবার জারি হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। নারী কর্মীদের নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে নারী কর্মীদের ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীদের কয়েকজন। তাঁদের দাবি, ২০১৭ সালে চেয়ারম্যান মো. ফরিদ এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামের দায়িত্বকালেও এ ধরনের অভিযোগের চর্চা ছিল। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনার নিষ্পত্তি তাঁর দপ্তরে হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি ও অসন্তোষের অভিযোগ অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল আলমের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়রানির শিকার হন। ব্যক্তিগত বিষয়ে আপত্তি তোলার কারণে হেলাল নামের এক কর্মীকে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে বদলি করা হলেও পরে তাঁকে আবার আশরাফুল আলমের দপ্তরে কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ইয়ার্ডের উন্নয়নকাজ চলার সময় ডিএলআই পরিদর্শন এবং নির্ধারিত কাজের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে এক কর্মীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময়, সংশ্লিষ্ট আদেশ ও কর্মীর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রায় আট থেকে নয় মাস আগে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে বিরোধের জেরে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। ওই পরিস্থিতি তৈরিতে আশরাফুল আলমের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে শ্রমিকদের লিখিত অভিযোগ, ব্যবস্থাপনার বক্তব্য, বৈঠকের কার্যবিবরণী, বদলির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বর্তমান দায়িত্ব ও তদন্তের দাবি বর্তমানে আশরাফুল আলম কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি প্রায় প্রতিদিন প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা ও বদলি-সংক্রান্ত বিষয়ে যোগাযোগ রাখেন। তাঁদের মতে, বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, টায়ার, পরিবহন ব্যয়, মেরামত এবং ইউনিট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ এসব খাতে অনিয়ম হলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও জনসেবার মান—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অভিযোগকারীরা আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সব ডিপো ও ওয়ার্কশপের আয়-ব্যয়, প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটা, টায়ারের দরপত্র, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়, নগদ অর্থ উত্তোলন, খাতবহির্ভূত চেক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-সংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সরবরাহকারী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিআরটিসির আর্থিক হিসাব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: ঢাকা ট্রাক ডিপোর চার বছরের ব্যয় ও লাভের হিসাব কি স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা হয়েছে? যন্ত্রাংশ ও টায়ারের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল? জ্বালানি, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয়ের পক্ষে পর্যাপ্ত নথি রয়েছে কি? আর কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্তগুলো কি নির্ধারিত বিধি অনুসারে নেওয়া হয়েছে? রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থার সম্পদ ও রাজস্ব রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।