বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্প এখন বড় ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রকল্পটির আর্থিক অনিয়ম, ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কেনার জন্য প্রায় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তবে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাজারমূল্যের তুলনায় বহু গুণ বেশি দামে এই মেশিন কেনা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রায় ৩ হাজার ১৭২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বড় প্রযুক্তিগত প্রকল্পে সাধারণত উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে সেই নিয়ম অনুসরণ না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেনাবাহিনীর একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহ করা হলেও যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এদিকে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেননি, তবে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিপুল ব্যয়ে কেনা মেশিনের একটি বড় অংশ বর্তমানে অচল বা ব্যবহার অযোগ্য। সাম্প্রতিক অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেশিন ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের বিষয়টি উপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে। যেখানে ১০ বছরের ওয়ারেন্টির সুপারিশ ছিল, সেখানে মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি দেওয়া হয়—যা প্রকল্পের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়কাল এবং প্রেক্ষাপট এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। অনেক রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছিল। বর্তমান নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অনেকের কাছে প্রকল্পটির ব্যর্থতার একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে, কেবল তদন্ত নয়—দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণই হবে প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মূল শর্ত। সবশেষে প্রশ্ন রয়ে যায়—জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় হলো এবং কারা এর সুবিধাভোগী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন শুধু আর্থিক বিষয় নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের জন্যও জরুরি হয়ে উঠেছে।
মুখ খুললেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশে পুলিশ পুনর্গঠন, নির্বাচনের পরিস্থিতি, ৭.৬২ বুলেটের প্রসঙ্গ, এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের একটি কিচেন কেবিনেট ছিল, যেখানে তিনি ছিলেন না। সেখানে কী আলোচনা হতো তা জানানো হতো না, এবং তিনি ওই কেবিনেটে অংশ নিতে পারেননি। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “দেশটা তখন এক অগ্নিগর্ভের মধ্যে ছিল এবং কেউ আমাকে ডাকে নি, আমি তাদের সাথে একমত হতে পারতাম না।” পুলিশ পুনর্গঠন নিয়ে তিনি বলেন, “আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল পুলিশকে পুনর্গঠন করা এবং আমি মনে করি, আমি এতে সফল হয়েছি।” তিনি জানান, নির্বাচনের সময় পুলিশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি ছিল। অনেক থানায় আগুন দেয়া হয়েছিল, এবং পুলিশকে মাঠে আনার জন্য তাকে বেশ কিছু কথা বলতে হয়েছিল। “প্রায় ৪ হাজার রাইফেল লুট হয়ে গেছে,” বলেন সাখাওয়াত হোসেন, “এখনো হাজার খানেক রাইফেল পিস্তল লুট করা অবস্থায় রয়েছে।” এছাড়া, ৭.৬২ বুলেট সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই বুলেট খুব মারাত্মক অস্ত্র। এটি সাধারণত সমরাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।” তিনি মনে করেন, এটি পুলিশের কাছে থাকা উচিত নয়। এই রাইফেলগুলো কখন, কী কারণে এবং কেন দেয়া হয়েছে, সেই বিষয়েও ইনকোয়ারি করার তার ইচ্ছা ছিল। নির্বাচন নিয়ে সাখাওয়াত বলেন, “নির্বাচন ভালো হয়েছে, তবে পৃথিবীতে কোনো নির্বাচনই একশ পার্সেন্ট খাঁটি হয় না।” তিনি জামায়াতে ইসলামী দলকে ৭৭টি সিট পাওয়া একটি বড় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশে তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারেনি। সেখানে জামায়াত ৭৭টি সিট পেয়ে কী ধরনের বার্তা দিল তা ভাবুন।” চুক্তি বিষয়েও সাখাওয়াত বলেন, “ননডিসক্লোজার ক্লজ থাকা চুক্তি প্রকাশ করা যায় না। তবে, এসব চুক্তিতে কোনো দেশবিরোধী কিছু নেই।” তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের গ্যাস উত্তোলন সম্পর্কিত আলোচনা চলাকালীন সময়ে আমেরিকান কোম্পানির শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিলের ৪ শতাংশ দেয়ার বিষয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তবে, তিনি দাবি করেছেন, এতে শ্রমিকদের কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। অবশেষে, সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সরকার যদি চায়, তবে যেকোনো সময় এসব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। এটি একটি অর্ডিনেন্স এবং সরকারের হাতে রয়েছে ক্ষমতা।” এই মন্তব্যগুলো বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে এক গভীর আলোকপাত করছে। সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আরও বেশি আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিনজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা নির্বাচন বিলম্বিত করার এক নানামুখী কৌশলে লিপ্ত ছিলেন—এমন অভিযোগ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক ভাবনা থাকলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। দ্রুত নির্বাচন থেকে সরে আসা: চাপ নাকি কৌশল? সূত্র বলছে, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা বিবেচনা করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন—এই যুক্তি সামনে আনা হয়। সমালোচকদের মতে, এসব সংস্কারের আড়ালে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়নের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল ছিল। তিন উপদেষ্টার যুক্তি ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, প্রশাসন অস্থিতিশীল, দ্রুত নির্বাচন দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তির পেছনে ছিল বিশেষ উদ্দেশ্য: সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের পছন্দের শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা। ‘মব সন্ত্রাস’ কৌশলের হাতিয়ার? একাধিক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রশাসনিক অস্থিরতা ও মব সন্ত্রাস পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব অস্থিরতা ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত রাখতে। বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে অগ্নিসংযোগের ঘটনার দিন প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করে। কে বা কারা সেই নির্দেশ দিয়েছিল—তা এখনো অজানা। অধ্যাপক ইউনূস পরে এক সিনিয়র সাংবাদিককে জানান, ঘটনার সময় তিনি অবগত ছিলেন না। এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। আঞ্চলিক শক্তির চাপ ও ‘লন্ডন বৈঠক’ রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি দ্রুত নির্বাচন চেয়েছিল। তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হন অধ্যাপক ইউনূস। লন্ডন বৈঠক ছিল সেই প্রক্রিয়ার অংশ। তবে নির্বাচনবিরোধী উপদেষ্টারা বৈঠকের আগেই নানা অপপ্রচার চালান। তারা বিদেশি কূটনীতিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, নির্বাচন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রশাসন কবজায় নেওয়ার চেষ্টা সন্ধ্যাকালীন গোপন বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক শক্তির প্রভাব এবং প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—সব মিলিয়ে এক সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অধ্যাপক ইউনূস কার্যত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু উপদেষ্টা বিদেশ সফরেও কূটকৌশলে যুক্ত ছিলেন। একজন উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে সফরকালে সাময়িকভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। ফরমায়েশি জনমত জরিপ? আরেকটি অভিযোগ—জনমত জরিপকে ব্যবহার করা হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে। টেবিলে বসে তৈরি করা জরিপ বিদেশি দূতাবাসে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। সেখানে বলা হয়েছে, দ্রুত নির্বাচন হলে অপ্রত্যাশিত শক্তির উত্থান ঘটবে। পরিকল্পনা ‘প্ল্যান ২’ কী ছিল? নির্বাচনের দিন পর্যন্ত কিছু উপদেষ্টার তৎপরতা ছিল নির্দিষ্ট কিছু আসনকেন্দ্রিক। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তারা ‘প্ল্যান ২’ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসেন বলে জানা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিকল্পনাটি ছিল— নির্বাচন ভণ্ডুলের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, অথবা প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে জরুরি অবস্থা সদৃশ কাঠামো জোরদার করা, অথবা নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথ সুগম করা। তবে জনচাপ, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতা কি সত্যিই নিরপেক্ষ হাতে ছিল, নাকি আড়ালে চলছিল একাধিক শক্তির সমান্তরাল খেলা? নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভবিষ্যৎ গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
একটা অনির্বাচিত সরকারের হাত থেকে দেশকে গণতন্ত্রায়নের পথে নিয়ে যেতে সশস্ত্রবাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) সদস্যরা যে ভূমিকা রেখেছেন তা ইতিহাসে অবস্মরণীয় হয়ে থাকবে, বলছেন দেশের আপামর সচেতন মানুষ। সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসায় ভাসছেন এখন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তাঁর বিশেষ প্রচেষ্টায় এবং নেতৃত্বেই ঐতিহাসিক এক অকল্পনীয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, দেশে ফিরে এলো গণতন্ত্র। প্রতিটি সাধারণ-সচেতন মানুষ এমন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রশংসা করছেন। ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে মানুষ সুশাসন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং পরিবর্তনের যে স্বপ্ন দেখেছিল তা ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মানুষেকে হতাশ করেছেন। যে কারণে মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখছিল অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে নতুন একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের। কিন্তু ড. ইউনূস ক্ষমতা ছাড়াতও কোনো ক্রমেই রাজি হচ্ছিলেন না। রাজনৈতিক দলগুলোর রোডম্যাপের দাবিকে তিনি বার বারই এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানই প্রথম এক বক্তৃতায় ঘোষণা করেন, ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনে সেনাবাহিনী সরকারকে সহযোগিতা করবে। তাক্ষণিকভাবে সরকারের তরফ থেকে সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়। কিন্ত জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর লক্ষ্যে অটল থাকেন। অনেকে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এও গুজব ছড়িয়েছে, ‘আর্মি ক্ষমতা টেকওভার করছে।’ কোনো কোনো মহল থেকে এ ব্যাপারে নেপথ্যে উস্কানিও দেওয়া হয়েছে। এত কিছু সত্ত্বেও ওয়াকার উজ জামান অত্যন্ত ধৈর্য্যরে সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। গণতন্ত্রায়নের পথে ছিলেন অবিচল। গত বছরের মে মাসে সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে তিন বাহিনীর প্রধানরা যমুনায় ড. ইউনূসের সাক্ষাত করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর দাবি জানান। এসবের কারণেই মূলতঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাধ্য হন লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক ও নির্বাচন আয়োজনের সমঝোতায় যেতে। কিন্তু লন্ডন বৈঠকের সমঝোতায়ও ড. ইউনূস পরবর্তীতে ঠিক থাকতে চাননি। একেক সময় একেক কথা বলেছেন। জামায়াত-এনসিপির নির্বাচন বিরোধী ভূমিকায় নেপথ্য থেকে তা দিয়েছেন। নানামুখী চাপে পড়ে অবশেষে ৫ আগস্ট, ২০২৫ বাধ্য হয়ে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্ধারণের কথা ঘোষণা করেন। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশ ও পরবর্তীতে তফসিল ঘোষণা হয়। তবে বরাবরই এমনকি নির্বাচন হয়ে যাওয়ার মুহূর্তেও দফায় দফায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে নির্বাচন নিয়ে। অনিশ্চয়তা, গুজব ও নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করা হয়েছে। এতসব বাধা অতিক্রম করে কল্পনাতীত অবাধ, সুষ্ঠু-নিরপক্ষে পরিবেশে নির্বাচন হয়ে গেলো। ‘কল্পনাতীত’ বলা হচ্ছে এ কারণে যে, তফসিল ঘোষণার পরদিনই ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। তখনই মনে করা হয়েছিল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কত ঘটনা যে ঘটবে এর ইয়ত্তা নেই। বিশেষ করে নির্বাচনের দিনকে সামনে রেখে সর্বমহলেরই বড় আশংকা ছিল। সব আশংকা এবং জল্পনা-কল্পনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশের মধ্য দিয়ে এক ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়ে গেছে। এত বাধা-বিঘ্ন দূর করে দেশকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রধান কৃতিত্ব জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানেরই। বিশ্বে এবং বাংলাদেশেও অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকে গণতন্ত্র বিরোধী। নিজেদের কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা গ্রহণের প্রতি আগ্রহ থাকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান নেতৃত্বের এ ক্ষেত্রে নতুন নজির স্থাপন করলো। বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান (মাঝে) এবং নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসানেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান হিসেবে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের আন্তরিকতা, উদ্যোগ ও একাগ্রতা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। নির্বাচনের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রশংসায় ভাসছেন। অনেকে বলছেন, এই মানুষটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। সম্ভাব্য এক গৃহযুদ্ধের দুঃস্বপ্ন থেকে দেশকে রক্ষা করার কৃতিত্ব তাঁরই। ইতিহাস রচনা করে গেলেন তিনি। সেনাপ্রধানসহ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের প্রতি স্যালুট জানাচ্ছে মানুষ।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফেরার আগে টানা ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের মাথায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেসরকারি ফল অনুযায়ী, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান তার অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ১. জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি মানুষ নিহত হন। এছাড়া গত ১৫ বছরে হাজারো গুমের অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সামাজিক বিভাজন ও অবিশ্বাস দূর করা নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে ফিরে আসার পর থেকেই ঐক্যের বার্তা দিয়ে আসছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনতে পারবে না। আমরা যদি এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, তবে সেখান থেকে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব।” ২. আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল “আইনের শাসন নিশ্চিত করা।” হাসিনা আমলে রাজনীতিকীকরণের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করাও তার সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। ৩. অর্থনৈতিক সংস্কার ও কর্মসংস্থান ২০০৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার কোটি ডলারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য ও বেকারত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে। যুব বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং শিল্প খাতে চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি— ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন এসব পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেছেন তারেক রহমান। ৪. ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির কারণে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনা সরকারের পতনের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। টাইমকে তারেক বলেন, ভারতের সঙ্গে করা কিছু চুক্তিতে ‘অসামঞ্জস্য’ রয়েছে, যা সংশোধন করা দরকার। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “সবার আগে থাকবে বাংলাদেশের স্বার্থ।” অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য ও বাজার সম্প্রসারণও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হবে। ৫. ইসলামপন্থী রাজনীতির বাস্তবতা নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে এই দলের সঙ্গে জোট করলেও এবার বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, “এটি শুধু বিএনপির দায়িত্ব নয়; বরং দেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব, যারা গণতন্ত্রে ও জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাস করে।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে; যেন ৫ আগস্টের আগের সময়ে আমাদের ফিরতে না হয়।” শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ শেখ হাসিনাকে উৎখাতের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থী নেতারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেন। আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে।” ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অধ্যায়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এখন নজর থাকবে—তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
মুন্সীগঞ্জে নির্বাচন-পরবর্তী সহিসতায় একজন নিহত হয়েছেন। সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আব্দুল্লাহ গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে সংর্ঘের ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম জসিম নায়েব (৩৫), মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার বোন জামাই দিদার। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইমেন অ্যান্ড অপারেশনস) মো. ফিরোজ কবির জানান, এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর তারা শুনেছেন। সত্যতা যাচাইয়ে কাজ করছে পুলিশ। রাত ৯টায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত ওই গ্রামে থেমে থেকে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলমান। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিক তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। স্থানীয়রা জানায়, চর আব্দুল্লাহ গ্রামে নির্বাচনের আগে থেকে ধানের শীষের সমর্থক নাসির ডাক্তার ও শওকত আলী সরকারের সঙ্গে স্থানীয় মাফিক নায়েবের বিরোধ চলে আসছিলে। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির জের ধর ধরে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিকেলে মাফিক নায়েবের বাড়িতে হামলা করা হয়। এ সময় উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে কুপিয়ে জখম করা হয় জসিম উদ্দিনকে। জসিমকে উদ্ধার করে প্রথমে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢামেকে নেওয়ার পথেই জসিমের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন তার বোন জামাই মো. দিদার। মৃত জসিম চর আব্দুল্লাহ গ্রামের মাফিক নায়েবের ছেলে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইমেন অ্যান্ড অপারেশনস) মো. ফিরোজ কবির বলেন, ‘মৃত্যুর সংবাদ আমরা শুনেছি, সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা শুনেছে পরে সংঘর্ষের ঘটনা কেউ জানায়নি।
যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরেন তারেক রহমান। এর দেড় মাসের মাথায় তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। টাইম সাময়িকী গত জানুয়ারিতে দলটির নেতা তারেক রহমানের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রথম অগ্রাধিকার নিয়ে। জবাবে তিনি আইনের শাসন নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। তাঁর কাছে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। তারেক রহমান বলেছেন, যতই রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা নীতি নেওয়া হোক না কেন, ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। আস্থা ফিরিয়ে ঐক্যবদ্ধ করা ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৪০০ লোক প্রাণ হারায়। এর আগে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিচারবহির্ভূতভাবে গুমের শিকার হয় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। সেই ক্ষতগুলো এখনও বেশ তাজা। শেখ হাসিনার সময় যেসব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকরণ হয়েছিল সেগুলোর ওপর এখন মানুষের আস্থা ফেরাতে তারেক রহমানকে কাজ করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এর আগে ক্ষমতায় বসেছিল ২০০১ সালে। এর পরপরই আওয়ামী লীগ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে ফিরে আসার পর থেকে তারেক রহমান ঐক্যের বাণী প্রচার করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিহিংসা কিছুই ফিরিয়ে আনবে না। বরং আমরা যদি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তাহলে হয়তো ভালো কিছু পাব।’ অর্থনীতির মেরামত আওয়ামী লীগের আমলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল। জিডিপি ২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালে ৪২০ বিলিয়নে পৌঁছায়। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য ও বেকারত্বের কারণে দলটির বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পরও মানুষের জীবনযাত্রার মানের খুব একটা উন্নতি হয়নি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অথচ যুব বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছে। এটি জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রায় ৪ কোটির বেশি বাংলাদেশি চরম দারিদ্রতার মধ্যে বসবাস করছে। এ অবস্থায় বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারে নারীদের ভাতা ও বেকারদের ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এতে অর্থায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন আছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত করতে তারেক রহমান সংযোগ ব্যবস্থা জোরদার করতে চান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্যোক্তাদের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের উদারীকরণও তাঁর লক্ষ্য। বর্তমানে বিদেশে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী আছেন। তারা যাতে ভালো বেতনের চাকরি পান সেজন্য দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে তারেক রহমানের। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ভাষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে পারি।’ ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের উন্নয়ন করতে দুটি শক্তিধর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করা জরুরি। একটি প্রতিবেশী দেশ ভারত, অন্যটি বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম শীর্ষ আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে। ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়াটা এই উত্তেজনার সবশেষ উদাহরণ। বাংলাদেশও আইপিএল সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এখনও বিএনপির সঙ্গে ভারতের কাজ করার আগ্রহের কিছু ইঙ্গিত আছে। গত ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পরাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তবে তিস্তা নদীসহ বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। কারণ, বিএনপি ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি’ করে আসছে। তারেক রহমান বলেছেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সঠিক পুনর্গঠনের জন্য আগেকার চুক্তির সংশোধন প্রয়োজন। শেখ হাসিনার সময়ে হওয়া অনেক চুক্তিতে অসামঞ্জস্যতা আছে। আমরা প্রতিবেশী হলেও বাংলাদেশের ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা করাটা সবার আগে। এরপর সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক। আলোচনার মাধ্যমে চলতি মাসে তা ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করতে রাজি হয়েছে ঢাকা। এছাড়া, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য এখন শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। এটি একটি অগ্রগতি, তবে তারেক রহমানের লক্ষ্য হলো দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে শুল্কের ক্ষেত্রে আরও ছাড় পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। সম্ভবত বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মাধ্যমে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গে তারেক বলেন, ‘আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি।’ ইসলামপন্থীদের উত্থান সামলানো বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে আসন প্রাপ্তির সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির গঠনতন্ত্রে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকলেও কট্টরপন্থী অবস্থান কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। এখন তারা সামাজিক কল্যাণ ও নিজেদেরকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ হিসেবে প্রচারের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, ‘স্বভাব কখনও বদলায় না’। নারীদের নিয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের মন্তব্য মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জামায়াত এক সময় বিএনপির নির্বাচনী জোট সঙ্গী ছিল। এবার জাতীয়তাবাদী দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, দেশ পরিচালনায় ইসলামপন্থীদের প্রভাব সীমিত থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বলেছেন, ‘বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য সব দলের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা জরুরি।’ তারেক রহমান বলেন, ‘এটি কেবল বিএনপির দায়িত্ব নয়, বরং গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে না যাই। মানুষ যাতে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারে সেজন্য আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’ শিক্ষার্থীদের জন্য কী? শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা বৈষম্য ঘিরে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল। কিন্তু ছাত্র নেতাদের গঠন করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের নির্বাচনী জোট সঙ্গী হওয়ায় অনেক নারী ও সংখ্যালঘু সদস্য মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী আধিপত্য অনেক তরুণকে হতাশ করেছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের সময় সামনের সারিতে থাকা নারীরা সংস্কার প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে অবহেলিত হয়েছেন। এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা বলছেন, তিনি বিশ্বাস করেন এখনও প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্পের আশা আছে। তবে তা রাতারাতি তৈরি হবে না। এ জন্য কিছু মানুষকে পেশাগত সততা নিয়ে রাজনীতিতে এসে, নীতিতে অবিচল থেকে মানুষের মাঝে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করতে হবে। এমনকি যদি একটি আসনেও কেউ সফল হয়, সেটিও প্রমাণ করবে, পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বই একমাত্র ভবিষ্যৎ নয়। নিজের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেছেন, যারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি এক গভীর দায়িত্ব আছে।
বরিশাল জেলার সংসদীয় ছয়টি আসনেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে বেসরকারিভাবে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন। ঘোষণা অনুয়ায়ী বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৌলঝাড়া) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯৯ হাজার ৪১৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কামরুল ইসলাম পেয়েছেন ৪৫ হাজার ১৪০ ভোট। ৫৪ হাজার ২৭৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন দুই বারের সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬৯৮ জনের মধ্যে কাস্ট হয়েছে ২ লাখ ৩শ ৫১ ভোট। ভোট কেন্দ্রের সংখা ১২৯টি। বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। নির্ধারিত ১৪০টি কেন্দ্রে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ২৮০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল মান্নান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭১ হাজার ৯৮৯ ভোট। সে হিসাবে ৬৯ হাজার ২৯১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৩ লাখ ৮০ হাজার ৭০৬ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৯ জন। বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তিনি নির্ধারিত ১২৬ কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭৮ হাজার ১৩১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ ঈগল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৭ হাজার ১৪৯ ভোট। সে হিসাবে ২০ হাজার ৯৮২ হাজার ভোটে প্রথমবার বিজয়ী হয়েছেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ৪২০ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৭০ জন। বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসেন বিজয়ী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান। তিনি নির্ধারিত ১৪৯টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭২ হাজার ৭৯২ ভোট। হিসাব অনুযায়ী ৫৪ হাজার ৪০০ ভোটের বিশাল ব্যবধানে প্রথম বারের মতো বিজয়ী হয়েছেন সাবেক ছাত্র নেতা রাজিব আহসান। নদীবেষ্টীত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৭ হাজার ৫১৭ জন। এদের মধ্যে ২ লাখ ৪২ হাজার ১৪৮ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে বিজয়ী হয়েছেন এই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি নির্ধারিত ১৭৬টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯৩ হাজার ২১৬ ভোট। সে হিসাবে ৩৯ হাজার ৭৯০ ভোটের ব্যবধানে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মজিবর রহমান সরোয়ার। তার এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫৩৪ জন। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৫ জন। এ ছাড়া বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল হোসেন খান। তিনি নির্ধারিত ১১৩টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮১ হাজার ৮৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. মাহামুদুন্নবী তালুকদার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ৫৪ হাজার ৫৩৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম এই আসনে ভোট পেয়েছেন ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট। সে হিসাবে বরিশাল-৬ আসনে দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আবুল হোসেন খান। তার এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বরিশাল জেলার ৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্রসহ মোট ৩৬ জন প্রার্থী।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে নগদ ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করেছে সেনাবাহিনী। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে উপজেলার আবদুল বারিহাট এলাকা থেকে মাইক্রোবাসটি আটক করা হয়। চন্দনাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইলিয়াছ খাঁন বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে ১০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ও মাইক্রোবাস থানায় হস্তান্তর করেছে সেনাবাহিনী। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, জব্দ করা টাকাগুলো স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুল হক চৌধুরীর। বিষয়টি যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে, টাকা জব্দ করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, একটি মাইক্রোবাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে ঘিরে রয়েছেন সেনাসদস্যরা। ওই ব্যক্তি টাকা গুনছেন। এ সময় একজন ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। টাকা গুনতে থাকা ব্যক্তি উত্তরে জানান, তিনি মিজানুল হক চৌধুরীর এস্টেট ম্যানেজার। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে মিজানুল হক চৌধুরী ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। টাকাসহ জব্দের বিষয়ে জানতে মিজানুল হক চৌধুরীর মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ভোটের দিন রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে দেখা গেছে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। নেই চিরচেনা যানজট, নেই ট্রাফিক সিগন্যালের দীর্ঘ অপেক্ষা। ঈদের দিনেও যে ধরনের যানবাহনের চাপ থাকে, বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর রামপুরা, খিলগাঁও, চৌধুরীপাড়া ঘুরে তার চেয়েও বেশি সড়ক শূন্যতার দৃশ্য চোখে পড়ে। কখনো সখনো দু’একটি অটোরিকশা বা একটি প্রাইভেটকার চলাচল করতে দেখা গেলেও দীর্ঘ সময় সড়কে তাকিয়ে থাকলেও তেমন কোনো যানবাহনের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। এমনকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালে ট্রাফিক পুলিশ বা সিগন্যাল ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মনসুর আলী বলেন, “ঢাকা শহরে এমন যানবাহনের শূন্যতা ঈদের দিনেও দেখা যায়নি। নির্বাচন নিয়ে শুধু উৎসবের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে আতঙ্কও কাজ করছে। কী হবে, কী হতে চলেছে—এ নিয়ে সবাই চিন্তিত।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচন উৎসবমুখর হবে—এমন কথার পাশাপাশি মানুষের ভেতরের এই উদ্বেগের দিকটিও তুলে ধরা জরুরি। একই সুরে কথা বলেন রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, “ভোট দেওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি মানুষের মনে আতঙ্কও ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন, পরিস্থিতি বুঝতে চাইছেন। তবে সবার একটাই আশা—নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। মানুষ শান্তি চায়।” এদিকে, অ্যাডিশনাল কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান জানান, “নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ভোট দিতে নিজ নিজ গ্রামে চলে গেছেন। এ কারণেই ঢাকায় স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যানবাহন চলাচল অনেক কম।” তিনি জানান, দূরপাল্লার কিছু বাস সীমিত আকারে চলাচল করছে, তবে মহানগর এলাকায় সড়ককে কার্যত ফাঁকাই বলা যায়। সড়কে যানবাহনের স্বল্পতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কমলাপুর রেলস্টেশনে। ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদিন বলেন, “সড়কে যানবাহন কম থাকায় মানুষ ট্রেনের ওপর নির্ভর করছে। ফলে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বেড়েছে।” স্টেশন সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে একটি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় ট্রেনের ছাদে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। ভেতরের বগিগুলোতেও যাত্রীদের গাদাগাদি অবস্থা ছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, বুধবার সকাল থেকে রাজধানীতে যানবাহনের চলাচল খুবই সীমিত। কিছু অটোরিকশা ও হাতে গোনা কয়েকটি প্রাইভেটকার ছাড়া সড়কে উল্লেখযোগ্য যান চলাচল নেই। ডিএমপি সূত্র জানায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে, আবার সন্ধ্যার দিকে আরও কমে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটের দিনে ঢাকার এই নীরবতা একদিকে যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি মানুষের মনে চলমান উদ্বেগ ও প্রত্যাশার প্রতিফলনও বটে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করে। ইশতেহারে জানানো হয়, সরকার গঠন করতে পারলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনায় যুবকদের প্রাধান্য, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। জামায়াতে ইসলামী জানায়, ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তারা কাজ করবে। পাশাপাশি বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে যুবকদের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠন এবং সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাও অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাংকসহ আর্থিক খাত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, প্রযুক্তি, কৃষি ও শিল্পখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার করা হয়। ইশতেহারে আরও বলা হয়, সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন, সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এছাড়া বিগত সময়ে সংঘটিত খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ, জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গঠন, শিল্পায়ন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারও ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বল্পমূল্যের আবাসন, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ইশতেহার শেষ হয়।
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে নির্বাচনি প্রচারণায় নামের আগে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ পদবি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট কাজী এরফানুর রহমানের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি বগুড়া-১ এর চেয়ারম্যান (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) মোছা. শামীমা খাতুন জামায়াত প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন। নোটিশে তাকে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি বেলা ১২টার মধ্যে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সশরীরে অথবা প্রতিনিধির মাধ্যমে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মো. শাহাবুদ্দিনের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। এরপরও তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যানার, পোস্টার ও লিফলেটে নিজেকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সারিয়াকান্দি উপজেলা ইউনিটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। গত ২৮ জানুয়ারি বিকেলে উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগটি জমা দেন উপজেলা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মহসিনুর রহমান ও সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান আলী। অভিযোগে মিথ্যা বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার করে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়। এদিকে বগুড়া-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলামের এজেন্ট কাজী এরফানুর রহমানও একই অভিযোগে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির কাছে লিখিত আবেদন করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জামায়াত প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, “আমি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সব ধরনের প্রমাণ রয়েছে। উপজেলার অনেক সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধা আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। এটি আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ষড়যন্ত্র। গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার আমার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা দিয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।” তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।