ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তাদের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোতে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, তেল ডিপো ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর লোহার খাঁচা সদৃশ ধাতব কাঠামো বসানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভাব্য ড্রোন হামলা মোকাবিলার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও আমিরাত সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব কাঠামোর উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি, তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত স্বল্প উচ্চতায় পরিচালিত ছোট আকারের ড্রোন হামলা প্রতিহত করার প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হতে পারে। তেল স্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা কেন? গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত অবকাঠামোকে ঘিরে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে। এর জেরে উপসাগরীয় দেশগুলো বিশেষ করে তেল রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর মোট জিডিপির একটি বড় অংশ তেল ও গ্যাস খাতনির্ভর। ফলে তেল ডিপো, রিফাইনারি ও রপ্তানি টার্মিনালের ওপর যেকোনো হামলা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক ভাইরাল ছবিগুলো সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধের আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা এদিকে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ সংলাপে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে এখনো গভীর মতবিরোধ রয়ে গেছে। এই সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় সামনে এসেছে পাকিস্তান। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২২ মে) তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Abbas Araghchi-এর সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Syed Mohsin Naqvi। সেখানে যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বার্তা ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান মূলত দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথ তৈরির চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালি: সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্যমতে, আলোচনায় কিছু “আশাব্যঞ্জক সংকেত” মিললেও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে, ইরান যদি এই আন্তর্জাতিক নৌপথে নিজস্ব শুল্ক বা টোল ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে স্থায়ী সমাধান অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, উভয় পক্ষের অবস্থানের দূরত্ব আগের তুলনায় কমেছে। তবে ইউরেনিয়াম মজুত ও সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং হরমুজে অবাধ নৌচলাচলের প্রশ্ন এখনো সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের মূল্য গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রণালির আশপাশে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিই পুনরায় সচল করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, তেহরানের যুদ্ধপূর্ব অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও অক্ষত রয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এখানকার যেকোনো সামরিক অস্থিতিশীলতা সরাসরি আঘাত হানতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। মার্কিন দাবির সঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অসামঞ্জস্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৯০ শতাংশ পুনরায় সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে। এসব স্থাপনায় বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গেলে মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের গত কয়েক সপ্তাহের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের নৌবাহিনী “পুরোপুরি ধ্বংস” হয়ে গেছে। পরে তিনি আরও বলেন, ইরানের বিমানবাহিনী, রাডার ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানার বড় অংশ নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীপিট হেগসেথ। তবে নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৩ হাজার হামলার পরও অক্ষত ইরানের বড় অংশের সামরিক সক্ষমতা মার্কিন ও মিত্র গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৫ দিনে ১৩ হাজারের বেশি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হলেও দেশটির ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনও টিকে আছে। এছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের হাতে এখনও কয়েক হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ রয়েছে, যা তাদের মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী(আইআরজিসি)ও একই ধরনের দাবি করছে। বাহিনীটির এক মুখপাত্র সম্প্রতি বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত তাদের “পুরোনো মজুদ” থেকেই মাত্র ৩ হাজার ৬০০ ড্রোন এবং ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানের এক সংসদ সদস্য তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি-কে বলেছেন, বিদ্যমান মজুদ দিয়েই “বছরের পর বছর যুদ্ধ চালানো সম্ভব”। হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির বড় অংশ এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০ থেকে ৭৫ ডলারের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ১০০ থেকে ১১০ ডলারের ঘরে অবস্থান করছে। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্তর। এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। ভারতের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৯ শতাংশ আমদানি করতে হয়, যার ৪০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে আমদানির উৎস বহুমুখী করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কর কমিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করছে সরকার। চলতি সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিi-এর সরকার দাবি করেছে, দেশে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাস মজুদ রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ভাঙার আশঙ্কা তেহরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন। ইরানের প্রস্তাবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকারের দাবি ছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, নতুবা ইরানকে “ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হবে”। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি বন্ধ না করলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। ফলে পরিস্থিতি এখন দুটি সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে— এক. দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি অচলাবস্থা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। দুই. নতুন করে সামরিক সংঘাত, যা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুদ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ ট্রাম্প প্রশাসন যদিও ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের খবর অস্বীকার করছে, তবে একাধিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারও চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বাড়তি তৎপরতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, বেইজিং এই সংঘাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করছে চীন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : ইরানের প্রভাবশালী সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোহসেন রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জলদস্যু’ হিসেবে অভিহিত করে হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন বাহিনীর ‘কবরস্থানে’ পরিণত করার হুমকি দিয়েছেন। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই “বিশ্বের একমাত্র জলদস্যু, যাদের বিমানবাহী রণতরী রয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এমন যে তারা শত্রু যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত মাসে একটি মার্কিন F-15E Strike Eagle যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনা, যার ধ্বংসাবশেষ ইসফাহানে পড়েছিল বলে দাবি করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, তাদের বাহিনীকে একই ধরনের পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কূটনৈতিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দা শাখা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের “সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে”। তারা দাবি করেছে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ শেষ করতে তেহরান একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান বদলাচ্ছে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপ। ১৪ দফা প্রস্তাব: কী রয়েছে? Al Jazeera-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অবসান। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নৌ-অবরোধের অবসান মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার আঞ্চলিক সংঘাত, বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ এছাড়া নির্ধারিত সময়ের পর ইরান পুনরায় ৩.৬ শতাংশ হারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ‘শূন্য-মজুদ নীতি’ অনুসরণের শর্তে। ইরান তার পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জব্দকৃত অর্থ পর্যায়ক্রমে মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। আলোচনার অগ্রগতি ও মধ্যস্থতা যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তবুও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও তা ভঙ্গুর। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে। অতীতে ওমান এই আলোচনায় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে। জ্বালানি বাজারে প্রভাব সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। American Automobile Association (এএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত মঙ্গলবার প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪.১৮ ডলার, যা একদিনে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথের অস্থিরতা সরাসরি জ্বালানি ব্যয় বাড়াচ্ছে। তেলের দাম নিয়ে মার্কিন প্রত্যাশা মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বর্তমান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লেও পরিস্থিতি শান্ত হলে বছরের শেষের দিকে তা কমে আসতে পারে। তার ভাষায়, “সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে তেলের দাম অনেক কম হতে যাচ্ছে।”
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন করে নাড়া দিয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও, যেখানে সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির ধারা থমকে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন ডেলিভারির জন্য ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের বেশি হয়েছে। জুলাই মাসের জন্য নির্ধারিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০৪ ডলারেরও বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যেখানে তেলের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার, তা ধীরে ধীরে বেড়ে ১১৯ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে—যা যুদ্ধ শুরুর সময়কার উচ্চমাত্রার সঙ্গে তুলনীয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার যে প্রস্তাব ইরান দিয়েছে, তা গ্রহণে ওয়াশিংটনের অনীহা থাকতে পারে। একই সঙ্গে তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই অচলাবস্থার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পড়ছে। দেশটির অটো ক্লাব এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গড় গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১৮ ডলারে পৌঁছেছে—যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা খরচে চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে ধৈর্যচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের বিশ্লেষক মোহাম্মদ এলমাসরি মনে করেন, “সময় এখন আর কারো পক্ষেই নেই। ইউরোপীয় দেশগুলো ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।” জার্মান চ্যান্সেলরের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইরান আলোচনায় দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে—এমন মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের চাপের মুখে রয়েছে। অনেক মিত্রই মনে করছে, বর্তমান সংকট সমাধানে ওয়াশিংটন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে এবং এটি মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ক্রমেই কিছু মিত্র দেশের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন এক ঘটনা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত এক রুশ ধনকুবেরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিলাসবহুল সুপারইয়ট ‘নর্ড’ সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ অতিক্রম করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৪২ মিটার দীর্ঘ এই ইয়টটি দুবাই থেকে যাত্রা করে ওমানের রাজধানী মাসকাটে পৌঁছায়। প্রায় ৫০ কোটি ডলার মূল্যের এই নৌযানটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে মালিকানা ভিন্ন নামে নিবন্ধিত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে আগের তুলনায় কম জাহাজ চলাচল করছে। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎই এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে—যুদ্ধবিরতির সময় পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখবে ইরান। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা যায়, লেবাননকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির সময়কাল জুড়ে নির্ধারিত সমন্বিত রুট ব্যবহার করে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথটি বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয় এবং বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা দিনের শুরুতে ৯৮ ডলারের বেশি ছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত নাইমেক্স লাইট সুইট ক্রুডের দামেও উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। সংঘাত শুরুর আগে যেখানে তেলের দাম ৭০ ডলারের নিচে ছিল, সেখানে মার্চের শুরুতে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং মাসের শেষে ১১৯ ডলারে পৌঁছায়—যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর বাজারের উচ্চমাত্রার সংবেদনশীলতাকে স্পষ্ট করে। শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও এই ঘোষণার প্রভাব পড়েছে। ইউরোপের প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে প্যারিসের সিএসি ও ফ্রাঙ্কফুর্টের ডিএএক্স দুই শতাংশের বেশি বেড়েছে। লন্ডনের এফটিএসই সূচকেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন শুরুর প্রথম কয়েক মিনিটেই ডাও জোনস সূচক ১.৩ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সংঘাতের পটভূমি চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়। ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জেনেভায় আলোচনা চলাকালেই এই হামলা চালানো হয়। প্রায় ৩৯ দিন ধরে চলা এই সংঘাতের পর ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের পারস্পরিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতা হয়নি। মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া হামলায় এ পর্যন্ত ২,০৭৬ জন নিহত এবং ২৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই দিনে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কৌশলগত বার্তা নাকি সাময়িক পদক্ষেপ? বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে। এর মাধ্যমে ইরান একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগ্রহী—এমন বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোরও চেষ্টা করছে। তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণের ওপর। বর্তমান পরিস্থিতি তাই এক ধরনের ‘অস্থায়ী স্থিতিশীলতা’—যেখানে বাজারে স্বস্তি ফিরলেও মাটির নিচে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন নৌ অবরোধ, ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং চীন–রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অবস্থান—সব মিলিয়ে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। অবরোধের নেপথ্য ও সামরিক বাস্তবতা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের প্রধান বন্দরগুলো কার্যত অবরুদ্ধ। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ১৫টি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, একটি সুপার ক্যারিয়ার, ১১টি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ১০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি—ইতোমধ্যে অন্তত ছয়টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও কিছু সূত্র বলছে একটি জাহাজ অবরোধ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে সেটিও এখন প্রণালির ভেতরে আটকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০% এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২৫% এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—সংকট দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পরিবহন, খাদ্যপণ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে। চীন-রাশিয়া ফ্যাক্টর চীন, যা ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা, এই অবরোধে সরাসরি চাপে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুযায়ী, বেইজিং আর ইরান থেকে তেল আমদানি করতে পারবে না। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বেইজিং সফরে ঘোষণা দিয়েছেন—রাশিয়া চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে প্রস্তুত এবং দুই দেশের সম্পর্ক অটুট থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়; বরং চীনা জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ানোর কৌশল, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে আংশিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। ইরানের পাল্টা অবস্থান ইরান এই অবরোধকে সরাসরি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দেশটির দাবি, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে; কেবল শত্রুপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। ইরানের তথ্যমতে, গত ৪০ দিনে তাদের ৩৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে এবং ২০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন—যা তারা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আইএমও বিতর্ক: নতুন কূটনৈতিক সংঘাত হরমুজ প্রণালিতে ‘নিরাপদ সামুদ্রিক করিডর’ তৈরির প্রস্তাব ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছেআন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থাপিত এই প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। আইএমও লিগ্যাল কমিটির বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধি পুরিয়া কলিভান্দ বলেন, প্রস্তাবটি “আইনগতভাবে ভিত্তিহীন” এবং “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজে কোনো করিডর প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরানের সম্মতি অপরিহার্য—কারণ এটি অঞ্চলের প্রধান উপকূলীয় রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বনাম আঞ্চলিক বাস্তবতা ইরানের অভিযোগ—যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে এই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি করেছে, এবং কিছু উপসাগরীয় দেশ তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এই আগ্রাসনে সহায়তা করছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল—যার লক্ষ্য ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব বজায় রাখা। বর্তমান পরিস্থিতি একাধিক সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে: * সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে * চীন–রাশিয়া জোট আরও শক্তিশালী হতে পারে * অথবা কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন পথ তৈরি হতে পারে তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালির এই সংকট কেবল আঞ্চলিক নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আগামী দিনগুলোতে বেইজিং, মস্কো এবং তেহরানের সিদ্ধান্ত—এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ—নির্ধারণ করবে বিশ্ব কোন পথে এগোবে: সংঘাতের দিকে, নাকি সমঝোতার দিকে।
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিরা—হরমুজ প্রণালি—এখন কার্যত অবরুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-এর ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা এই সংকটকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য সংস্থা ইউএনসিটিএডি-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে—এটি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি “সিস্টেমিক শক”। জাহাজ চলাচল: এক মাসে ৯৫% পতন ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করত, মার্চে তা নেমে এসেছে মাত্র ৬টিতে। এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটি বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তেল ও গ্যাস সরবরাহে সরাসরি ধাক্কা বিকল্প রুটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি বন্দর, বিমান কার্গো ও লজিস্টিকসে চেইন-রিঅ্যাকশন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ? পারস্য উপসাগরকে বিশ্ব মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ, এখানে বাধা মানে— ইউরোপে জ্বালানি সংকট দক্ষিণ এশিয়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু: সামরিক ঝুঁকি বনাম কূটনৈতিক অচলাবস্থা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ড্রোন, মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ফলে: কোনো দেশ সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে এগোতে চাইছে না বীমা প্রিমিয়াম ও ঝুঁকি ব্যয় আকাশচুম্বী বাণিজ্যিক শিপিং কোম্পানিগুলো রুট এড়িয়ে যাচ্ছে কূটনৈতিক উদ্যোগ: লন্ডনের বৈঠক কিয়ার স্টারমার-এর উদ্যোগে যুক্তরাজ্য একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছে, যেখানে প্রায় ৩৫টি দেশ অংশ নিচ্ছে। সভাপতিত্ব করবেন ইভেট কুপার। আলোচনার মূল বিষয়: নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা জরুরি পণ্য সরবরাহ পুনরায় চালু যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি: নতুন ভূ-রাজনৈতিক বার্তা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়—এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট বলেছেন: “এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমেরিকার কাজ নয়।” এই অবস্থান: ন্যাটোর ভেতরে বিভাজন বাড়াচ্ছে ইউরোপকে স্বনির্ভর নিরাপত্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বৈশ্বিক নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি করছে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া: বলপ্রয়োগ নয়, সমন্বয় ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেছেন: বলপ্রয়োগে সমাধান “বাস্তবসম্মত নয়” নৌবাহিনী সরাসরি হামলার ঝুঁকিতে পড়বে যুদ্ধবিরতির পর ইরানের সঙ্গে সমঝোতাই একমাত্র পথ অর্থনৈতিক অভিঘাত: সামনে কী আসছে? ইউএনসিটিএডি সতর্ক করেছে: সম্ভাব্য ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি স্থায়ী বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি → পণ্যের দাম বাড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সবচেয়ে ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়া ইউরোপ ভবিষ্যৎ চিত্র: তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্য ১. দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার বাজারে স্বস্তি ২. দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকবে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি ৩. সামরিক সংঘাত বিস্তার সরাসরি যুদ্ধ → বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ধস হরমুজ প্রণালীর এই সংকট এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়—এটি বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানা এক বহুমাত্রিক সংকট। কূটনীতি, সামরিক কৌশল এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা—এই তিনের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বিশ্ব কি সংঘাতের পথে এগোবে, নাকি সমন্বিত কূটনীতির মাধ্যমে এই শিরা আবার সচল হবে?
ইত্তেহাদ নিউজ ডেস্ক : ভারত মহাসাগরের উন্মুক্ত জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, তারা “অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪” নামে এই হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ‘আর্লি বার্ক’ শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার। ইরানি সূত্র অনুযায়ী, হামলাটি ছিল দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারির ফল। যুদ্ধজাহাজটি যখন সমুদ্রে একটি সাপ্লাই জাহাজের সঙ্গে জ্বালানি নেওয়ার সময় স্থির অবস্থায় ছিল, তখনই আঘাত হানা হয়—যে সময়টিকে সামরিক ভাষায় সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দ্বিমুখী ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল এই হামলায় ব্যবহৃত হয় দুটি ভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র— ‘গদ-৩৮০’: একটি হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ‘তালাইয়েহ’: সমুদ্রপৃষ্ঠ ঘেঁষে চলা ক্রুজ মিসাইল বিশ্লেষকদের মতে, এই সমন্বিত হামলা আধুনিক ‘Aegis’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে, কারণ এটি একসঙ্গে আকাশ ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়। ক্ষয়ক্ষতি ও প্রতিক্রিয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ডেস্ট্রয়ারটির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাপ্লাই জাহাজটিতে থাকা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি থেকে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। তবে এই ঘটনার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পেন্টাগন । বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই কৌশলগত নীরবতা অবলম্বন করে। সংঘাতের বিস্তার এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই ইসরায়েলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তাদের দিকে ছোড়া বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ইরান অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলের প্ররোচনাতেই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজন হলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তারা প্রস্তুত। অন্যদিকে, ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। অর্থনৈতিক প্রভাব এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকলেও এর সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে। জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছানোয় দেশটিতে ‘ন্যাশনাল এনার্জি ইমার্জেন্সি’ বা জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) এক নির্বাহী আদেশে এই ঘোষণা দেন তিনি। এতে বলা হয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইন তাদের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৮ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে থাকে। কিন্তু চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশটিতে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সরকার বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করেছে। এর আওতায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি জ্বালানি আমদানি, মজুত বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা সম্ভব হবে। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এবং মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ফিলিপাইনের জ্বালানি মন্ত্রী শ্যারন গেরিন জানিয়েছেন, বর্তমান ব্যবহারের হারে দেশটির হাতে মাত্র ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অথবা নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই জরুরি অবস্থা বহাল থাকবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু ফিলিপাইন নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। মূল্যস্ফীতি কমছিল, মর্টগেজ সুদের হার ধীরে ধীরে নেমে আসছিল এবং জ্বালানির দামও ছিল অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত সেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়—মার্কিন অর্থনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘ হবে না। তার ভাষায় এটি একটি “স্বল্পমেয়াদি অভিযান”। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা, তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং ইরানের কঠোর অবস্থান ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে। যুদ্ধের শুরু ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। ট্রাম্পের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে প্রায় ৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্র। এই ঘটনাকে ঘিরেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তবে ট্রাম্পের দাবি—ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আজ আমরা জানি তারা কোথায় কোথায় ড্রোন তৈরি করে। সেই সব স্থাপনায় একের পর এক হামলা চলছে।” তার মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখন “প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।” ইরানের পাল্টা বার্তা ট্রাম্পের বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাঈনি বলেন, “এই যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা ওয়াশিংটন নয়, তেহরানই নির্ধারণ করবে।” তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান আরও বেশি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। নাঈনির ভাষায়, “আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড এখন এক টনেরও বেশি।” তিনি আরও বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে “সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে।” তেলের বাজারে বড় ধাক্কা এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেলবাজারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এটি ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে একটি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান হুমকি দিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। এমনকি আইআরজিসি বলেছে, “অঞ্চল থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।” মার্কিন অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব মার্কিন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গত এক সপ্তাহেই প্রতি গ্যালনে গ্যাসের দাম ৩৪ সেন্ট বেড়ে গেছে। এই বৃদ্ধি ট্রাম্পের দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে ট্রাম্প নিজে বলেছেন তিনি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি বলেন, “যদি গ্যাসের দাম বাড়ে, তাহলে বাড়ুক।” কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়া মানে শুধু জ্বালানি খরচ নয়—এটি পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা এই যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। জানুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যসূচক বছরে মাত্র ২.৪ শতাংশ বেড়েছিল, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদরা আশা করেছিলেন ২০২৬ সালের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নেমে আসবে। কিন্তু জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এ বছর মূল্যস্ফীতি আবার ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর কারণ— জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে বিমান ভাড়া বাড়বে পরিবহন খরচ বাড়লে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক শিল্পপণ্যের দাম বাড়বে ফলে পুরো অর্থনীতিতেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে। ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা মার্কিন অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশই নির্ভর করে ভোক্তা ব্যয়ের ওপর। কিন্তু দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ খরচ কমিয়ে দেয়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক গতি কিছুটা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং জানুয়ারিতে খুচরা বিক্রি ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে বেশি হারে কমেছে। মুডিজ অ্যানালিটিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডি বলেন, “গ্যাসের দাম যদি গ্যালনপ্রতি ৩ ডলার থেকে ৪ ডলারে উঠে যায়, তাহলে মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।” তার মতে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবাসন বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা যুদ্ধের আগে মার্কিন আবাসন বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরছিল। মর্টগেজ সুদের হার ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বেশি সুদ দাবি করছেন। ফলে ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন বেড়েছে এবং এর সঙ্গে মর্টগেজ সুদের হারও আবার ৬ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। এটি বাড়ি কেনার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। গড় পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম টানা বাড়তে থাকলে সাধারণ পরিবারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। মার্ক জ্যান্ডির মতে, “প্রতি ব্যারেল তেলের দাম টানা ১০ ডলার বাড়লে গড় মার্কিন পরিবারের বছরে প্রায় ৪৫০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হবে।” এটি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপ সৃষ্টি করবে। হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে— বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়বে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা ট্যাংকারগুলোর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা দিচ্ছে এবং সামরিক সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, “আমি কোনো সন্ত্রাসী শাসনকে বিশ্বকে জিম্মি করে তেল সরবরাহ বন্ধ করতে দেব না।” যুদ্ধ কতদিন চলবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই যুদ্ধ কতদিন চলবে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। কিন্তু অন্যরা বলছেন সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বলেন, “হয়তো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেলের দাম আবার কমে যাবে। আবার এমনও হতে পারে কয়েক মাস পরও আমরা একই অবস্থায় থাকব।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তখন আমরা চাকরি কমানো এবং সম্ভাব্য মন্দা নিয়ে কথা বলব।” মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনীতি এই সংঘাতের একটি বড় রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অর্থনীতি যদি খারাপ হতে শুরু করে— মূল্যস্ফীতি বাড়ে গ্যাসের দাম বাড়ে চাকরি কমে তাহলে তা ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অসন্তোষ বাড়লে তা রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু সামরিক লড়াই নয়—এটি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে তেলের বাজার স্থিতিশীল হতে পারে এবং অর্থনৈতিক চাপও কমতে পারে। কিন্তু সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে— বিশ্ববাজারে তেলের দামে মার্কিন মূল্যস্ফীতিতে আবাসন বাজারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো—এই যুদ্ধ কতদিন চলবে। কারণ সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বিশ্ব অর্থনীতির আগামী পথ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিশ্ব অর্থনীতি ও খোদ মার্কিন জনগণের পকেটে তার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের খনি ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটের নিয়ন্ত্রণ থাকা ইরানের ওপর আক্রমণ করলে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর জানিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের ‘১০ দিনের সময়সীমা’র হুঁশিয়ারিতে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়চড় করে বাড়ছে। বুধবার বিশ্ববাজারের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম গত এক মাসে ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার বেড়েছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আবাসন খাতের মন্দার কারণে রিপাবলিকানরা এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে তেলের দাম বাড়লে তা সাধারণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। ট্রাম্প গত কয়েক মাস ধরে তেলের দাম কমার যে কৃতিত্ব দাবি করে আসছিলেন, ইরান সংঘাত তা নস্যাৎ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ইরানের হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের বাকি অংশে তেল পাঠানোর একমাত্র পথ এটি। সম্প্রতি ইরান সামরিক মহড়ার জন্য এই পথ আংশিক বন্ধ করায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৫ ডলার বেড়ে গিয়েছিল। টর্টয়েজ ক্যাপিটালের পোর্টফোলিও ম্যানেজার রব থামেল সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, তেল রফতানি থেকে আয়ের ওপর ইরান সরকার নিজেই নির্ভরশীল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ২ দশমিক ৯২ ডলার। তেলের দাম ব্যারেলে ৮০ ডলার হলে পেট্রোলের দাম ৩ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। যদিও ট্রাম্প তেলের দাম কমার কারণে সাধারণ মানুষের বছরে ১০০ থেকে ২০০ ডলার সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করেন, কিন্তু তার আরোপিত শুল্কের কারণে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে গড়ে ১ হাজার ডলার বাড়তি কর গুনতে হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টুটল বলেন, কম দামে পেট্রোল পাওয়াটা আরামদায়ক ছিল, কিন্তু দাম এখন ধীরে ধীরে আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগে তেলের দাম বাড়লে মার্কিনীদের অর্থনৈতিক অসন্তোষ আরও চরম আকার ধারণ করবে। ওপেক-এর তথ্যমতে, ইরান প্রতিদিন গড়ে ৩২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বিশ্ব উৎপাদনের ৪ শতাংশ। বিপুল নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান বড় ছাড় দিয়ে তেল রফতানি অব্যাহত রেখেছে। এখন ট্রাম্পের একটি সামরিক পদক্ষেপ যদি এই সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে তার ফলাফল ইরানের চেয়েও ট্রাম্পের নিজের দেশের ভোটারদের কাছে বেশি তিক্ত হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।