ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রণালির আশপাশে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিই পুনরায় সচল করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, তেহরানের যুদ্ধপূর্ব অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও অক্ষত রয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এখানকার যেকোনো সামরিক অস্থিতিশীলতা সরাসরি আঘাত হানতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। মার্কিন দাবির সঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অসামঞ্জস্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৯০ শতাংশ পুনরায় সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে। এসব স্থাপনায় বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গেলে মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এই তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের গত কয়েক সপ্তাহের বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি করেছে। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের নৌবাহিনী “পুরোপুরি ধ্বংস” হয়ে গেছে। পরে তিনি আরও বলেন, ইরানের বিমানবাহিনী, রাডার ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানার বড় অংশ নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীপিট হেগসেথ। তবে নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৩ হাজার হামলার পরও অক্ষত ইরানের বড় অংশের সামরিক সক্ষমতা মার্কিন ও মিত্র গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৫ দিনে ১৩ হাজারের বেশি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হলেও দেশটির ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনও টিকে আছে। এছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের হাতে এখনও কয়েক হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ রয়েছে, যা তাদের মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী(আইআরজিসি)ও একই ধরনের দাবি করছে। বাহিনীটির এক মুখপাত্র সম্প্রতি বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত তাদের “পুরোনো মজুদ” থেকেই মাত্র ৩ হাজার ৬০০ ড্রোন এবং ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানের এক সংসদ সদস্য তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি-কে বলেছেন, বিদ্যমান মজুদ দিয়েই “বছরের পর বছর যুদ্ধ চালানো সম্ভব”। হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির বড় অংশ এই নৌপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০ থেকে ৭৫ ডলারের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ১০০ থেকে ১১০ ডলারের ঘরে অবস্থান করছে। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্তর। এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। ভারতের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৯ শতাংশ আমদানি করতে হয়, যার ৪০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে আমদানির উৎস বহুমুখী করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কর কমিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করছে সরকার। চলতি সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিi-এর সরকার দাবি করেছে, দেশে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাস মজুদ রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ভাঙার আশঙ্কা তেহরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন। ইরানের প্রস্তাবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকারের দাবি ছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয় একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, নতুবা ইরানকে “ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হবে”। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি বন্ধ না করলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। ফলে পরিস্থিতি এখন দুটি সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে— এক. দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি অচলাবস্থা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। দুই. নতুন করে সামরিক সংঘাত, যা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুদ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ ট্রাম্প প্রশাসন যদিও ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের খবর অস্বীকার করছে, তবে একাধিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারও চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বাড়তি তৎপরতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, বেইজিং এই সংঘাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করছে চীন।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য অস্থিরতা বাড়তে থাকায় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্থল ও পাইপলাইনভিত্তিক বাণিজ্য করিডোর গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরাকের বহুল আলোচিত ২৪ বিলিয়ন ডলারের ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ প্রকল্পকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরাকের ডেভেলপমেন্ট রোড: নতুন ভূরাজনৈতিক করিডোর মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম বলছেন, পরিকল্পনাটি ইরাকের গ্র্যান্ড ফাও বন্দর থেকে শুরু হয়ে তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পরিবহন করিডোর তৈরির দিকে এগোচ্ছে। তার মতে, “যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা।” এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বসরা অঞ্চলের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধি পাবে এবং ইরান-নিয়ন্ত্রিত জলপথ এড়িয়ে বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইরাকের ওপর তেহরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও হ্রাস পেতে পারে। উপসাগরজুড়ে বিকল্প অবকাঠামোর বিস্তার ইরাকের বাইরে পুরো অঞ্চলে জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি করতে একাধিক বড় প্রকল্প এগোচ্ছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পেট্রোলাইন বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল পরিবহন সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং এর সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিসিওপি পাইপলাইনও পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দ্বিতীয় একটি লাইন চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তুরস্কের জাঙ্গেজুর ও তথাকথিত মিডল করিডোর প্রকল্পও ইরানকে পাশ কাটিয়ে ককেশাস অঞ্চলের মাধ্যমে ইউরোপমুখী নতুন বাণিজ্য পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকল্প পুরোপুরি কার্যকর হতে আরও চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। হরমুজ: এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র নয় বিশ্লেষক সেলুমের মতে, হরমুজ প্রণালি এখনো বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে আর একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তার ভাষায়, চলমান সংঘাত ও আঞ্চলিক ঝুঁকির কারণে “এই পরিবর্তন স্থায়ী হতে পারে” এবং জ্বালানি রুটের বৈচিত্র্য আরও বাড়বে। ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের তেল অবকাঠামো বা স্থাপনায় হামলা হলে, সেই হামলাকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, কোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব “সমপরিমাণ নয়, বরং চারগুণ” আকারে দেওয়া হবে। তার ভাষায়, “যদি আমাদের একটি তেল শোধনাগারে হামলা হয়, আমরা চারটি শোধনাগারে হামলা চালাব।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য ও অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত এই উত্তেজনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির কারণে দেশটির জ্বালানি সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্প আরও বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে ইরানের তেল পরিবহন ব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তার এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের রাজনৈতিক মহল থেকে পাল্টা বক্তব্য আসে, যেখানে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলার সক্ষমতার কথা তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক বার্তা ও বাজারের চাপ ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্স-এ এক পোস্টে জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নিয়ে একটি প্রতীকী সমীকরণ তুলে ধরেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, হরমুজ, বাব এল-মান্দেব ও বিভিন্ন পাইপলাইনকে কাজে লাগিয়ে ইরান বিশ্ববাজারে চাপ তৈরি করতে সক্ষম। তিনি সতর্ক করে বলেন, আসন্ন গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে জ্বালানি চাহিদা বাড়বে এবং তখন হরমুজে অস্থিরতা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্য হরমুজ সংকট ঘিরে এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডোর গড়ে ওঠার চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা—দুই প্রবণতা একসঙ্গে এগোচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছর এই অঞ্চল শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য মানচিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে।
ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামুদ্রিক মুখোমুখি অবস্থান আরও তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারত মহাসাগরে মার্কিন অভিযানে জাহাজ জব্দ মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরে অভিযান চালিয়ে ইরান থেকে তেল পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে একটি রাষ্ট্রহীন তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। জাহাজটির নাম এম/টি *ম্যাজেস্টিক*। স্থানীয় সময় ২৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, জাহাজটি কোনো স্বীকৃত জাতীয়তার অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল না এবং ইরান-সম্পর্কিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হয়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে—এমন জাহাজ ও নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এক ডজনেরও বেশি জাহাজ আটক করেছে, যদিও এসব অভিযান মূলত ইরানের উপকূলবর্তী জলসীমার বাইরে, ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী অঞ্চলে পরিচালিত হয়েছে। এর আগে ২১ এপ্রিল এম/টি *টিফানি* নামের আরেকটি জাহাজ জব্দের কথাও জানায় পেন্টাগন। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জাহাজ জব্দ অন্যদিকে, ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ভারতমুখী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ—‘ইপামিনোন্ডাস’ ও ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’—জব্দ করেছে। ইরান-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম নূর নিউজ প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানি পতাকাবাহী দ্রুতগতির স্পিডবোট জাহাজগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং সশস্ত্র নৌসদস্যরা জাহাজে উঠে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছে। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী: * ‘ইপামিনোন্ডাস’ সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় সেটির দিকে গুলি ছোড়া হয় * ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ ইসরায়েল-সম্পর্কিত মালিকানাধীন * জাহাজগুলো নৌ-নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করছিল তারা আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়ম ভঙ্গ বা নিরাপদ নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নির্দেশনা এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা জোরদারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেন— মাইন স্থাপনের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট যেকোনো নৌযানকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে ধ্বংস করতে হবে। তিনি আরও জানান: * মাইন অপসারণ কার্যক্রম তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে * প্রণালিতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পেন্টাগনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পুরো হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ের অস্থিতিশীলতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি প্রধান রুট হিসেবে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামুদ্রিক পদক্ষেপ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। জাহাজ জব্দ, সামরিক সতর্কতা এবং সম্ভাব্য মাইন সংকট—সব মিলিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান এই অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বর্তমানে প্রণালির উভয় পাশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইরানের অবরোধ, হুমকি এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় পারাপারের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে এখনো কৌশলগতভাবে এগিয়ে রয়েছে ইরান। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে—ভৌগোলিক অবস্থান, অপ্রচলিত সামরিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। ভৌগোলিক সুবিধা পারস্য উপসাগরের এই প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২৪ মাইল প্রশস্ত। ফলে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সংকীর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়। এই ‘চোকপয়েন্ট’ পরিস্থিতি ইরানকে সহজে নজরদারি ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা দেয়। ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখা ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিও প্রতিরক্ষা এবং আক্রমণ—উভয় ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অন্যতম বড় শক্তি তার অপ্রচলিত সামরিক কৌশল। ড্রোন, দ্রুতগামী ছোট নৌযান, বিস্ফোরকবোঝাই মানববিহীন নৌযান এবং সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে তারা বড় নৌবাহিনীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া সাধারণ জাহাজ থেকেও মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা ইরানের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু জাহাজকে নিরাপদে পারাপারের জন্য অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বৈশ্বিক উদ্বেগ হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা দ্রুত সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন জাহাজে বিপুল পরিমাণ ইরানি অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা যেকোনো সময় বাজারে প্রবেশ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইরানি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড) সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় মজুদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় এবার বাজারে আসতে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন জাহাজে থাকা প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল। শনিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছেন বিশ্ব জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা। তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের সিনিয়র ম্যানেজার ইমানুয়েল বেলোস্ট্রিনো বলেন, ‘বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনের জলসীমা পর্যন্ত বিভিন্ন জাহাজে প্রায় ১৭ কোটি (১৭০ মিলিয়ন) ব্যারেল ইরানি তেল মজুদ রয়েছে।’ অন্যদিকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি এসপেক্ট গত ১৯ মার্চের এক মূল্যায়নে জানায়, সমুদ্রে থাকা ইরানি তেলের পরিমাণ ১৩০ থেকে ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল, যা মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান উৎপাদন ঘাটতির তুলনায় ১৪ দিনেরও কম সরবরাহের সমান। এশিয়া অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৬০ শতাংশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে এবং জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তেল শোধনাগারগুলো। ফলে জ্বালানি রপ্তানিও হ্রাস পাচ্ছে। এ অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। তেল কিনতে যাচ্ছে যেসব দেশ ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে চীন ছিল ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা। গত বছর চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো প্রতিদিন গড়ে ১৩ দশমিক ৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে। চীন ছাড়াও আগে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, গ্রিস, তাইওয়ান ও তুরস্ক ছিল ইরানি তেলের প্রধান আমদানিকারক। কেপলার জানায়, চীন গত বছর দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে। যা নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক দেশ এই তেল এড়িয়ে চলার সুযোগে সম্ভব হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর ভারত রুশ তেল সংগ্রহ করেছিল। অন্যান্য বড় এশীয় আমদানিকারকদের তুলনায় ভারতের তেলের মজুদ কম হওয়ায় দেশটি ইরানি তেল কেনার পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভারতের শোধনাগারের তিনটি সূত্র বলছে, তারা ইরানি তেল কিনতে আগ্রহী। এ বিষয়ে বর্তমানে সরকারের নির্দেশনা ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পেমেন্ট শর্তাবলির মতো বিষয়গুলোর স্বচ্ছতার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। আমদানিতে যে জটিলতা তবে ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তেল ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো—কিভাবে অর্থ প্রদান করা হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এবং সমুদ্রে থাকা তেলের একটি বড় অংশ পুরোনো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ জাহাজে বহন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কিছু পূর্ববর্তী ক্রেতা ইরানি তেল কম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল বলে দুটি শোধনাগার সূত্র জানিয়েছে। তবে ২০১৮ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে ইরানি তেলের বড় একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের জেরে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের দাবি— ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি তাদের সামরিক অভিযানের অংশ, যার নাম ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’। হাইফার তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলার দাবি ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সশস্ত্র বাহিনীর সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নতুন হামলায় ইসরায়েলের জ্বালানি অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী হামলার লক্ষ্য ছিল— ইসরায়েলের হাইফা শহরের তেল ও গ্যাস শোধনাগার জ্বালানি মজুদ ট্যাংক তেলআবিবের কাছাকাছি একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ইরানি সামরিক বাহিনী বলছে, এই হামলা ছিল তাদের সামরিক অভিযানের ৩৩তম ধাপ। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে তা ইসরায়েলের শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পাল্টা হামলার যুক্তি ইরানের সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের তেল ডিপোতে ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে— “ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাব দিতেই এই প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযান।” ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোও দাবি করছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল কৌশলগত অবকাঠামো, বেসামরিক এলাকা নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আরেকটি ঘটনা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিরুদ্ধে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে এই ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে— দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে নাগরিক ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে যেকোনো হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত দেশটি এখনো পর্যন্ত কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানোর অভিযোগ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে আরেকটি খবর। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ইরান হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানো শুরু করেছে। সংবাদমাধ্যম CNN-কে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী— গত কয়েক দিনে কয়েক ডজন নৌমাইন স্থাপন করা হয়েছে ইরানের মাইন স্থাপনকারী জাহাজের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে চাইলে হাজার হাজার মাইন বসানোর সক্ষমতা রয়েছে এই তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে— বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় প্রতিদিন কয়েক কোটি ব্যারেল তেল ও গ্যাস ট্যাংকার চলাচল করে যদি এখানে মাইন পাতা হয় বা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে— বৈশ্বিক তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে গালফ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে বিপ্লবী গার্ডের হুঁশিয়ারি গত সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) এক সতর্কবার্তায় বলেছিল— “হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো শত্রু জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে ধ্বংস করা হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য শুধু সামরিক হুমকি নয়, বরং আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে। ইরানের নৌ সক্ষমতা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌবাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ড যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তাদের কাছে রয়েছে— নৌমাইন দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা উপকূলভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন বোট এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে তারা খুব দ্রুত ওই অঞ্চলে বড় ধরনের নৌ অবরোধ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের উদ্বেগ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে— গালফে মার্কিন নৌবহর কাতার ও বাহরাইনে সামরিক ঘাঁটি সৌদি আরব ও আমিরাতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই কারণে হরমুজ প্রণালীতে কোনো সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। তেলের বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি হরমুজ প্রণালীতে সংঘাত বাড়ে, তবে বৈশ্বিক তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো— আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি,জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত,শিপিং বীমা খরচ বেড়ে যাওয়া,গালফ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা? বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, উত্তেজনা দ্রুত বাড়লেও এখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে তিনটি বিষয় পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে— সরাসরি ইরান-ইসরায়েল সংঘাত গালফ রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি যদি এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আলোচনার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে— ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র গালফ সহযোগিতা পরিষদ তারা উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে— ১. সীমিত সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে পারে ২. কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে ৩. গালফ অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে তবে যদি হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।