মামুনুর রশীদ নোমানী,বরিশাল : বরিশাল প্রধান ডাকঘরের সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল আব্দুর রশিদ-এর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ স্থানীয় কর্মচারী ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তিনি বিগত সরকারের সময় তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক-এর প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, রেস্টহাউজের ভাড়া পরিশোধ না করা এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের বিষয়ও সামনে এসেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা প্রদান, ঘুষের বিনিময়ে বদলি বাণিজ্য, তদন্তের নামে অর্থ আদায় এবং অধীনস্ত কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের মতো ঘটনাও ঘটেছে তার মাধ্যমে। কর্মচারীদের একটি অংশ দাবি করেন, নিয়মিত ছুটি ছাড়াই তিনি নিজ জেলা ঝিনাইদহে যাতায়াত করতেন, যা সরকারি বিধি লঙ্ঘনের শামিল। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত রেষ্টহাউজের ভাড়া পরিশোধ করেননি।নির্ধারিত বাসা থাকলেও তিনি সেখানে না থেকে রেষ্ট হাউজে বিনা ভাড়ায় বিদ্যুৎ,পানি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহন করেছেন। ব্যাংক এশিয়া পোষ্ট অফিসে নিষিদ্ধ থাকলেও তিনি নিয়মিত বাজার ও অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে পোষ্ট অফিসের অভ্যান্তরে বসে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে "প" অদ্যক্ষরের এক নারীকে কু প্রস্তাব দেয়ার কারনে তিনি পোষ্ট অফিস ত্যাগ করেছেন। সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল আব্দুর রশিদ-এর বিরুদ্ধে বাজেটের টাকা থেকে বিদ্যুৎ বিল,ও বাজার করার অভিযোগও রয়েছে। ভুয়া ভাউচার দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাত, কর্মচারীদের সাথে খারাপ আচরনে সকলেই অতিষ্ঠ। আব্দুর রশিদ-এর সাফ কথা আমাকে তেল দিয়ে চলতে হবে।আমার কথাই আদেশ। সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল আব্দুর রশিদ পোষ্ট অফিসকে বানিয়েছেন ঘুষের আখড়া। তার কাছে ঘুষই প্রধান।তিনি একই লোককে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদলী করছেন। যে সেভিংস বিভাগে আত্মসাৎ সেখানেই নুরুল কবির ও তানজিম হোসেনকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বদলী করা হয়েছে। অফিসের মধ্যে তিনি নুরুজ্জামান ও মশিউর রহমানকে নিজের লোক বনিয়েছেন, ফলে তাদের কোন বদলী নাই। কিছু কর্মচারীর দাবি, বাজেটের অর্থ থেকে বিদ্যুৎ বিল ও ব্যক্তিগত খরচ মেটানো, ভুয়া ভাউচার ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ এবং কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন তদন্তের মাধ্যমে হয়রানি করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুর রশিদ-এর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এক বার আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে। নতুন সরকারের আগমন ও অফিসিয়াল বদলির আদেশ বাতিলের দ্রুত ঘটনাচক্রে সন্দেহ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি সূত্র জানায়, বিআরটিএর উপ-পরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিক ৭ মার্চ স্বাক্ষরিত আদেশে মো. রফিকুল ইসলামকে চট্টগ্রাম ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেল থেকে রাজশাহীর বিভাগীয় অফিসে বদলি করেছিলেন। তবে কেবল একদিন পরেই, বিআরটিএর আরেক উপ-পরিচালক হেমায়েত উদ্দিন স্বাক্ষরিত নতুন আদেশে বদলি বাতিল করা হয়। কর্মচারীদের প্রশ্ন, কীভাবে একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অন্য একজন কর্মকর্তার আদেশ এত দ্রুত উল্টো যায়। ঘুষ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বদলি বাণিজ্য, রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি এবং ঘুষ আদায়ে জড়িত। তার কথিত চাচার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় তার “শাহাবাস্তি বিজনেস সেন্টার” নামের অফিসটি সিন্ডিকেটের হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত। সূত্র জানায়, এই অফিস থেকে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরা ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সরকারি সেবার স্বাভাবিক স্রোত ব্যাহত করছে। রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে: সিএনজি অটো-রিকশা রেজিস্ট্রেশনের নামে বড় অংকের ঘুষ আদায়। মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের জালিয়াতি। সিন্ডিকেট গঠন ও দালাল চক্রের মাধ্যমে নিয়মিত অবৈধ আয়। আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল সম্পত্তি অর্জন। ঘটনার সময়রেখা: তারিখ ঘটনা স্বাক্ষরকারী উপ-পরিচালক ৭ মার্চ ২০২৬ রফিকুল ইসলামকে চট্টগ্রাম ঢাকা মেট্রো-৪ থেকে রাজশাহী বদলি তানভীর আহমেদ সিদ্দিক ৯ মার্চ ২০২৬ বদলি আদেশ বাতিল হেমায়েত উদ্দিন সময়ের রেখা ও প্রমাণ ২০১৫: চট্টগ্রাম মেট্রো-১ এ সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উত্তরা মোটরসের ডিলারের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ। ২০১৬: ঢাকা জেলা সার্কেলে সহকারী পরিচালক হিসেবে সিএনজি রেজিস্ট্রেশনের নামে বড় ধরনের অনিয়ম শুরু। ২০১৯ পর্যন্ত: প্রায় ৫ হাজার সিএনজি রেজিস্ট্রেশন, যেখানে অধিকাংশ মালিক ভুয়া ঠিকানার মাধ্যমে নিবন্ধন। ২০২৪: ঢাকা মেট্রো-১ থেকে বরিশাল বিভাগীয় অফিসে বদলি, এরপর বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে সিন্ডিকেট পরিচালনা। প্রশাসনিক ব্যর্থতা কেন একটি উপ-পরিচালকের আদেশ অন্য একজন উপ-পরিচালকের স্বাক্ষরে বাতিল হতে পারলো? রফিকুল ইসলামকে শুধু বদলি করা যথেষ্ট নয়, তার সিন্ডিকেট ও সম্পদের উত্থানও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও জনসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি। রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি বিভাগ প্রক্রিয়া প্রায় ঘুষের পরিমাণ মন্তব্য সিএনজি রেজিস্ট্রেশন ঢাকার নামে ভুয়া ঠিকানা ১ লাখ টাকা প্রতি রেজিস্ট্রেশন প্রায় ৫ হাজার রেজিস্ট্রেশন ২০১৬–২০১৯ মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন আর.এম মোটরস & ইন্টারন্যাশনাল শোরুম অজানা, কোটি টাকা প্রায় আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পত্তি অর্জন ফিটনেস সার্টিফিকেট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আলাদা হিসাব নেই সরকারি নিয়মের চরম লঙ্ঘন নিরাপত্তা ও আইনি প্রয়োজনীয়তা তদন্ত কমিটি গঠন, সিন্ডিকেটের উচ্ছেদ, এবং অবৈধ সম্পত্তির অনুসন্ধান জরুরি। শুধুমাত্র বদলি আদেশের মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রশাসনিক প্রভাব ও প্রশ্ন কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু বদলি করে দুর্নীতি বন্ধ হবে না। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও তদন্ত ছাড়া সরকারি সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি ক্ষোভ বাড়বে। বিআরটিএর উচ্চপর্যায় থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ধরনের সিন্ডিকেট ও ঘুষ-বাণিজ্য চক্র সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ম ও শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি। তদন্ত প্রয়োজনীয়তা সিন্ডিকেটের অবৈধ সম্পত্তি ও অর্থের উৎসের তদন্ত। ঘুষ-বাণিজ্য ও রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতির সম্পূর্ণ রিপোর্ট। কঠোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।
নীলফামারীর সদর উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার সময় প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গেলে ইউপি সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে ঘিরে ধরে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা অভিযোগ করেন, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে বরাদ্দ দেওয়ার সময় প্রতিটি প্রকল্প থেকে নির্দিষ্ট হারে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ভিজিএফের চাল বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৪০০টি কার্ড নিজের কাছে রেখে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস বেগম বলেন, তাকে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, কাজ শেষ হলেও এখনো বিল পাননি। “কাজ দেওয়ার সময় প্রশাসক অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন,” বলেন তিনি। আরেক সংরক্ষিত নারী সদস্য চম্পা রানী অভিযোগ করেন, যে সদস্যকে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে, তার কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাকে ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকার একটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমার কাছ থেকেও ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এটি নাকি তার প্রাপ্য।” ইউপি সদস্য মশিউর রহমান জানান, টিআর, কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পের প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। “আমি তাকে টাকা দিয়েছি। এছাড়া ভিজিএফ চালের ৪০০টি কার্ডও তিনি নিজের কাছে রেখেছেন। এগুলো কী করা হবে সে বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি,” বলেন তিনি। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রশাসক মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, “ইউপি সদস্যদের সঙ্গে আমার কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি। কেউ প্রমাণ করতে পারবে না আমি তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি।” তার দাবি, তাকে অবরুদ্ধ করা হয়নি। “আজ সবাই মিলে কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে,” বলেন তিনি। এদিকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ বলেন, অভিযোগগুলো তার আগে জানা ছিল না। তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা প্রদানের সময় মাত্র ৩০০ টাকা ঘুষ গ্রহণ এবং সেই তথ্য গোপন রাখতে সাংবাদিককে ২৯ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শুধাংশু কুমার সাহাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শুধাংশু কুমার সাহা কুমিল্লায় অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে এক সেবাগ্রহীতার এনআইডি সংশোধনের জন্য অবৈধভাবে ৩০০ টাকা গ্রহণ করেন। ওই সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা তার ঘুষ গ্রহণের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি প্রচার রোধ করার জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ২৯,০০০ টাকা ঘুষ প্রদানের প্রস্তাব দেন। ঘটনাটি তদন্তের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণের’ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন আইডিইএ দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক মো. ফরিদুল ইসলাম। দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করলেও তার জবাব সন্তোষজনক ছিল না। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তাকে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশনের এই কঠোর অবস্থান জিরো টলারেন্স নীতির অংশ। বরখাস্তের আগে তিনি আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়, রংপুরে সংযুক্ত ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।