ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : বরিশাল সদর উপজেলার মৃতপ্রায় লাকুটিয়া খালসহ দুটি খাল পুনঃখননের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া প্রায় ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪ টাকা শেষ পর্যন্ত ব্যয় না করে সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের সময়, প্রশাসনের ভূমিকা এবং তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও সচেতন মহলের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা ও কৃষি সংকটে ভোগা এলাকায় প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। তথ্য চাওয়ার পর কী ঘটেছিল? সাংবাদিক মোহাম্মদ আবুবকর সিদ্দীক ভূঁইয়া জানান, তিনি ৭ জুন ২০২৬ তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। তার দাবি, আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। পরে কোনো তথ্য সরবরাহ না করেই গত সপ্তাহে প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়। তিনি বলেন, "আমি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সাত দিন পর তথ্য চেয়েছিলাম। যদি আগে থেকেই টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকত, তাহলে সেটি আগে নেওয়া যেত। কিন্তু তথ্য চাওয়ার পরই কেন অর্থ ফেরত দেওয়া হলো—এটি অনুসন্ধানের বিষয়।" তার আরও প্রশ্ন, অর্থ ফেরতের পরপরই কেন বরিশাল সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছুটিতে গেলেন—এ বিষয়েও জনমনে নানা আলোচনা রয়েছে। কোন প্রকল্পে কত টাকা ফেরত? দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ইজিপিপি (EGPP) প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলার দুটি খাল পুনঃখননের জন্য মোট ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে— মরখখোলার পোল থেকে ঝড়ঝড়িয়াতলা বাজার হয়ে মাঝিবাড়ির ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার খাল খননের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ২৮ হাজার ২৩২ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না করেই পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। চরবাড়িয়া ইউনিয়নের আরেকটি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৭৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়দের ক্ষোভ স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে লাকুটিয়া খাল ভরাট হয়ে থাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ ও পানির সংকট দেখা দেয়। তাদের মতে, সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট হয়েছে। তারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, জেলার অন্য উপজেলাগুলোতে খাল খননের কাজ বাস্তবায়িত হলেও সদর উপজেলায় কেন তা সম্ভব হয়নি। "টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি"—পিআইও বরিশাল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, "গত সপ্তাহে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।" এ কথা বলেই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে প্রতিবেদকের দাবি। ইউএনওর বক্তব্য মেলেনি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা সুলতানা বর্তমানে ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিক্রিয়া এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, "এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।" জেলা প্রশাসক কী বললেন? বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকার জানান, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, "কেন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেল না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। লাকুটিয়া ও জেল খাল নিয়ে আমার পরিকল্পনা রয়েছে, যা শিগগিরই জানানো হবে।" যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি এই ঘটনার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও কেন কাজ শুরু হয়নি? তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরই কেন বরাদ্দ ফেরতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক বা কারিগরি কোনো জটিলতা ছিল কি? অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত কখন এবং কার অনুমোদনে নেওয়া হয়? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কোনো প্রশাসনিক তদন্ত হবে কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে স্থানীয়দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মহলও এখন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : রাজশাহীসহ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবার বোরো ধানের ফলন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। মাঠভরা সোনালি ধান কৃষকের ঘরে উঠলেও সেই আনন্দ এখন অনেকের কাছে লোকসানের হিসাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে এক ধরনের অদৃশ্য সিন্ডিকেট। ফলে বাম্পার ফলনের মৌসুমেও তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ বলছে, ফলন ভালো হয়েছে। খাদ্য বিভাগ বলছে, সরকার বাজারের চেয়ে বেশি দামে ধান কিনছে। কিন্তু মাঠের কৃষকরা বলছেন, সেই সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বিঘাপ্রতি লোকসান দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা কৃষক ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২২ মণ বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। অন্যদিকে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি বিঘায় চাষ খরচ হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। ধান কাটা ও মাড়াইয়ে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা যোগ হওয়ায় মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকায়। কিন্তু বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায়। সেই হিসাবে কৃষকের আয় দাঁড়াচ্ছে ২৪ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। “ধান ফলাইছি, কিন্তু লাভ পাই নাই” রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়ার কৃষক জয়নাল আবেদিন এবছর সাড়ে তিন বিঘা জমিতে উফশী জাতের বোরো চাষ করেছিলেন। তিনি জানান, কাটা-মাড়াই শেষে তার জমি থেকে ৭৩ মণ ধান পাওয়া গেছে। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা। ধান কাটার পর শ্রমিকদের সঙ্গে বিঘাপ্রতি সাত হাজার টাকা চুক্তিতে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে তার মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকায়। বর্তমান বাজারদরে ৭৩ মণ ধান বিক্রি করলে তিনি পাচ্ছেন প্রায় ৯১ হাজার ২৫০ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে তিন বিঘা জমিতে তার নিট লোকসান ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। জয়নাল আবেদিন বলেন, “ধান তো ভালোই হইছে। কিন্তু বাজারে যে দাম, তাতে খরচই উঠতেছে না।” বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে কারা? রাজশাহীর বিভিন্ন মোকাম ও হাটে কৃষকদের বড় অভিযোগ—ধানের বাজার এখন কয়েকটি বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। মোহনপুরের কৃষক মহিউদ্দিন শেখ বলেন, বড় বড় কোম্পানির এজেন্টরা প্রতি হাটবারে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে ধানের দাম ঠিক করেন। তার ভাষায়, “কৃষকের হাতে কোনো দরকষাকষির সুযোগ নাই। তারা যে দাম বলে, সেই দামে ধান বেচে বাড়ি ফিরতে হয়।” নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, একসময় এই অঞ্চলে অসংখ্য ছোট চাতাল ছিল। চাতাল মালিকরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে বড় চাল কোম্পানিগুলোর দাপটে ছোট চাতালগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আগে বাজারে প্রতিযোগিতা ছিল। এখন বড় কোম্পানির এজেন্ট ছাড়া কৃষকের আর কোনো ক্রেতা নাই।” উৎপাদন খরচ বেড়েছে, দাম কমেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচও বেড়েছে। পাশাপাশি সার ও কৃষি উপকরণের দামও ছিল চড়া। তার দাবি, “সবকিছুর খরচ বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম বাড়ে নাই।” রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষক আব্দুল মান্নানও একই অভিযোগ করেন। তার মতে, কৃষক এখন উৎপাদনের ঝুঁকি নেয়, কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। কেশরহাট এলাকার কৃষক নুর ইসলাম বলেন, “ধান ওঠার সময় দাম কমে যায়। ব্যবসায়ীরা কম দামে কিনে মজুত করে রাখে। পরে সেই ধানই বেশি দামে বাজারে বিক্রি হয়।” সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতেও অভিযোগ সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে ১৫ মে থেকে ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা দরে কিনছে, যা প্রতি মণে প্রায় ১ হাজার ৪৪০ টাকা—বর্তমান বাজারদরের চেয়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সাধারণ চাষিরা সহজে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। সেখানে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। যদিও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইফুদ্দিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই ধান কিনতে চাই। কিন্তু অনেক কৃষক প্রক্রিয়াকে জটিল মনে করে আসতে চান না।” বাম্পার ফলন, কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. আব্দুল মজিদ জানিয়েছেন, হাওড় অঞ্চলে উৎপাদন কম হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। তার মতে, “উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার হলে বাজারে ধানের দাম বাড়তে পারে।” কিন্তু মাঠের কৃষকদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। তারা বলছেন, যদি বাম্পার ফলনের মৌসুমেও উৎপাদন খরচ না ওঠে, তাহলে আগামী মৌসুমে কৃষক কীভাবে টিকে থাকবে? বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় অংশ যাদের ঘামে নির্ভরশীল, সেই কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট এখন শুধু উৎপাদন নয়—ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন :টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় আগাম প্লাবন দেখা দিয়েছে। এতে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক। সুনামগঞ্জের জিনারিয়া হাওরে একটি রক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ায় আকস্মিকভাবে পানি ঢুকে ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৬ হেক্টর জমির মধ্যে আগে থেকেই ৮ হেক্টর জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত ছিল; বাঁধ ভাঙার পর আরও প্রায় ৩ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একজন জানান, মাসের পর মাস বাড়িঘর ছেড়ে হাওরে অবস্থান করে চাষাবাদ করার পর শেষ সময়ে এসে এমন বিপর্যয় তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন, ফলে ক্ষতির বোঝা আরও বাড়ছে। দোয়ারাবাজার উপজেলাসহ সুনামগঞ্জের একাধিক হাওরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ধানের শীষ সম্পূর্ণ পানির নিচে, আবার কোথাও আংশিক ভাসমান। কৃষকেরা কোমরসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা হিসেবে ধান কাটছেন, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। নেত্রকোনার হাওর এলাকাগুলোতেও গত তিন দিনের টানা বর্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের হিসেবে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, যদিও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। জেলায় এ বছর প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ধান কাটার জন্য মাইকিং করা হলেও শ্রমিক সংকট ও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। ফলে পাকা ধানও এখন পানির নিচে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরেও পানি দ্রুত বাড়ছে। প্রশাসনের দাবি, অধিকাংশ ফসল ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে, তবে কৃষকদের মতে বাস্তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান এখনো মাঠে ছিল, যা বর্তমানে ডুবে যাচ্ছে। হবিগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি প্লাবিত করেছে। কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের জন্য এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। আবহাওয়া অনুকূলে না ফিরলে এবং পানি দ্রুত না নামলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বরিশাল অফিস : সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা'২৫ কৃষকের স্বার্থে দ্রুত বাস্তবায়নের দাবীতে বরিশালে মানববন্ধন করেছে বরিশাল অঞ্চলের বিএডিসি বীজ ও সার ডিলার এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। ১৬ মার্চ সোমবার বেলা ১১ টায় নগরীর অশ্বিনীকুমার টাউন হলের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নিকট বরিশালের জেলা প্রশাসক ও সভাপতি, জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি, বরিশালের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মরকলিপিতে দ্রিত সময়ের মাধ্যমে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা'২৫ কৃষকের স্বার্থে বাস্তবায়নের দাবী জানানো হয়। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। কৃষি ফসল উৎপাদনে সার অতিব গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। রাসায়নিক সার ব্যতিত কোন ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। কৃষকের দোরগোড়ায় ন্যায্য মূল্যে সার পৌঁছে দেয়ার লক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক সার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শ কমিটির অনুমোদনক্রমে "সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করা হয় যা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার স্বারক নং, ১২,০০,০০০০,০৩১,৪০.০০১.২৫-৮২ তারিখ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ । ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারীকৃত প্রজ্ঞাপন নং-১২,০০,০০০০,০৩১,৪০,০০১,২৫-৮ মোতাবেক সকল জেলা প্রশাসককে তার নিজ জেলায় শুন্য ডিলার ইউনিট সমূহে অবিলম্বে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫" অনুযায়ী সারাদেশে ডিলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ জারী করেন। যাতে করে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষিকার্ড সহায়ক। বিধায় প্রধানমন্ত্রীর নিকট কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে "সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা/২০২৫" দ্রুত বাস্তবায়ন পূর্বক কৃষি কার্ড বিতরণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
বাতাসে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবীর উঞ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বরফ আচ্ছাদিত অঞ্চলের বরফ গলার পরিমাণ বাড়ছে। এতে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। এ কারণে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বেই পরিবেশ ও প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ মোটেও দায়ী নয় অথচ তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জার্মান ওয়াচে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফটের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। এ পর্যায়ে বায়ুমণ্ডল এবং সমুদ্রের উষ্ণায়ন, বিশ্ব পানি চক্রে ভারসাম্যহীনতা, তুষারপাত, বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগগুলোকে মানবসৃষ্ট প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদনে জলবায়ুর প্রভাব নিবিড়ভাবে জড়িত। বিরূপ জলবায়ু থাকলে ফসল ভালো হবে না। অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্ব¡াস, ঘূর্ণিঝড়, শীলাবৃষ্টি ছাড়াও অন্যান্য সাময়িক ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় কৃষি সম্প্রসারণের সব পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল রপ্ত করে বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ না করলে কৃষিতে আগামী দিনে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এটা ঠিক যে দুর্যোগকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও অভিযোজনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে দুর্যোগের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিতে সর্বাধিক প্রভাব পড়বে। ফসল উৎপাদনে বিশেষ করে চারটি প্রধান ফসল যথাক্রমে ভুট্টা, ধান, গম ও সয়াবিন উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় অদূর ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ ভবিষ্যতে উষ্ণায়নের তীব্রতা এবং অভিযোজন ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি। কারণ ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন হওয়ায় প্রায়ই খরা, তাপপ্রবাহ এবং বন্যায় ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী তারা এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। তাই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণে বাংলাদেশের গৃহীত কর্মপরিকল্পনার সুফল পাচ্ছে দেশের মানুষ। আবার বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইতিমধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি নিরসনে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে। এতে ক্রমাগত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে অ্যান্টার্কটিকাসহ হিমালয়ের বরফ গলা জলের প্রবাহে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক বন্যাসহ নদ-নদীর দিক পরিবর্তন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নদ-নদীর ভাঙন। পাশাপাশি সমুদ্রের পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। এতে দেশের সমুদ্র উপকূলের মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে লবণাক্ত পানি পানে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নারীরা সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে গ্রীষ্ম মৌসুমে মরূকরণের সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত মরুভূমি গবেষকরা বাংলাদেশকে সতর্ক করে আসছেন বারবার। দেশের এ সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা সমাধানে ন্যাশনাল এনভাইরনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করে তা ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছাড়াও ঋতুভেদে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্ব¡াস, টর্নেডো, নদীভাঙন, ভূমিধস প্রভৃতি মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা হয় বাংলাদেশকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের ঋতুচক্রের হেরফেরের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও হেরফের ঘটছে। অর্থাৎ আগের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সেই স্বাভাবিক চিত্র এখন আর আমাদের নজরে পড়ে না। এর প্রধান কারণ তাপমাত্রার পরিবর্তন বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি; এর প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্তরের উচ্চতা, মরূকরণ প্রভৃতির মাধ্যমে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, পরিবর্তন হচ্ছে আমাদের চিরচেনা ষড়ঋতুতে। সাহিত্যে বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশ বা বছরে ছয় ঋতুর বর্ণনা থাকলেও বাস্তব অর্থে এখন ষড় ঋতু পরিলক্ষতি হয় না। বৃষ্টির সময়ে বৃষ্টি না হয়ে অন্য সময় হচ্ছে, কখনো অতিবৃষ্টি আবার কখনো বন্যা হচ্ছে। অন্যদিকে, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানি প্রবাহ কমে যাচ্ছে। ভাঙনের ফলে নদীর গতিপথ পরির্বতন হচ্ছে। অন্যদিকে নদীর পানির বিশাল চাপ না থাকায় সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকা জুড়ে আটকে থাকার কথা, ততটুকু জায়গায় থাকছে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায় ক্রমাগত লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশে কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠছে। এদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে বাইন ও সুন্দরী গাছসহ বিভিন্ন গাছের আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। তাতে আবার নানা ধরনের পাতা ও ফুলখেকো বিভিন্ন রকমের কিটের আবির্ভাবও ঘটেছে। এ ব্যাপারে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ইকোসিস্টেমের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। তাই দেশের কোনো অঞ্চলের জলবায়ুর পরিবর্তন হলে সে অঞ্চলের প্রাণিকুল অথবা কীটপতঙ্গের জীবনধারায়ও পরিবর্তন আসে, প্রাণীর অস্তিত্বও সংকটে পড়ে। এমনও হয়, সেসব অঞ্চলের প্রাণিকুলের বিলুপ্তি ঘটে নতুন প্রাণিকুলের সৃষ্টি হয়। মূলত এভাবেই ওই অঞ্চলের জলবায়ুর প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির কিটের আবির্ভাব ও পূর্বের প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটছে। দেশীয় প্রজাতির গাছগাছালি হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে বিদেশি গাছের আগ্রাসন। বিদেশি এসব গাছ ও লতাগুল্মের ক্রমাগত বর্ধনের ফলে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার প্রজাতির নিজস্ব গাছ। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, বিদেশি আগ্রাসী গাছগুলো এখন আমাদের দেশীয় প্রজাতির গাছ হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। যেমন : সেগুন, মেহগনি, আকাশমণি, রেইনট্রি, বাবলা, চাম্বল, শিশু, খয়ের ও ইউক্যালিপ্টাস এখন অনেকের কাছে দেশীয় প্রজাতির গাছ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। অথচ এগুলো ভিনদেশি গাছ। এসব গাছের কারণে দেশীয় প্রজাতির গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রজাতির গাছগুলোর জন্য প্রচুর জায়গার দরকার হয়। এগুলো দেশি গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত মাটি থেকে বেশি পরিমাণে পুষ্টি শুষে নেয়। এ ছাড়া আশপাশে দেশীয় প্রজাতির গাছের বেড়ে ওঠাকে ব্যাহত করে। মূলত এ গাছগুলো ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে বিভিন্নভাবে আনা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এর ফলে কৃষিকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি, চাষাবাদ ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। তদুপরি অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বহু প্রজাতির ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আবার আগাছা, পরগাছা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অঞ্চলভেদে মাটির গুণাগুণ এবং উপাদানেও তারতম্য ঘটছে। ফলে ফসলের প্রত্যাশিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ইরি-বোরো উৎপাদনে প্রচুর সেচের পানির প্রয়োজন হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমিগুলোয় লবণাক্ততার কারণে সেচে ও চাষাবাদে বিপত্তি ঘটছে। আবার লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে চিংড়ি চাষেও ধস নেমেছে। অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে সেচের পানিতে আরেক বিপত্তি ঘটছে। সেখানকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি হওয়ায় ফসলের মাধ্যমে তা মানবদেহে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ফসলের জমিতে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ কারণে ফসল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় দ্রুতই জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানো না গেলে শুধু দেশের নিমাঞ্চলই প্লাবিত হবে না একই সঙ্গে মরূকরণের ঝুঁকিও বাড়বে। অন্যদিকে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের বৃক্ষরাজি, বনজ, জলদ ও কৃষিজ, মৎস্য সম্পদের ওপরে। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং এর বিরূপ প্রভাব থেকে পরিত্রাণে আমাদের নিজস্ব সম্পদ, মেধা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা দিয়ে নিরন্তর গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের পথরেখা নির্মাণসহ মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে নদ-নদীর দূষণ, দখল রোধ এবং নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে খালি জায়গায় বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে এবং অনাবাদি ও পতিত জমি দ্রুত চাষের আওতায় আনতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ দূষণ বা বায়ুদূষণ ঘটে এমন ধরনের কাজকর্ম থেকেও আমাদের নিবৃত থাকতে হবে। একই সঙ্গে অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণকারী তথা শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে প্রামাণ্যচিত্রসহ আমাদের আর্জি তুলে ধরতে হবে। এসব করা গেলে রাতারাতি জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব না হলেও কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ুর ভয়াবহ অভিঘাতে বিপর্যস্ত আমাদের জীবনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃষি, প্রকৃতি ও পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের কৃষি, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রকৃতিকে রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রয়োজন অধিকতর কৃষির গবেষণা। প্রত্যাশা থাকবে সরকার এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে কৃষিজ উৎপাদন তথা কৃষিতে প্রযুক্তির প্রয়োগ ও অঞ্চলভিত্তিক ফল-ফসল উৎপাদন, বিপণনে মনোযোগী হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।