ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। লটারির মাধ্যমে পদায়নের নামে ক্যাটাগরি নির্ধারণে অনিয়ম, গ্রেডিং শিটে কারসাজি, আগে থেকে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পাঠানো এবং প্রায় ১২০ কোটি টাকার কথিত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযোগকারী। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগসহ রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগ। এসব বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের বাসভবন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের মতো দায়িত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলী রেজা তৈমুর মালিক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৫ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপনে তাঁর পদায়ন করা হয় বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পদায়নকে ঘিরে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব বণ্টনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে লটারির ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও গ্রেডিং শিট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে। লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ‘এ প্লাস’, ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’—এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়নি বলে তাঁদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তাদের নাম একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে রেখে লটারির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য আগে থেকেই কয়েকজন কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, রেজা তৈমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও পদায়নপ্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টন করা হয়ে থাকতে পারে। গ্রেডিং শিটে কারসাজির অভিযোগ লটারির আগে গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান (বিপ্লব), নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব, সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাজহার এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। অভিযোগে বলা হয়েছে, আ ন ম মাজহারুল ইসলাম সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ পদায়নে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিজে থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ নয়; এ ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন ও মূল্যায়নসংক্রান্ত নথিই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁর পদায়নের যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। রেজা তৈমুর মালিকের পদায়ন ঘিরে বিতর্ক ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নকে কেন্দ্র করে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় ও আগের কর্মস্থল নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, রেজা তৈমুর মালিকের বাবা মো. রেজাউল হক মালিক, যিনি মুকুল নামে পরিচিত ছিলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি মারা যান। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বাজারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রেজাউল হক মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিচিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রেজাউল হক মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাবে ছেলে রেজা তৈমুর মালিকের চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে আকর্ষণীয় কর্মস্থলে পদায়নেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, রেজা তৈমুর মালিক নিম্নমানের একটি কোম্পানিকে পিডব্লিউডি সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নাম, সিডিউল অন্তর্ভুক্তির নথি, আর্থিক লেনদেনের দলিল কিংবা নিরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাঁর বর্তমান পদায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই, প্রশাসনিক বিধি এবং পেশাগত যোগ্যতা যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। আগের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন সরবরাহ করা তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসান, সুব্রত বিশ্বাস এবং রেজা তৈমুর মালিকের বিরুদ্ধে। তাঁদের কয়েকজনের ছবি ফেসবুকে প্রকাশ এবং অন্য কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তাদের আবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের চাকরির রেকর্ড, আগের পদায়ন, কর্মদক্ষতা এবং বর্তমান দায়িত্বের জন্য প্রশাসনিক যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোশ ওজাকে ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পদায়ন করা হয়েছিল বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে বদলি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা এ ঘটনাকে সামনে রেখে রেজা তৈমুর মালিকের পদায়নও পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ মাসুম বিল্লাহর পদায়ন সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়নের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন এবং সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় কাজে লাগিয়ে নগর গণপূর্ত বিভাগে প্রথম পদায়ন বাগিয়ে নেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নিয়োগের নথি, কোটার বৈধতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল সরবরাহ করা হয়নি। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর দায়িত্বের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণকাজ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর-সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্ব নিয়েও এ বিভাগের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এত গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পেশাগত যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড এবং প্রশাসনিক অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। ডিসেম্বরকে ঘিরে পরিকল্পনার অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এই বদলি ও পদায়নের মধ্যে সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই ও দুদকের সদর দপ্তর এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীরা ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অর্থায়ন, আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২: কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধেও কমিশন ও দরপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী, যিনি টিপু মুন্সি নামে পরিচিত, তাঁর ভায়রা। টিপু মুন্সির সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন পেয়েছেন এবং এ জন্য ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এ অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আবু নাসের চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্রের টেকনিক্যাল অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি করা হয়। ই-জিপি দরপত্রে পাঁচ শতাংশ কমিশন না দিলে টেকনিক্যাল অনুমোদন দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এর কয়েকটি দরপত্রের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য এবং আবু নাসের চৌধুরীর ই-জিপি আইডিতে আটকে থাকা দরপত্রের কথা উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্ট ই-জিপি রেকর্ড, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, দরপত্রের মূল্যায়ন এবং প্রত্যাখ্যানের কারণ যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। বগুড়ায় দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তনের অভিযোগ আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) কাজ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথডে (ওটিএম) আহ্বানের অনুমতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের কাজ এবং এপিপিভুক্ত কয়েকটি দরপত্রের ক্ষেত্রে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে তিনি ১০ শতাংশ কমিশন নিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত অভিযোগে যেসব দরপত্র আইডি উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: ১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ এবং ১০১৮১৫৯। এসব দরপত্রে পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদানের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু দরপত্র পদ্ধতি পরিবর্তন বা একাধিক দরপত্র আইডি উল্লেখ করাই কমিশন গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ করে না। রাজিবুল ইসলাম ও রাশেদ আহসানের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন অভিযোগে রাজিবুল ইসলামের পদায়নের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুর এবং পরে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে তাঁর পদায়নে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালা, আগের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ, পদায়নের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতার নথি পর্যালোচনা জরুরি। লটারিতে বৈষম্য ও ১২০ কোটি টাকার অভিযোগ লটারির আওতায় কোন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কারা বাদ পড়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে না রাখার অভিযোগ রয়েছে। একই পর্যায়ের অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। এদিকে, লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের সিন্ডিকেট প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁদের নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের উৎসও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সুশাসন বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং মন্ত্রীদের বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা সরকার ও প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া এবং পদায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতা, বিশ্বস্ততা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থাকলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তদন্তে যেসব নথি গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন: ১. নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করার লিখিত নীতিমালা ও অনুমোদনপত্র। ২. গ্রেডিং শিট, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং কর্মকর্তাদের এসিআর ও পেশাগত যোগ্যতার মূল্যায়ন। ৩. লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স, নামের তালিকা, লটারির ভিডিও বা কার্যবিবরণী এবং চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ। ৪. ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে পদায়নের প্রশাসনিক যুক্তি, অনুমোদন এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি। ৫. অভিযোগে উল্লেখ করা ই-জিপি দরপত্রের মূল্যায়ন, টেকনিক্যাল অনুমোদন, প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং প্রাক্কলন ও ভেরিয়েশন অনুমোদনের রেকর্ড। ৬. কথিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং অর্থের উৎস। ৭. নিয়োগ, বিশেষ বিসিএস, মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পূর্ববর্তী পদায়নের বৈধতা-সংক্রান্ত নথি। জবাবদিহি ও নিরাপত্তা—দুই প্রশ্নেই স্বচ্ছতা জরুরি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ শুধু প্রকৌশলগত দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক জবাবদিহি, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িত। তাই পদায়ন নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা অতীতের কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিযোগকে এককভাবে অনিয়ম বা নিরাপত্তাঝুঁকির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রামাণ্য নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। রেজা তৈমুর মালিকসহ যেসব কর্মকর্তার পদায়ন, গ্রেডিং বা দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানই হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ।
দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ - ইত্তেহাদ নিউজ, অনলাইন: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে বাস্তবায়িত দুটি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল এবং কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলম। অভিযোগ অনুযায়ী, ইব্রাহিম খলিলের দায়িত্বাধীন প্রায় ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নির্বাচন, সিড ড্রায়ার কেনাকাটা এবং উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে অনিয়ম হয়েছে। অন্যদিকে, মাহমুদুল আলমের সাবেক দায়িত্বাধীন প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পে অন্তত ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ধরন ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পৃথক হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি এবং তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে প্রকল্পে দরপত্র কারসাজির অভিযোগ বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ ও মূল্যায়নের পদ্ধতি এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে অনেক যোগ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ে। বিপরীতে, প্রকল্প পরিচালকের পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এ ছাড়া কাজ পাইয়ে দেওয়া, কার্যাদেশ প্রদান এবং ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনার বিনিময়ে কমিশন আদায় করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। সিড ড্রায়ার কেনাকাটায় প্রশ্ন, দুটি দরপত্র নিয়ে আপত্তি ইব্রাহিম খলিলের দায়িত্বাধীন প্রকল্পে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি সিড ড্রায়ার সরবরাহসংক্রান্ত দুটি দরপত্র নিয়ে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, Tender ID: 1178841 (MIEF/GD-19.01) এবং Tender ID: 1178840 (MIEF/GD-19.02)—এই দুটি দরপত্রের মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ বা দরপত্রের শর্ত পূরণে অযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে, Consent Merchant নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতির কারিগরি বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ পুনর্বিবেচনা এবং দরপত্র মূল্যায়ন নতুন করে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। হিট এক্সচেঞ্জারের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত Master Climate Solutions-এর BV 691TR মডেলের হিট এক্সচেঞ্জার নিয়েও আপত্তি তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, যন্ত্রটির হিটার ও ব্লোয়ারের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে বীজ শুকানোর কার্যকারিতা কমে যাওয়া, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, আর্দ্রতা অপসারণ, বায়ুপ্রবাহ এবং শুকানোর সময়ের মতো বিষয় বীজের গুণগত মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সরবরাহ করা যন্ত্রপাতি নির্ধারিত কারিগরি শর্ত পূরণ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। এ কারণে অভিযোগকারীরা যন্ত্রটির প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা করানোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কারিগরি পরীক্ষার ফলাফল, প্রস্তুতকারকের তথ্য, দরপত্রে উল্লেখিত স্পেসিফিকেশন এবং সরবরাহ করা যন্ত্রের বাস্তব সক্ষমতা তুলনা করলে অভিযোগের ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। শতাধিক দরপত্র, সময়সীমা নিয়ে অভিযোগ ইব্রাহিম খলিলের দায়িত্বাধীন প্রকল্পে কয়েক মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের শতাধিক দরপত্র চলমান রাখার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক দরপত্র একযোগে আহ্বান করায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত, ব্যাংকসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন এবং কারিগরি প্রস্তাব তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে সাধারণ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। পরবর্তীতে দরপত্রের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করা হলেও তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের একাংশ। তবে শুধু দরপত্রের সংখ্যা বা সময়সীমা নিয়ে অভিযোগ থেকেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রকাশের তারিখ, অংশগ্রহণের জন্য নির্ধারিত সময়, সময় বাড়ানোর আবেদন ও তার নিষ্পত্তি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং মূল্যায়নের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কমিশন বাণিজ্য ও কথিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দরপত্রে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের কাজ পাওয়া, বিল অনুমোদন এবং ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়েছে। অভিযোগকারীদের একাংশ এই প্রক্রিয়াকে একটি কথিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে কমিশন আদায় বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আর্থিক লেনদেনের নথি, ব্যাংক হিসাব, বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করা দরকার। উন্নয়নকাজে ব্যয় ও বিল-ভাউচার নিয়ে প্রশ্ন ইব্রাহিম খলিলের দায়িত্বাধীন প্রকল্পে কেনাকাটা এবং অবকাঠামোগত সংস্কারকাজেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে সংস্কার বা নির্মাণকাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল-ভাউচার প্রস্তুত করা হয়েছে, অথচ বাস্তবে কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, কাজ সমাপ্তির সনদ, বিল-ভাউচার এবং বাস্তব কাজের পরিমাণের মধ্যে তুলনা করা জরুরি।নথিতে দেখানো ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের অমিল পাওয়া গেলে তার কারণ নির্ধারণ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিন জেলায় বীজ আত্মসাতের অভিযোগ ইব্রাহিম খলিলের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অভিযোগের মধ্যে বিএডিসির আঞ্চলিক বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোতে বীজ আত্মসাৎ ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আটজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার হাইব্রিড ধান ও গমের বীজ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে প্রকল্প পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের যোগসাজশের দাবিও করেছেন। তবে উল্লিখিত বীজ আত্মসাতের অভিযোগ এবং প্রকল্প পরিচালকের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মজুত রেজিস্টার, গুদামের হিসাব, বীজ বিতরণের নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং বিভাগীয় তদন্তের ফলাফল ছাড়া কোনো ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করা যায় না। নিয়োগের যোগ্যতা ও তদারকি নিয়েও প্রশ্ন ইব্রাহিম খলিলের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত যোগ্যতার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা, প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিবরণ এবং বিভাগীয় তদন্তের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিএডিসির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট দরপত্রের কার্যাদেশ পর্যালোচনা, আর্থিক নিরীক্ষা, কারিগরি পরীক্ষা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ৬০০ কোটি টাকার কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পে ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বিএডিসির কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অন্তত ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে একটি কথিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, কমিশন বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহের মধ্য দিয়ে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত কমিশন বাণিজ্য চলেছে। ঠিকাদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল দ্রুত ছাড় এবং অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের বিনিময়ে অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগও রয়েছে মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী, দরপত্রের মূল্য, সরবরাহ করা সরঞ্জামের বাজারদর, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ এবং প্রকৃত কাজের অগ্রগতি তুলনা করে এ অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। ঠিকাদার নির্বাচন ও বিল অনুমোদনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের একটি কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পের কাজ ও অর্থ বরাদ্দে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরঞ্জামের গুণগত মান, ক্রয়মূল্য এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে অসংগতি ছিল। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে সরঞ্জাম গ্রহণ ও মান যাচাইয়ের সনদ, ক্রয়মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি, সরবরাহকারীর পরিচয়, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং বিল পরিশোধের নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভিযোগকারীদের মতে, প্রকল্পের আর্থিক নিরীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন একসঙ্গে পরিচালনা করা হলে ব্যয়ের অসংগতি এবং সম্ভাব্য অনিয়মের প্রকৃতি নির্ধারণ করা সহজ হবে। প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরানো হলেও তদন্তের প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর মাহমুদুল আলমকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অতীতের প্রকল্পে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের সিদ্ধান্ত ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, কোনো কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তাতে প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় না। প্রকল্পের ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব পালনকালে গৃহীত সিদ্ধান্তের স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অবৈধ সম্পদ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ সূত্রের দাবি, তাঁর দায়িত্ব পালনকালের আয়, সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার এবং পরিবারসহ দেশত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সূত্রের ব্যক্তিরা। কৃষকের স্বার্থে নিরপেক্ষ তদন্ত কেন জরুরি বিএডিসির প্রকল্পগুলো শুধু সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এগুলোর সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও জড়িত। বীজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি নিম্নমানের হলে কিংবা প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বীজের গুণগত মান, সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অপচয় শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে ইব্রাহিম খলিল ও মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বক্তব্যের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা জরুরি। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরীক্ষা করে ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বিতর্কিত দরপত্রগুলোর মূল্যায়ন, কার্যাদেশ এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা পর্যালোচনা করা দরকার। তৃতীয়ত, সিড ড্রায়ারসহ সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে বুয়েটের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মতামত নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বীজ আত্মসাতের অভিযোগ, ঠিকাদারি বিল অনুমোদন, কমিশন বাণিজ্য এবং সম্ভাব্য অবৈধ সম্পদের বিষয়ে পৃথক তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মূল প্রশ্ন এখন—বিএডিসির এই দুটি প্রকল্পে সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত করবে কি না।** এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে প্রকল্পের নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, কারিগরি পরীক্ষার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।