মাসুদ করিম: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যুদ্ধ এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখল বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি অর্থনীতি, জ্বালানি এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক জটিল প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা—বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত—এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পরও ইরানে সরকার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জ্বালানি: যুদ্ধের আসল কেন্দ্রবিন্দু? বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংঘাতগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি ও বাণিজ্য পথ। বিশেষ করে: হরমুজ প্রণালি কৃষ্ণসাগর অঞ্চল বৈশ্বিক তেল সরবরাহ চেইন বিশ্বের প্রায় ২০% তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। এলএনজি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হয়। এর ফলে: যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক ইউরোপ স্পট মার্কেটে বেশি দামে গ্যাস কিনতে শুরু করে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি পায় তবে এই লাভের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয়ও করতে হয়েছে। লাভ বনাম ঝুঁকি: জটিল সমীকরণ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানিকারকরা লাভবান, তবুও বড় কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে জোট রাজনীতিতে চাপ বাড়ে সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকে এছাড়া, কাতারের মতো দেশ যদি হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির কারণে রপ্তানি কমায়, তাহলে বিশ্ববাজারে এলএনজি দাম আরও বাড়তে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ: নতুন ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাতগুলো আসলে তিনটি বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই: জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) সমুদ্রপথ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার সহজ হয়। বাংলাদেশ: চাপের মুখে অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন: জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়ে ফলে বৈশ্বিক সংঘাতের সরাসরি অংশীদার না হয়েও বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। নিরাপত্তা বনাম নির্ভরতা দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু যদি সেই নির্ভরতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা শুধু সামরিক নয়—একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শেষ কথা: যুদ্ধের শেষ কোথায়? বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় পরিষ্কার— এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমাপ্তি নেই। এটি: আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে জ্বালানি বাজারকে পুনর্গঠন করছে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করছে অতএব, প্রশ্নটি এখন আর শুধু “কে জিতবে?” নয়— বরং “এই যুদ্ধ থেকে কে কতটা লাভবান হবে, আর তার মূল্য কে দেবে?”
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ সংবলিত ড্রোন ইরানে পাঠাচ্ছে—এমন দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাধিক কর্মকর্তা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এই তথ্য জানিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, ইরান গত এক মাসের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। যদিও তেহরানের নিজস্ব শাহেদ ড্রোন রয়েছে, তবে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব ড্রোনকে আরও উন্নত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নেভিগেশন ব্যবস্থা, জ্যামার প্রতিরোধী প্রযুক্তি এবং লক্ষ্যভেদ ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনা হয়েছে বলে দাবি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্রগুলোর। একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি মাসেই রাশিয়া থেকে ইরানে ড্রোন সরবরাহ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সক্রিয় আলোচনা হয়েছে। চালান কত বড়, স্পষ্ট নয় মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এটি এককালীন চালান নাকি ধারাবাহিক সরবরাহের অংশ—তা এখনও পরিষ্কার নয়। ড্রোনের সংখ্যা বা এর সামরিক প্রভাব সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, সীমিত সংখ্যক ড্রোন যুদ্ধের গতিপথে বড় পরিবর্তন আনবে না। বরং এটি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের প্রতীকী পদক্ষেপও হতে পারে। পরিবহনের পথ নিয়ে জল্পনা ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়ার একটি ড্রোন চালান ইতোমধ্যে পথে রয়েছে। যদিও কীভাবে তা পরিবহন করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্প্রতি আজারবাইজান হয়ে ট্রাকে করে রাশিয়ার মানবিক সহায়তার কনভয় ইরানে প্রবেশ করেছে। এতে ড্রোন থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব ট্রাকে খাদ্য ও ওষুধ ছিল। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কী কী? বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া শাহেদ ড্রোনে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) উন্নত ক্যামেরা জ্যামার প্রতিরোধী ব্যবস্থা জেট ইঞ্জিন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগ (স্টারলিংক প্রযুক্তি) এই পরিবর্তনের ফলে ড্রোনগুলো আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, অন্য দেশ ইরানকে কী সরবরাহ করছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে বড় প্রভাব ফেলছে না। তার দাবি, মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং ১৪০টিরও বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ বিশেষজ্ঞদের মতে, জেট ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগতির ড্রোনগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ধরনের ড্রোন প্রতিহত করতে উন্নত ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, যার মজুদ সীমিত। রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের পটভূমি ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ড্রোন চুক্তি হয়। পরবর্তীতে রাশিয়ার ভেতরেই ড্রোন উৎপাদন শুরু হয়। তবে দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে রাশিয়ার নিষ্ক্রিয়তায় তেহরান অসন্তুষ্ট হয়েছিল। এদিকে, ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে রুশ ক্রেমলিনের মুখপাত্র এই দাবিকে “ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ২০২৫ সালে কাজের সময় রেকর্ড ১২৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের প্রাণ গেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন Committee to Protect Journalists (সিপিজে)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সংবাদকর্মীদের প্রাণহানির রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪ সালের মতো গত বছরও নিহত সাংবাদিকদের বড় একটি অংশের মৃত্যুর জন্য ইসরায়েল দায়ী। গাজা ও ইয়েমেনে ব্যাপক প্রাণহানি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ৮৬ জন সাংবাদিক নিহত হন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন Gaza Strip-এর ফিলিস্তিনি সাংবাদিক। এছাড়া ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী Houthis পরিচালিত একটি গণমাধ্যম কার্যালয়ে ইসরায়েলি হামলায় ৩১ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হন। সিপিজে জানায়, সাংবাদিকদের হতাহতের সংখ্যা নথিভুক্ত করার ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। সিপিজে যে ৪৭টি হত্যাকাণ্ডকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা বা ‘হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার ৮১ শতাংশের জন্যও ইসরায়েল দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গাজায় প্রবেশাধিকারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় সাংবাদিকদের হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি। অতীতে তারা দাবি করেছে, গাজায় তাদের সেনারা কেবল যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি থাকে। গত সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের ওই গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার দায় স্বীকার করে ইসরায়েল। সে সময় সেটিকে হুথিদের প্রচারণা শাখা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। কিছু ঘটনায় ইসরায়েল দাবি করেছে, গাজায় নিহত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে Hamas-এর যোগাযোগ ছিল। তবে এ দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সিপিজে ইসরায়েলের এমন অভিযোগকে ‘ভয়াবহ অপবাদ’ বলে উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না ইসরায়েল। ফলে সেখানে নিহত সব গণমাধ্যমকর্মীই ছিলেন ফিলিস্তিনি। অন্যান্য দেশে পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ১২৯ সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত ১০৪ জন সংঘাত-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। গাজা ও ইয়েমেনের বাইরে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশগুলোর একটি ছিল Sudan, যেখানে ৯ জন নিহত হন। এছাড়া Mexico-তে ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। Ukraine-এ রুশ বাহিনীর হাতে চারজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে Philippines-এ তিন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের নিশানা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং উল্টো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তুলেছে। যদিও কিয়েভ এ অভিযোগ নাকচ করেছে। প্রতিবেদনের বিষয়ে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাশিয়ার দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তিন দশকের তথ্যসংগ্রহ সিপিজে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হতাহতের তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমানে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী যেকোনও দেশের সামরিক বাহিনীর তুলনায় সর্বোচ্চসংখ্যক নিশানাভিত্তিক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। বিশ্বব্যাপী সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সাংবাদিকদের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে—এমন উদ্বেগও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুদান, গাজা ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপক লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “আইনের শাসনের জায়গা এখন শক্তির শাসন দখল করে নিচ্ছে। মানবাধিকারকে পরিকল্পিতভাবে এবং কখনও কখনও প্রকাশ্য গর্বের সঙ্গে উপেক্ষা করা হচ্ছে।” সুদান, গাজা ও ইউক্রেনে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সুদান এ চলমান সংঘাতে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গাজায় টানা যুদ্ধ ও অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, “একদিকে মানবিক প্রয়োজন বিস্ফোরণোন্মুখ, অন্যদিকে তহবিলের জোগান পুরোপুরি ধসে পড়ছে।” তহবিল সংকটে জাতিসংঘের তদন্ত স্থগিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক জানান, ব্যাপক অর্থসংকট, বিশেষজ্ঞদের ওপর চাপ এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের নিস্পৃহতার কারণে তার দফতর টিকে থাকার লড়াই করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির সবচেয়ে বড় দাতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তবে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বকেয়া থাকলেও দেশটি মাত্র ১৬০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। তহবিল সংকটের কারণে ২০২৫ সালে শুরু হওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত স্থগিত রয়েছে— গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্ত আফগানিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন অনুসন্ধান একজন কূটনীতিক জানান, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মৌখিক সমর্থন থাকলেও অর্থের অভাবে এসব তদন্ত আলোর মুখ দেখছে না। ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কঠোর সমালোচনা করে গুতেরেস বলেন, “দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে দিবালোকেই ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটি হতে দিতে পারে না।” সম্প্রতি ইসরায়েল সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ জোরদারে নতুন পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে। এর ফলে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য ফিলিস্তিনি ভূমি কেনা আরও সহজ হবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করে আসছেন। তবে ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত পশ্চিম তীরসহ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সংকট সমাধানের পক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বড় অংশ অবস্থান নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে তীব্র ক্ষমতার লড়াই ভলকার তুর্ক সতর্ক করে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান বিশ্ব সবচেয়ে তীব্র ক্ষমতা ও সম্পদের লড়াই প্রত্যক্ষ করছে, যার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক সংঘাত এবং তহবিল সংকট একত্রে মানবাধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সুদান, গাজা, ইউক্রেন ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চলমান মানবিক বিপর্যয় বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃত্বের সতর্কবার্তা স্পষ্ট— আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানবাধিকারের বৈশ্বিক কাঠামো আরও ভেঙে পড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।