বরিশাল : বরিশাল নগরীর শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল এবং বরিশাল আইন মহাবিদ্যালয় এলাকাকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ‘২০২১ সালে নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্প’-এর আওতায় এসব এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়। প্রচারণায় স্থানীয় জনগণকে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়—এটি মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, স্মৃতিশক্তি হ্রাসসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণ হতে পারে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘোষিত নীরব এলাকাগুলোতে যানবাহনের হর্ন বাজানো, উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার এবং অন্যান্য শব্দদূষণ কার্যক্রম আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতাল এলাকার মতো সংবেদনশীল স্থানে রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য নিরিবিলি পরিবেশ নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য ছিল, তা এখনও অর্জিত হয়নি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচারণা চালানো হলেও পরবর্তী ধাপে কঠোর আইন প্রয়োগের কথা থাকলেও তা দৃশ্যমান হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের অভাব এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতির কারণে উদ্যোগটি অনেকাংশেই থমকে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল, বিধিমালা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে এবং পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে এই আইন প্রয়োগের নজির খুবই সীমিত। সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র প্রচারণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং, আইন প্রয়োগে কঠোরতা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। অন্যথায় ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণার এই উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্থানে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও দীর্ঘদিনেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়া উদ্বেগজনক। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
বিবিসি বাংলা: "ঘরে মশা বাইরে মশা, যেখানেই যাই মশা। মশার যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মনে হয় মশা যেন তুলে নিয়ে যাবে।" এভাবেই বলছিলেন ঢাকার উত্তরা এগারো নম্বর সেক্টরের খিদির খাল এলাকার বাসিন্দা শরিফুল হোসেন। দিনের বেলায়ও মশার কয়েল অথবা মশা প্রতিরোধক রিপিলেন্ট ব্যবহার করেও কাজ হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীর রামপুরা আফতাবনগর এলাকার বাসিন্দা সিমি আক্তারও। তিনি বলেন, বাসায় ছোট শিশু থাকায় মশা থেকে বাঁচতে দিন-রাত সবসময় বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রাখছেন। মশার এমন ভয়াবহ উপদ্রবেও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস বলেন, "আগে তো মাঝেমধ্যে ধোঁয়া মারতে দেখতাম, অনেক দিন হলো সেটাও চোখে পড়ে না।" মশা বেড়েছে ঢাকার অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান কিংবা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়ও। কেবল ঢাকায়ই নয় চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী সিটির কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে ওইসব এলাকায়ও হঠাৎ করেই মশা বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে মশাবাহিত রোগ, বিশেষ করে ডেঙ্গু নিয়ে শঙ্কা বেড়েছে সাধারণ মানুষের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবছরের পহেলা জানুযারি থেকে ২৬শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই মাসে অন্তত দেড় হাজার জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মারা গেছেন চার জন। ড্রেন পরিষ্কার না করা, খালের সংযোগস্থল ভরাট এবং জমে থাকা পঁচা পানির কারণেই মশা বেড়েছে বলে মত কীটতত্ত্ববিদের। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনে দীর্ঘদিনের অচলবস্থার কারণে কেবল ঢাকাই নয়, মশার উপদ্রব বেড়েছে গোটা দেশেই। যে তিন কারণে মশা বেড়েছে শীতের বিদায় আর বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে যখন পরিবর্তনের হাওয়া, ঠিক তখনই সারাদেশে মশার উপদ্রব ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা শহরেও মশার দাপটে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। বছরের এই সময়ে প্রতি বছরই মশা কিছুটা বাড়ে বলেই মত কিটতত্ত্ববিদের। তবে এবার মশার উপদ্রব অনেকটা বেশি বলেই জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার। এর পেছনে মোটাদাগে তিনটি কারণকে দায়ি করছেন মি. বাশার। তিনি বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশের স্থানীয় সরকার প্রশাসন পুরোপুরি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ছিল না বললেই চলে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলবস্থার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায়, বিশেষ করে জনবহুল সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতে মশা অধিক হারে বেড়েছে বলেই মনে করেন তিনি। মি. বাশার বলছেন, "ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রশাসনের যে অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল পুরো কাঠামোটাই ভেঙে পড়েছে।" দ্বিতীয়ত, বর্জ ব্যবস্থাপনা ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমসহ সব ধরণের তৎপরতার গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না থাকায় ড্রেন, ডোবা, নর্দমার পানি আটকে কিউলেক্স মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন মি. বাশার। "বৃষ্টি না হওয়ায় ড্রেন, ডোবা, নর্দমার জমে থাকা পানি স্থির থেকেছে, সেই পানি পরিষ্কার না করার দীর্ঘদিন ধরে পঁচেছে। এখন বসন্তের আগমনে কিছুটা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় গরমে মশার বংশবৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।" শুষ্ক সময়ে জমে থাকা পানি যদি সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসন পরিষ্কারের ব্যবস্থা নিত তাহলে পানি পঁচতো না। মশার প্রজননের সুযোগও কমে যেত। তবে "এখন যে মশাটা আছে তার ৯২ ভাগই কিউলেক্স মশা। এই মশার বংশবৃদ্ধি হয় ড্রেন, ডোবা, নর্দমার পঁচা পানিতে," বলেন তিনি। তৃতীয় কারণ হিসেবে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়াকে দায়ি করছেন এই কীটতত্ত্ববিদ। তার মতে, কেবল গত আঠারো মাসে নয়, বাংলাদেশে মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে সাধারণত মশা নিয়ন্ত্রণে যে ফগিং বা ধোঁয়ার ব্যবহার করা হয় সেটি কার্যকর কোনো সমাধান নয় বলেই মনে করেন মি. বাশার। তিনি বলছেন, এর মাধ্যমে নাগরিকদের কেবল খুশি করার চেষ্টা করা হয়। "ছোট বাচ্চাদের চকলেট দিয়ে যেমন খুশি করার চেষ্টা করা হয় ঠিক একইভাবে নাগরিকদের খুশি করার পদক্ষেপ হচ্ছে ফগিং," বলেন তিনি। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টেনে কবিরুল বাশার বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি থাকায় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই, মশা নিয়ন্ত্রণে ধোঁয়া ব্যবহার এখন আর অনুমোদিত নয়। ডেঙ্গু নিয়ে শঙ্কা বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা মৌসুম অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ এই সময়ে গরম ও বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বংশবৃদ্ধি দ্রুত হয়। যদিও ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। বছরের যেকোন সময়ই ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলেই মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। সারাদেশে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকারে বাড়লেও ডেঙ্গু আক্রান্তের হার এখনও আশঙ্কাজনক নয় বলেই মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ এবং কীটতত্ত্ববিদরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে, মশার বর্তমান আধিপত্য এখনই নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে যেমন পদক্ষেপ জরুরি তেমনি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। আমাদেরকে অবশ্যই আগেভাগে প্রস্তুতি রাখতে হবে, এপ্রিলে বৃষ্টি শুরু হলে এডিস মশা আমাদের চিন্তার কারণ হতে পারে।" ডেঙ্গুর শঙ্কা কিছুটা কম থাকলেও কিউলেক্স মশাবাহিত রোগ এই সময় হতে পারে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলছেন, "যখনই বৃষ্টি শুরু হবে তখন কিউলেক্স মশা মরবে আর এডিস মশা বাড়বে। কারণ বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে জমা হয়ে এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।" এ কারণেই বৃষ্টি শুরুর আগে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ তার। এক্ষেত্রে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মি. বাশার। তিনি বলছেন, "ছোট বড় পড়ে থাকা পাত্র ধ্বংস করতে হবে। এপ্রিলে বৃষ্টি শুরুর আগেই এগুলো করতে হবে যাতে বৃষ্টি শুরু হলেই পানি জমে থাকতে না পারে।" মশা নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? মশার উপদ্রব এবং মশাবাহিত রোগ নিয়ে নানা আলোচনা হলেও এর যেন কোনো সমাধান নেই। প্রতি বছরই অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয় ছোট্ট এই জীবের কামড়ে। সম্প্রতি মশার উপদ্রব যে মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে সেটি নিয়ন্ত্রণে ড্রেন, ডোবা, নর্দমার মতো যেসব জায়গায় পঁচা পানি জমে থাকার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো পরিষ্কার করাই সব থেকে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, পরিষ্কার করার পর এই জায়গাগুলোতে কীট নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। যাতে মশার প্রজননস্থলগুলোই ধ্বংস হয়। "মশার উৎপত্তিস্থল যদি আমরা নষ্ট করতে পারি, তাহলে উড়ন্ত মশা পরবর্তীতে আর আসবেই না। আর মশার জন্মস্থান নষ্ট করে মশা নিয়ন্ত্রণ যত সহজ, উড়ন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ করা তো অতটা সহজ না," বলেন তিনি। মশা নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার? সম্প্রতি মশার উপদ্রব অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় এই প্রশ্নটি ঘুরেফিরেই আসছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করলেও মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখনও তেমন কার্যকর করতে পারেনি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মো. শফিকুল ইসলাম খান বলছেন, সিটি কর্পোরেশনে সব কিছুতেই অব্যবস্থাপনা রয়েছে। "আমি দায়িত্ব নিয়েছি কয়েক দিন হলো। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি, আশা করছি মশা নিয়ন্ত্রণে আগামী সপ্তাহ থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবো আমরা," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। মশা নিধনে 'জিরো টলারেন্স' এর কথা বলেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বা ডিএসসিসি এর প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। তিনি জানান, মশক নিয়ন্ত্রণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করতে স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। "মশা নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসির ১০টি অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে ১০ দিনের বিশেষ 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' শুরু করা হবে," বলেও জানান মি. সালাম।
কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর এলাকায় নদীভাঙন রোধে নির্মিত বেড়িবাঁধ বেষ্টনীতে রোপণ করা মেহগনি গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন। এর আগে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উপজেলা প্রকৌশলী ফয়জুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পরপরই কেন্দ্রীয় বিএনপি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব সাংগঠনিক পদ স্থগিত করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে নদীভাঙন প্রতিরোধে কামালপুর এলাকার বেড়িবাঁধে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব মেহগনি গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বাঁধ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে অসুবিধা হওয়ায় গত ৫ আগস্টের পর থেকে ধাপে ধাপে গাছ কাটা শুরু হয়। সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে ১২টি মেহগনি গাছ কেটে ফেলা হয়। প্রতিটি গাছের বাজারমূল্য আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে গাছের গুঁড়ি কেটে পরে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। খবর পেয়ে মিঠামইনের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) একটি স মিল থেকে কাটা গাছ উদ্ধার করে এবং এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করে। বর্তমানে পুলিশ ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত বেড়িবাঁধে রোপণ করা গাছ কেটে ফেলা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও অবকাঠামোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি প্রতি মিনিটে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি। নতুন এক জরিপে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকট এখন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। খবর এনডিটিভির। এফআইসিসিআই-ইওয়াই রিস্ক সার্ভে ২০২৬ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে জলবায়ুজনিত ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ ও পরিবেশের অবনতিই এই ক্ষতির প্রধান কারণ। প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এরইমধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদন ও শ্রম উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করছে। ২০০০ সালের পর থেকে ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন সরাসরি অর্থনীতি, ব্যবসা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।