আসছে নতুন নির্বাচিত সরকার একটি স্বস্তিদায়ক অর্থনীতি পাচ্ছে না। পাচ্ছে কঠিন চ্যালেঞ্জিং, অস্বস্তিদায়ক ও বন্ধুর পথে এগোনোর অর্থনীতি। ভঙ্গুর এই অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নতুন সরকারকে অজনপ্রিয় অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো নিতে হবে। এসব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই আসবে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) চাপ থেকে। এদিকে আইএমএফের চাপ এড়িয়ে যাওয়াও নতুন সরকারের জন্য বেশ কঠিন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক তাদের পৃথক প্রতিবেদনে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়ে মন্তব্য করেছে। এসব মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কেও পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সরকারের জন্য এগুলো বাস্তবায়ন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারলে বিনিয়োগের দুয়ার খুলতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে ফের অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়বে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এতদিন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে আশা করা যায়। তখন বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থার সঞ্চার ঘটাতে গ্যাস, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগের পদ্ধতিকে সহজ করতে হবে। ঋণের সুদের হার কমাতে হবে।
নির্বাচিত সরকারের ওপর রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ানোর চাপ থাকবে। এই চাপ মোকাবিলা করতে হলে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করলেও রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। কারণ রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করলে ও রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ালে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়বে। তখন বেসরকারি খাতের ঋণের দুয়ার সংকুচিত হয়ে পড়বে। পাশাপাশি ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার চাপ থাকবে। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।
ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই ঋণের সুদের হার কমানোর জোর দাবি করেছেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সোমবার ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার না কমিয়ে ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদের হার কমবে না। এদিকে আইএমএফও ঋণের সুদের হার না কমানোর পক্ষে। ফলে সরকার কোনদিকে সিদ্ধান্ত নেবে-এটি একটি বড় প্রশ্ন। কারণ সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। আইএমএফ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের মধ্যে না নামলে নীতি সুদের হার কমানো যাবে না। মূল্যস্ফীতি বেড়ে এখন ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফলে ঋণের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হবেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। মন্দার কারণে রাজস্ব আয় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মন্দা আরও বেড়েছে। রাজস্ব বোর্ড সংস্কার করতে গিয়ে সেখানেও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে রাজস্ব আয় আরও কমেছে। একদিকে রাজস্ব আয় হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ফলে আয়-ব্যয়ের মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা বেড়েছে। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে বড় ঘাটতি রেখে যাচ্ছে। যে কারণে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়বে। এছাড়া রাজনৈতিক সরকারের খরচও বাড়বে। একদিকে আয় কম, অন্যদিকে খরচ বেশি। ফলে ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর অবস্থাও ভালো নয়, অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারকে মোটা অঙ্কের ঋণের জোগান দিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে না। সরকার এমন উভয় সংকটের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসছে। তিনি আরও বলেন, এ সংকট কাটাতে দ্রুত সরকারকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। যাতে তারা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যবসা চাঙা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নির্বাচন, রোজা ও সরকারি কর্মীদের বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। এতে চাহিদা বেড়ে আগামী কয়েক মাস মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে নতুন সরকারকে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির ধারায় ক্ষমতায় এসে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ আইএমএফ বরাবরই চাপ দিয়ে আসছে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করতে। এটি করলে টাকার মান আরও কমে যাবে। আইএমএফ মনে করে ডলারের বিপরীতে টাকা অতিমূল্যায়িত। ফলে টাকার মান কমালে আবার মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। বৈদেশিক দায়দেনাও বাড়বে। আইএমএফের মতে, তখন ডলারের দাম বাড়ার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে এবং রিজার্ভ বেড়ে নিরাপদ মাত্রায় পৌঁছবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের সময়ে এসব খাতে আরও অবনতি ঘটেছে। ফলে রাজস্ব আয় হ্রাস পেয়েছে ব্যাপকভাবে। যে কারণে বর্তমান সরকার ঋণ করে চলছে। দেশি ঋণের পাশাপাশি বৈদেশিক খাত থেকেও ঋণ নিচ্ছে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় সীমিত ঋণ নিচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের ছাপানো টাকায় নেওয়া ঋণ পরিশোধও করেছে।
ব্যবসায়িক মন্দার কারণে নতুন সরকারের পক্ষে রাজস্ব আয় বাড়ানো একেবারেই সম্ভব নয়। অথচ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে সরকারকে খরচ বাড়াতে হবে। তখন সরকার প্রবল আর্থিক সংকটে পড়বে। এ সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকারেরও নির্ভরতা বাড়াতে হবে। আর ঋণ করে রাজনৈতিক ব্যয় করলে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়বে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নতুন সরকার আস্থার সঞ্চার করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড গতিশীল করে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লেগে যাবে।
দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ায় ও বৈদেশিক দেনা কমে যাওয়ায় সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানি করে শিল্পে দিতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, চাঁদাবাজি বন্ধ করা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করা হবে আরেক চ্যালেঞ্জ।
নতুন সরকারের জন্য ব্যাংকিং খাত নতুন চ্যালেঞ্জ। এ খাতে যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার বিরোধিতা করছে রাজনৈতিক দলের নেতারা। ফলে সংস্কার করা কঠিন হবে। আওয়ামী লীগ আমলে লুটপাটের কারণে এ খাতে তারল্যের চাপ এখনো রয়েছে। লুটের ঋণ খেলাপি হচ্ছে। এতে ব্যাংক খাত দুর্বল হচ্ছে। এমন দুর্বল আর্থিক খাতে অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দেওয়া কঠিন। এজন্য পাচার করা টাকা ফেরাতে হবে। কিন্তু এটি বেশ সময়সাপেক্ষ।
নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে তাদের চলমান কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব করতে অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। নতুন সরকারকে বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার করে আয় বাড়ানো, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আগামী সরকারের জন্য অর্থনীতিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। আইএমএফের মতে ভর্তুকি কমাতে হবে। এটি করলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে। যা নতুন সরকারের জন্য জনঅসন্তোষের কারণ হতে পারে।
বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে চাহিদা তৈরি হবে। এতে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিনিয়োগ বাড়বে। পাশাপাশি সরকারের খরচের চাহিদা বাড়বে। তখন অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে। এসব করতে সরকারকে সংস্কার চলমান রাখতে হবে ও রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
এদিকে বর্তমান সরকার অর্থনীতির ক্ষতগুলো চিহ্নিত করে লুটপাট বন্ধ করেছে, টাকা পাচার বহুলাংশে রোধ করেছে। হুন্ডির প্রভাব কমিয়ে রেমিট্যান্স বাড়িয়েছে। নিম্নমুখী রিজার্ভ করেছে ঊর্ধ্বমুখী।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের পর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদের হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে স্বামী ফারুকীর সম্পদ কমলেও স্ত্রী তিশার সম্পদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রকাশিত খতিয়ান অনুযায়ী, জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ এক বছরে অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তিশার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা। ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সেই সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪১ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ কমেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন তার মোট সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করে। একই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পদে এমন ভিন্নমুখী পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি হওয়ায় তাদের এই আয়-ব্যয়ের হিসাব এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আজ এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে কার্যত অনুপস্থিত। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান এবং কিছু সমীকরণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক। দলটির নিয়মিত প্রায় ৪ কোটি ভোটার এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন। সিআরএফ বা বিইপিওএস জরিপ বলছে, এই ভোটারদের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে, যা দলটিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ আওয়ামী ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে দেশজুড়ে সুষম জনসমর্থন থাকা বিএনপি আসন জয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রায় ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় দলের মনোনয়ন না পাওয়া ৯২ জন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা বিএনপির ১৫ থেকে ৩০টি আসন কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ ভোটার বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিশাল সমর্থন জামায়াতে ইসলামীর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৪৪ শতাংশ ভোটারই তরুণ, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই তরুণরা যদি দলবেঁধে কেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে নির্বাচনী ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সবশেষে, প্রায় ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার এবং তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামীর সরকার কতটা শক্তিশালী হবে। দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের মূল পূর্বাভাস, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারে এবং জামায়াতে ইসলামী ৮০টির মতো আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যায় বড় ধরনের হেরফের হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাইজুল ইসলাম, যিনি অনলাইনে পরিচিত ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে। মাত্র একটি ভিডিও—যেখানে তিনি এক দোকানিকে প্রশ্ন করেন, “জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে?”—এই সরল উপস্থাপনাই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। কয়েক ঘণ্টায় ফলোয়ার লাখ ছাড়াল রোববার রাত পর্যন্ত তার ফেসবুক অনুসারী ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাতের মধ্যেই তা বেড়ে এক লাখের বেশি হয়ে যায়। ভাইরাল ভিডিওটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখবার দেখা হয়েছে। কী ছিল সেই ভিডিওতে? ভিডিওতে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ভাষায় তিনি জিলাপির দাম জানতে চান। তার কথাগুলো ছিল একেবারেই সহজ ও গ্রাম্য ভঙ্গিতে— “সাদাডা কত, লালডা কত? সরকারি রেটে বেচতেছেন?” এই সরল প্রশ্নই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কোথা থেকে উঠে এলেন তাজু ভাই? কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের একটি দুর্গম গ্রামে জন্ম তার। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনও কয়েকটি নৌঘাট পার হতে হয়। দারিদ্র্যের কারণে কখনো স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। পেশায় তিনি একজন নির্মাণশ্রমিকের সহকারী (হেলপার)। কাজের ফাঁকে ঢাকায় থাকাকালীন মোবাইল ফোনে ভিডিও তৈরি করাই তার শখ। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাইজুল ইসলামের পরিবারে ছয় ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। তার বাবা-মা দুজনই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবার চালাতে তাকে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “পরিবারের কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। আমি সাংবাদিক না, কিন্তু আমাদের এলাকায় কেউ আসে না—তাই নিজেরাই ভিডিও বানাই।” ভাইরাল হওয়ার পেছনের উদ্দেশ্য তাইজুলের দাবি, তার ভিডিও শুধুই বিনোদনের জন্য নয়। তিনি চান তার এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের নজরে আসুক। “আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক,”—বলছেন তিনি। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তার সরলতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা প্রশংসা করছেন আবার কেউ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন তবে এসব সমালোচনায় তিনি বিচলিত নন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামরিক ঘাঁটি করার পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ৩৫০ একরের ঘাঁটিটিতে সামরিক বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য থাকতে পারবে। গাজার ‘বোর্ড অব পিস’র নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, বোর্ড অব পিসে গাজাকে নিরাপদ করার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। যে স্থানটি ঘাঁটি করার জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে সেখানে আইএসএফের সদস্যরা থাকবে। বোর্ড অব পিসের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সংগঠনটির আংশিক নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারার্ড কুশনার।দ্য গার্ডিয়ান বোর্ড অব পিসের নথি পর্যালোচনা করে জানায়, ধাপে ধাপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে। সবকিছু শেষ হলে ঘাঁটিটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৫ বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ঘাঁটিটির চারপাশে ট্রেইলার সংযুক্ত ২৬টি সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার থাকবে। এছাড়া একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংকার ও অস্ত্র রাখার গুদাম থাকবে। পুরো ঘাঁটিটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হবে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে দক্ষিণ গাজার একটি শুষ্ক সমতলভূমিতে। সেখানে ইসরায়েলি হামলার চিহ্ন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ধাতবের ধ্বংসাবশেষ। ওই এলাকার ভিডিও পর্যালোচনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘাঁটি নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক নির্মাণ কোম্পানিগুলোর একটি ছোট দলকে ইতোমধ্যেই এলাকাটি দেখানো হয়েছে। ওই দলটি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া সরকার গাজায় আট হাজার সেনা সদস্য পাঠানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বোর্ড অব পিসের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আরও তিন নেতার ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গাজার সাময়িক স্থিতিশীলতার জন্য অস্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলই বোর্ড অব পিসের মূল হোতা। গাজার সীমান্ত ও শান্তি প্রণয়নে কাজ করবে আইএসএফ। এছাড়া বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে তারা। যদি গাজায় ফের সংঘর্ষ হয়, ইসরায়েল বোমা হামলা চালায় অথবা হামাস হামলা চালায় সেক্ষেত্রে আইএসএফ কি করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনে ইসরায়েল হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের যে শর্ত দিয়েছে সেটির জন্য আইএসএফ কাজ করবে কিনা তাও স্পষ্ট না। ইতোমধ্যে বোর্ড অব পিসে ২০ এর অধিক দেশ যোগ দিয়েছে। তবে, এখনও অনেক পরাশক্তি এর থেকে দূরে রয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠনটির স্থায়ী নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আদিল হক বলেন, “বোর্ড অব পিস এক ধরনের আইনি কল্পসত্তা। নামমাত্রভাবে এর নিজস্ব আন্তর্জাতিক আইনগত সত্তা রয়েছে, যা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা। কিন্তু বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য একটি ফাঁপা খোলসমাত্র।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা পুনর্গঠনে যে অর্থায়ন ও শাসন কাঠামো হচ্ছে তা অস্বচ্ছ। কয়েকজন ঠিকাদার গার্ডিয়ানকে জানান, গাজায় কাজ করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রায়শ আলোচনা সরকারি ইমেলের বদলে সিগন্যালের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য মতে, ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্তটি বোর্ড অব পিসের। এতে সহায়তা করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাঁটিতে তৈরি বাংকার নেটওয়ার্কের মতোন কাজ করবে। প্রতিটি বাংকারের ২৪ মিটারের হবে। উচ্চতা থাকবে আড়াই মিটার। এগুলো এমনভাবে করা হবে যেন সেনা সদস্যরা আশ্রয় নিতে পারে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের গাজায় সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক বা টানেল রয়েছে। সেগুলোর আদলে নেটওয়ার্ক করতে চাওয়া হচ্ছে। পিস অব বোর্ডের নথি পর্যালোচনা করে এমন দাবি করছে গার্ডিয়ান। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, স্থানটির ভূ-ভৌত জরিপ পরিচালনা করবে ঠিকাদাররা। নথির এক অংশে ‘হিউম্যান রেমিয়েনস প্রোটোকল’র কথা বলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, সন্দেহভাজন মানব অবশিষ্ট বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া গেলে অবিলম্বে সেই এলাকায় সব কাজ বন্ধ করতে হবে। চুক্তি কর্মকর্তাকে দিকনির্দেশনার জন্য অবিলম্বে জানাতে হবে। গাজা সিভিল ডিফেন্সের ধারণা, গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ রয়েছে। ঘাঁটির জন্য যে স্থানটি বিবেচিত করা হচ্ছে সেটির মালিক কে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, দক্ষিণ গাজার বেশিরভাগ অংশ বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের অনুমান, যুদ্ধ চলাকালীন ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ফিলিস্তিনের জমিতে সরকারের অনুমতি না নিয়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে দখল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি-কানাডিয়ান আইনজীবী এবং প্রাক্তন শান্তি আলোচক দিয়ানা বুট্টু। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “কার অনুমতিতে তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করবে।” বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বোর্ড অব পিসের কথা টানেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা সামরিক ঘাঁটির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “যেমনটি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোনও মার্কিন সেনা স্থলভাগে যাবে না। আমরা লিক হওয়া নথি নিয়ে আলোচনা করবো না।”
বাসস : বাবা একজন তাঁত শ্রমিক। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রোজিনা। অভাব সংসার, তাই এক এতিম যুবকের সাথে বাবা-মা বিয়ে দেন তাকে। বিয়ের পর জন্ম হয় দুই কন্যা সন্তানের। অটোরিকশা চালিয়ে কোন রকম সংসার চালাচ্ছিলেন স্বামী রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় রফিকুলের এক চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি চোখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ওই চোখের দৃষ্টি শক্তিও কমতে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে অটোরিকশা চালানো। সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি অচল হয়ে পড়ায় চিকিৎসার খরচ, ঘর ভাড়া ও খাবারের পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে যায়। দিশেহারা হয়ে পরেন রোজিনা। এক পর্যায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালানোর চেস্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামী রফিকুলের কাছেই হাতেখড়ি। গ্রামের স্কুলের মাঠে স্বামীর কাছেই অটোরিকশা চালানোর শিক্ষা নেন তিনি। পরে গ্রামের পথে নেমে পড়েন অটোরিকশা নিয়ে। ৫-৬ দিন এভাবে হাত পাকা করে একদিন টাঙ্গাইল শহরে চলে আসেন রোজিনা। এরপর শুরু করেন অটোরিক্সা চালানোর ব্যতিক্রমী জীবন সংগ্রাম। এখন টাঙ্গাইল পৌরসভায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা বেগম। জেলার বাসাইল উপজেলার আইসড়া গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা টাঙ্গাইল পৌর শহরের এক প্রান্ত রাবনা বাইপাস থেকে আরেক প্রান্ত বেবিস্ট্যান্ডে যাত্রী আনা নেয়া করেন। যানজটের কারণে শহরে পুরুষ চালকরা যেখানে হিমসিম খায়, সেখানেই বিগত ৫ বছর ধরেই নির্বিঘেœ অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। টাঙ্গাইল পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যাায়, টাঙ্গাইল শহরে চলাচলের জন্য ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক ও ৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়া হয়েছে। যানজট এড়াতে ৪ হাজার ২০০ ইজিবাইক জোড় ও বিজোড় সংখ্যায় দিনে দুই ভাগ করা হয়েছে। সকাল থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এক ভাগ এবং বেলা দুইটা থেকে রাত পর্যন্ত আরেক ভাগের ইজিবাইক চলাচল করার নির্দেশনা দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোজিনাকে দুই শিফটে চালানোর অনুমতি দিয়েছে পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে যাত্রী ডাকছেন রোজিনা। কলেজ গেট, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ক্যাপসুল, নিরালা মোড়, বেবিস্ট্যান্ড সর্বত্রই যাত্রী আনানেয়া করেন তিনি। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অন্য অটো চালকদের দাঁড় করতে না দিলেও রোজিনাকে বাঁধা দেননা ট্রাফিক পুলিশ। বলতে গেলে সবাই তার প্রতি সহানুভুতিশীল। ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য অটোচালকরাও তাকে সহযোগিতা করেন। রোজিনা বলেন, আমার অটোতে নারী যাত্রীরা খুব কম। তারা মনে করে আমার অটোতে উঠলে দুর্ঘটনায় পড়বে। কিন্তু আমি খুব সাবধানে অটো চালাই। দ্রুত গতিতেও না, আবার একেবারে ধীরগতিতেও না। এখন পর্যন্ত আমি কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ি নাই। শহরের পুরুষ অটোরিকশা চালকরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। অটোচালক কাদের মিয়া বলেন, আমাদের শহরে কয়েক হাজার অটো চলাচল করে। তার মধ্যে একমাত্র নারী চালক রোজিনা। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। তাকে আমরা সব সময় সহযোগিতা করি। যাত্রী সাইদ মিয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত ৫-৬ বার রোজিনার অটোতে চড়েছি। তিনি খুব সাবধানে অটো চালান। অন্য পুরুষ অটো চালকের চেয়েও ভালো অটো চালান। নারী সংগঠক সেরাজুম মনিরা বলেন, তিনি অনেক দিন যাবত অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আমি রোজিনাকে স্যালুট জানাই। একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী কোনো ভাবেই যে পিছিয়ে নেই, রোজিনা তা প্রমাণ করেছেন। রোজিনা বলেন, অটো চালানোর এই সিদ্ধান্তটি তার জন্য খুব সহজ ছিল না। তিনি বলেন, ৫ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে অটোরিকশা নিয়ে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হয়। তাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে পারি না। কিন্তু কি করবো, অভাবের সংসার! এখন ঋণ নিয়ে একটু জমি কিনেছি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রশাসন সেখানে ঘর তুলে দিয়েছে। শুরুতে যারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে এখন তারাই আমাকে সম্মান করেন। নারীরাও যে কিছু করতে পারে, তা প্রমাণ করেছি। আমার বড় মেয়ে আইসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে, ছোট মেয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। ধার দেনা শোধ করতে হবে। তাই থেমে গেলো চলবে না। আমি অটোরিকশা চালিয়েই দুই সন্তানকে মানুষ করতে চাই।’ ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বাবুল সরকার বলেন, সরকার রোজিনাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। শুরুতে যারা তাকে নিয়ে নানান কথা বলতো, এখন তার সংকল্প ও মানষিক দৃঢ়তা দেখে থেমে গেছে। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি। টাঙ্গাইলের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শহরের একমাত্র নারী চালক রোজিনাকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে সব সময় নজর রাখে ট্রাফিক পুলিশ। আমরা তাকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, বিষয়টি এখন জানতে পারলাম। ওই নারী এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেন নাই। যদি আমাদের কাছে এসে আবেদন করেন অবশ্যই তাকে আমরা সহযেগিতা করবো, তার পাশে দাঁড়াবো।
ইত্তেহাদ নিউজ,অনলাইন : কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে উঠে আসা এক সাধারণ দিনমজুর—তাইজুল ইসলাম তাজু। অল্প সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করা এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ফেসবুক পেজ ‘তাজু ভাই ২.০’ হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুরের পর থেকে এক মিলিয়নের বেশি ফলোয়ার থাকা পেজটি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘটনাটি এখন স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ উত্থান: ট্রল থেকে প্রশংসা মাত্র ১০ হাজারের কম ফলোয়ার নিয়ে চলা পেজটি গত ২৮ মার্চের পর থেকে আচমকাই আলোচনায় আসে। এর পেছনে ছিল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশিত একটি ভিডিও—“সরকারি রেটে জিলাপি বিক্রি হচ্ছে”। চরনারায়ণপুরের একটি স্থানীয় বাজারে ধারণ করা সেই ভিডিওতে তাজুর উপস্থাপনা, স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা এবং ব্যতিক্রমী স্টাইল দ্রুত দর্শকদের নজর কাড়ে। প্রথমদিকে ভিডিওটি নিয়ে ট্রল হলেও, খুব দ্রুত সেটি প্রশংসায় রূপ নেয়। কারণ, ভিডিওর আড়ালে উঠে আসে স্থানীয় মানুষের বাস্তব সমস্যা, বাজার ব্যবস্থার অসঙ্গতি এবং গ্রামীণ জীবনের অনাবৃত চিত্র। ভাইরাল বিস্ফোরণ ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তাজুর পেজে ফলোয়ার সংখ্যা লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়—যা বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট জগতে বিরল ঘটনা। এই সময়ের মধ্যে তাজুর আরও কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি চরাঞ্চলের নিত্যদিনের সমস্যা—পণ্যদ্রব্যের দাম, যোগাযোগ সংকট, ও জনসেবার ঘাটতি তুলে ধরেন। হঠাৎ অদৃশ্য: কী ঘটেছে? এই দ্রুত উত্থানের মাঝেই আসে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। ৫ এপ্রিল দুপুরের পর থেকেই পেজটি আর দেখা যাচ্ছে না। তাজুর সহযোগী শাহ আলম হোসেন জানান, এটি প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণেও হতে পারে। তার ভাষায়, “আমরা আশা করছি, স্বল্প সময়ের মধ্যেই পেজটি আবার চালু হবে।” অন্যদিকে স্থানীয় ইউপি সদস্য কবিরুল ইসলাম ভিন্ন একটি সম্ভাবনার কথা বলেন। তার মতে, “অল্প সময়ে পেজটিতে বিপুল ফলোয়ার ও ভিউ বাড়ায় মেটা কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে পেজটি অদৃশ্য করে থাকতে পারে।” সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ তদন্তে উঠে আসছে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা— ১. অস্বাভাবিক গ্রোথ অ্যালার্ট হঠাৎ করে ফলোয়ার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেলে প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম সেটিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিভিউ শুরু হয়। ২. রিপোর্ট বা মাস রেপোর্টিং ভাইরাল হওয়ার পর অনেক সময় ট্রল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সংগঠিত রিপোর্টিংয়ের কারণে পেজ সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। ৩. কমিউনিটি গাইডলাইন যাচাই ভিডিওর কনটেন্টে যদি কোনোভাবে প্ল্যাটফর্মের নীতিমালার সঙ্গে অসঙ্গতি থাকে, তবে তা যাচাইয়ের জন্য পেজ লুকিয়ে রাখা হতে পারে। ৪. প্রযুক্তিগত ত্রুটি মাঝেমধ্যে বড় প্ল্যাটফর্মেও সাময়িক বাগ বা সার্ভার সমস্যার কারণে পেজ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। গ্রামীণ কণ্ঠের উত্থান—নাকি ঝুঁকি? তাজুর ঘটনা শুধু একটি পেজ হারানোর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ডিজিটাল কনটেন্ট ইকোসিস্টেমের একটি প্রতীকী ঘটনা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন মানুষ যখন সরাসরি নিজের ভাষায় স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরেন, তখন তা দ্রুত মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। কিন্তু সেই একই দ্রুততা প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক নজরদারির ঝুঁকিও বাড়ায়। এখন কী? তাইজুল ইসলামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে পেজটি স্বেচ্ছায় ডিঅ্যাক্টিভ করা হয়েছে, নাকি প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ সরিয়েছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী—যদি এটি শুধুই যাচাই-বাছাই বা প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে খুব শিগগিরই ‘তাজু ভাই ২.০’ আবারও অনলাইনে ফিরে আসবে। তাজুর গল্প প্রমাণ করে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া যতটা সহজ মনে হয়, তা ধরে রাখা ততটাই জটিল। একদিকে মানুষের ভালোবাসা, অন্যদিকে অ্যালগরিদমের কঠোর নজরদারি—এই দুইয়ের মাঝেই এখন ঝুলে আছে ‘তাজু ভাই ২.০’-এর ভবিষ্যৎ।
গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ঈদের দিন সন্তানকে কাঁধে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হওয়া এক তরুণকে আটক করার পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তার ২১ মাস বয়সী শিশুকে পরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—যার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিখোঁজ ওই তরুণের নাম ওসামা আবু নাসের (২৫)। তার শিশুপুত্র জাওয়াদ আবু নাসারকে গত ১৯ মার্চ গাজার কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে বাবার সঙ্গে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের বাড়ি, জীবিকা ও নিরাপত্তা হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন ওসামা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিনি সকাল ১০টার দিকে শিশুকে নিয়ে মিষ্টি কিনতে বের হন। ওসামার বাবা মুহাম্মদ হুসনি আবু নাসার জানান, প্রতিবেশীরা ফোন করে তাকে জানান, তার ছেলে শিশুকে কাঁধে নিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে—যেখানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। গাজার মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক সীমারেখা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই এলাকায় পৌঁছানোর পর ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি গুলি না চালিয়ে তার আশেপাশে গুলি ছোড়ে। এতে বিভ্রান্ত হলেও ওসামা থামেননি। পরে একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন তার কাছে এসে ভেসে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এরপর তাকে শিশুকে নামিয়ে রেখে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং কাপড় খুলে ফেলতে বলা হয়। ওসামার বাবা বলেন, “সে শুধু অন্তর্বাস পরে ছিল এবং শান্ত ছিল, কোনো আক্রমণাত্মক আচরণ করেনি।” ওসামা আটক হওয়ার পর তার বাবা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিতে থাকেন এবং আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে নিজের যোগাযোগ নম্বর দিয়ে আসেন। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়, তার নাতিকে তারা পেয়েছে। পরে মাঘাজি বাজার এলাকায় আইসিআরসি কর্মকর্তারা শিশুটিকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। শিশুটিকে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় ফেরত দেওয়া হয়। কম্বল খুলে তার প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। আইসিআরসি জানায়, তারা শিশুটিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে শিশুটির শারীরিক বা মানসিক অবস্থা নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। পরিবারের দাবি, বাড়িতে আনার পর শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাঁটুর চারপাশে পোড়া দাগ এবং ধারালো বস্তু দিয়ে করা গভীর ক্ষত ছিল। শিশুটি সারারাত ব্যথা ও আতঙ্কে কেঁদেছে এবং ঘুমাতে পারেনি। পরদিন হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, এসব আঘাত গোলাবারুদের কারণে নয়—বরং নির্যাতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির হাঁটু ফুলে গেছে এবং সেখানে সিগারেটের দাগের মতো ক্ষত রয়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হামাসের প্রচারণার অংশ। এদিকে, আটক হওয়ার পর থেকে ওসামা আবু নাসারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান ‘বেআইনি হামলার’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শুক্রবার তিনি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। জাতিসংঘ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী। ইরানও এর জবাবে ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন জানায়, তেহরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি ঠেকাতেই এই অভিযান। তবে এই হামলায় দেশটির সরকার কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করছেন। এদিকে গুতেরেস বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে চলমান সব বেআইনি হামলা ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ও ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে অসহায় মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন লড়াই থামানোর এবং গুরুত্বের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করার সময়।’ জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার শুক্রবার বলেন, ‘আমরা দেখছি যে এই যুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ডলার অর্থাৎ রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ রাজনীতিবিদরা অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সহায়তা তহবিল কাটছাঁট করার বড়াই করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তি ও বিচারহীনভাবে মানুষ হত্যার এক ভয়াবহ সমন্বয় দেখছি।’ ফ্লেচার বলেন, ‘মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি ও বেপরোয়া যুদ্ধ ঠেকাতে যে সব আইন ও ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোর ওপর এখন লাগাতার আঘাত করা হচ্ছে।’ যুদ্ধের অন্যান্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সতর্ক করেন, এই সংঘাতের ফলে বাজার ব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোই সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। Iran Israel War, Middle East Crisis, UN Warning, Global Economy Risk, Trump Iran Conflict